শিক্ষা ও স্বশিক্ষা: সমন্বয় কেন প্রয়োজন
শিরোনাম: শিক্ষা এবং স্বশিক্ষা: সমন্বয় কেন প্রয়োজন
মানুষের জীবন গঠনে শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা মানুষকে জ্ঞানী, সচেতন ও মানবিক করে তোলে। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষা বলতে সাধারণত প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা সনদকেই বোঝানো হয়। ফলে শিক্ষা অনেকাংশে হয়ে পড়েছে চাকরিমুখী। চাকরির সুযোগ না থাকলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের হার ১০ শতাংশের নিচে নেমে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। জানার জন্য নয়, বরং ফল লাভের উদ্দেশ্যেই অধিকাংশ শিক্ষার্থী প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় নিমজ্জিত হয়।
অন্যদিকে স্বশিক্ষা মানুষকে ভাবতে শেখায়, মুক্ত চিন্তার দুয়ার খুলে দেয় এবং মানবিক হিসেবে গড়ে তোলে। এটি নীতি-নৈতিকতার বোধ জাগ্রত করে এবং মানুষকে প্রকৃত মানুষে পরিণত করে। স্বশিক্ষা অর্জিত হয় ব্যক্তির নিজের আগ্রহ, অনুসন্ধান ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। স্বশিক্ষার মধ্যে শিক্ষা আছে, কিন্তু শিক্ষার মধ্যে স্বশিক্ষা সবসময় থাকে না। তাই আজকের বাস্তবতায় বলা যায়—বাড়ছে জনসংখ্যা, কিন্তু কমছে মানুষ।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানুষের বুদ্ধিবিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে মানুষকে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ করে দেয়। এর মাধ্যমে ব্যক্তি সমাজ, বিজ্ঞান, ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে একটি সংগঠিত ধারণা লাভ করে। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা একজন মানুষকে পেশাগত দক্ষতা অর্জনেও সহায়তা করে। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক কিংবা প্রশাসনিক কর্মকর্তার মতো পেশায় কাজ করতে হলে সুনির্দিষ্ট শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়। তাই সমাজ গঠনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গুরুত্ব অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
তবে বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মুক্ত চিন্তার বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। কারণ অধিকাংশ ছেলে-মেয়ে বাধ্য হয়েই পড়াশোনা করে। সামাজিক স্বীকৃতি, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সুফল, ভালো পেশাজীবন কিংবা সনদ অর্জনের লক্ষ্যই হয়ে ওঠে শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য। এর বাইরে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানুষকে যে গভীর মানসিক বা মানবিক বিকাশ দিতে পারে, তা অনেক সময় গ্রহণ করা হয় না।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হলো আমাদের পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে জ্ঞানের চেয়ে জিপিএ বা সনদের গুরুত্ব বেশি। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীরা সুস্থ প্রতিযোগিতার বদলে একটি ভালো চাকরির আশায় পড়াশোনা করে। ফলে তাদের মধ্যে সৃজনশীলতা ও অজানাকে জানার স্বাভাবিক কৌতূহল ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যায়। তাছাড়া পাঠ্যক্রমে নৈতিক মূল্যবোধ ও বাস্তবমুখী শিক্ষার অভাব, গবেষণাধর্মী চিন্তার সুযোগ সীমিত থাকা এবং পারিবারিক ও সামাজিক চাপের কারণে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনাকে আনন্দ হিসেবে না দেখে এক ধরনের বোঝা হিসেবে মনে করে। যখন শিক্ষার লক্ষ্য কেবল ডিগ্রি অর্জনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে এবং সেখানে সমালোচনামূলক চিন্তার (Critical Thinking) চর্চা থাকে না, তখন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যক্তিমানসে কোনো দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়।
কেবল ডিগ্রি অর্জন করলেই একজন মানুষ প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত হয়ে ওঠে না। আমাদের সমাজে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে উচ্চ ডিগ্রিধারী ব্যক্তিরা নৈতিকতা, মানবিকতা কিংবা বাস্তব জ্ঞানের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকে। আজ পত্রিকা খুললেই শিক্ষিত সমাজের বিভৎস রূপ দেখা যায়। মানবিক অবক্ষয়, ধর্ষণ, খুন কিংবা বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের তালিকায় অনেক সময় শিক্ষিত মানুষের নামই উঠে আসে। যেমন ফাহাদ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ২৫ জনই ছিল বুয়েটের শিক্ষার্থী। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র জুবায়ের আহমেদ হত্যাকাণ্ডে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ জন শিক্ষার্থী জড়িত ছিল। আবার বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম (BSAF)-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালের প্রথম তিন মাসেই অন্তত ১৫ জন শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষক বা স্কুল কর্মীদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এসব ঘটনা শিক্ষিত মানুষের মানবিক বিপর্যয়ের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। তখন প্রশ্ন জাগে—শুধু ডিগ্রিধারী হলেই কি একজন মানুষকে সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত বলা যায়?
এখানেই স্বশিক্ষার গুরুত্ব সামনে আসে। স্বশিক্ষা হলো নিজের কৌতূহল, অনুসন্ধান ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়া। এটি মানুষকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখায় এবং নতুন কিছু জানার আগ্রহ সৃষ্টি করে। ইতিহাসে এমন বহু ব্যক্তিত্বের উদাহরণ রয়েছে, যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতার বাইরে থেকেও স্বশিক্ষার মাধ্যমে জ্ঞানের উচ্চতায় পৌঁছেছেন। এর অন্যতম উদাহরণ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, যার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ভাণ্ডার ছিল সীমিত। কিন্তু স্বশিক্ষার মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। স্বশিক্ষা মানুষের মধ্যে সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণক্ষমতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা গড়ে তোলে। সর্বোপরি এটি একজন মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
বর্তমান যুগে স্বশিক্ষার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। প্রযুক্তির বিকাশের ফলে তথ্য ও জ্ঞান এখন মানুষের হাতের নাগালে। বই, গবেষণা, অনলাইন শিক্ষা এবং বিভিন্ন জ্ঞানভিত্তিক মাধ্যমের মাধ্যমে মানুষ নিজ উদ্যোগেই অনেক কিছু শিখতে পারে। তাই কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ওপর নির্ভর করলে চলবে না; নিজেকে সমৃদ্ধ করতে স্বশিক্ষার চর্চা অপরিহার্য।
তবে শিক্ষা ও স্বশিক্ষাকে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এই দুটি একে অপরের পরিপূরক। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানুষকে জ্ঞানের একটি ভিত্তি প্রদান করে, আর স্বশিক্ষা সেই জ্ঞানকে গভীর ও বিস্তৃত করে। যখন শিক্ষার সঙ্গে স্বশিক্ষার সমন্বয় ঘটে, তখনই একজন ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে জ্ঞানী ও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
প্রকৃতপক্ষে শিক্ষা ও স্বশিক্ষা একে অপরের পরিপূরক হলেও জীবনের পূর্ণতার জন্য স্বশিক্ষা বিশেষভাবে অপরিহার্য। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ডিগ্রি, কারিগরি দক্ষতা এবং জীবিকা অর্জনের পথ দেখায়, যা আধুনিক সমাজে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন। অন্যদিকে স্বশিক্ষা মানুষের মধ্যে বিবেক, নৈতিকতা ও সঠিক-ভুল বিচারের ক্ষমতা তৈরি করে, যা কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দিয়ে অর্জন করা সম্ভব নয়। একজন মানুষ উচ্চশিক্ষিত হয়েও স্বশিক্ষার অভাবে অহংকারী বা অপরাধী হয়ে উঠতে পারেন, কিন্তু একজন স্বশিক্ষিত ব্যক্তি প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াও সমাজে মানবিক ও আদর্শবান মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন। তাই জীবিকার জন্য শিক্ষা এবং প্রকৃত মানুষ হওয়ার জন্য স্বশিক্ষা—উভয়েরই সমন্বয় প্রয়োজন।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা জরুরি, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি স্বশিক্ষার চর্চাও সমান গুরুত্ব পায়। তবেই গড়ে উঠবে জ্ঞানসমৃদ্ধ, সচেতন ও মানবিক সমাজ।
পরিচয়:
মোঃ আমিনুর রহমান
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
শিক্ষাবর্ষ: ২০২৪–২৫
লেখক: সদস্য:, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।।

