বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

মেধা নির্ধারণের ভুল মানসিকতা

Author

তামিম নূরানী প্রেমা , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ৯ জানুয়ারি ২০২৬ পাঠ: ৩৯ বার

আমাদের দেশের সমাজ উন্নতির এক ধাপ এগোনোর বদলে যেন এক ধাপ পিছিয়ে পড়ছে-এই কথা বললে অত্যুক্তি হবে না। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাই করার যে সামাজিক মানসিকতা গড়ে উঠেছে, তা আমাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার জন্য গভীরভাবে চিন্তার বিষয়। আজও আমরা একজন শিক্ষার্থীর যোগ্যতা, চিন্তাশক্তি বা দক্ষতা যাচাই না করে শুধুমাত্র তার বিভাগ দেখেই তাকে মেধাবী বা অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করে দিচ্ছি।

একজন শিক্ষার্থী অষ্টম শ্রেণি পাস করার পরই এক ধরনের মানসিক দ্বন্দ্বে পড়ে যায়; সে কোন বিভাগ বেছে নেবে। এই বয়সে একজন শিক্ষার্থীর পক্ষে নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হওয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সে নিজের ইচ্ছার ওপর ভর করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তাই শিক্ষার্থীরা নিজের ইচ্ছে না দেখে, অভিভাবক, আত্মীয়স্বজন বা সমাজের “অভিজ্ঞ” হিসেবে পরিচিত মানুষের পরামর্শে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।

এই সিদ্ধান্তের পরই শুরু হয় প্রকৃত বিভাজন। একজন শিক্ষার্থী যদি বিজ্ঞান বিভাগ বেছে নেয়, সমাজ তাকে স্বাভাবিকভাবেই “মেধাবী” হিসেবে বিবেচনা করে। তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী মন্তব্য করা হয়, তাকে নিয়ে গর্ব করা হয়। অন্যদিকে, কোনো শিক্ষার্থী মানবিক বা বাণিজ্য বিভাগে পড়তে চাইলে তাকে অনেক সময় দুর্বল, কম মেধাসম্পন্ন বলে চিহ্নিত করা হয়। এই বৈষম্যের শিকার শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি হয় নিজের পরিবার থেকেই, যা তাদের আত্মবিশ্বাসে গভীর আঘাত হানে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, কিছু তথাকথিত শিক্ষিত শ্রেণির মানুষ এই বৈষম্যকে শুধু মেনেই নেয় না, বরং তা সক্রিয়ভাবে সমর্থনও করে। তখন অনিবার্যভাবে প্রশ্ন জাগে তারা কি আদৌ মেধা কিংবা মেধাবীর প্রকৃত সংজ্ঞা বোঝে?

বাস্তবতা হলো, বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য এই তিনটি বিভাগ আলাদা করা হয়েছে শুধুমাত্র বিষয়ভিত্তিক আগ্রহ ও দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে। একজন শিক্ষার্থী কোন পথে নিজেকে গড়ে তুলতে চায়, কোন বিষয়ের প্রতি তার ঝোঁক, চিন্তা ও দক্ষতা রয়েছে সেই অনুযায়ী বিভাগ নির্বাচন হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের সমাজ সেই স্বাভাবিকতাকে উপেক্ষা করে “স্ট্যাটাস”ও “হাইপ”-এর ভিত্তিতে মেধা নির্ধারণ করে।

ফলস্বরূপ শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মানসিক চাপ, ভীতি ও হতাশার শিকার হয়। আবার কেউ যদি স্বেচ্ছায় মানবিক বা বাণিজ্য বিভাগ বেছে নেয়, তখন ধরে নেওয়া হয় যে সে নাকি বিজ্ঞানের ‘কঠিন বিষয়’ সামলাতে পারবে না। কিন্তু সমাজ ভুলে যায়, সবাই ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে চায় না। কেউ ইতিহাস, সাহিত্য, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান বা অর্থনীতির মতো বিশ্লেষণধর্মী বিষয়ে নিজেকে গড়ে তুলতে চায়।

আজও যদি কোনো শিক্ষার্থী বিজ্ঞান ছেড়ে মানবিক বা বাণিজ্য বিভাগে যেতে চায়, তাকে নানা ধরনের অবমাননা ও প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। অথচ বাস্তবতা হলো রাষ্ট্র পরিচালনা, নীতিনির্ধারণ, শিক্ষা, প্রশাসন কিংবা সামাজিক নেতৃত্বে মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগের ভূমিকা কোনো অংশে কম নয়। একটি দেশ শুধু প্রযুক্তিবিদ দিয়ে নয়, চিন্তাশীল ও মানবিক নেতৃত্ব দিয়েই এগিয়ে যায়।

নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বারবার দেখেছি শুধু বিভাগের তথাকথিত মর্যাদার ওপর ভর করে সঠিক পথ নির্ধারণ করা যায় না। নিজের আগ্রহ, সক্ষমতা ও লক্ষ্য বুঝে বিভাগ নির্বাচন করাই একজন শিক্ষার্থীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আজও আমাদের সমাজ বিভাগ দেখেই মেধার বিচার করে, শিক্ষার্থীর প্রকৃত যোগ্যতা কতটা গভীর তা নিয়ে সন্দিহান থাকে।

তাই শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়-আমরা কি সত্যিই শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাই করছি, নাকি শুধু বিভাগ দেখে তাদের ভবিষ্যৎ ও সম্ভাবনাকে সংকীর্ণ একটি ছাঁচে বন্দি করে দিচ্ছি?

 

তামিম নূরানী প্রেমা

ইংরেজি বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

লেখক: সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে দৈনিক পরিবর্তন পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!