বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন
হোম / ইসলাম / নিবন্ধ

আত্মশুদ্ধির মাস রমজান: গুনাহ মাফের সুবর্ণ সুযোগ

Author

উম্মে জোবায়দা , ইডেন মহিলা কলেজ

প্রকাশ: ৬ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ৪৫ বার

আত্মশুদ্ধির মাস রমজআন : গুনাহ মাফের সুবর্ণ সুযোগ

বছর ঘুরেই খোশ আমদেদ নিয়ে আবার এলো সিয়াম সাধনার মাস –রমাদ্বান। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে তৃতীয় স্তম্ভ –রোজা। আর রমাদ্বান মাসেই আল্লাহ তা’য়ালা পুরো মাস ব্যাপী মুসলিমদের উপর রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। আরবী “রমাদ্বান” শব্দটি ‘রমদ’ ধাতু হতে নির্গত হয়েছে। যার অর্থ হলো জ্বালিয়ে দেওয়া বা দহন করা। রমাদ্বান মাসের সিয়াম সাধনা বা রোজা পালন করার ফলে মানুষের ভিতরে পরিপূর্ণ থাকা পাপ দহন করে মানুষের মনকে করে তোলে উজ্জীবিত, পবিত্র, খাঁটি ও পুণ্যবান । ঠিক যেভাবে আগুনের উত্তাপে পুড়ে সোনা খাঁটি হয়,তেমনি রমাদ্বানের রহমতের আলো আমাদের অন্তরে থাকা কলুষতা ও পাপকে জ্বালিয়ে দেয়। এই আধ্যাত্মিক উত্তাপ আমাদের আত্মাকে শুদ্ধ করে, হৃদয়কে প্রশান্তির স্রোতে ভাসিয়ে দেয় এবং আমাদের চরিত্রকে করে তোলে পরিশীলিত।

আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যেভাবে নামাজ ফরজ করেছেন, ঠিক তেমনিভাবে রোজাও ফরজ করেছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন –
“হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো”–(সূরা আল-বাকারা: ১৮৩)।
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, রোজার উদ্দেশ্য কেবল উপোস থাকা নয়; বরং আত্মাকে পবিত্র করা, পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহভীতি অর্জন করা।

এ মাস গোটা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অপার রহমত ও বরকতের মাস।  এটি শুধু উপবাসের মাস নয়,বরং আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া অর্জন, আল্লাহর নৈকট্য লাভ এবং গুনাহ থেকে বাঁচার এক শ্রেষ্ঠতম মাস। স্বয়ং আল্লাহ তা’য়ালা-ই এর প্রতিদান দেন। তিনি বলেন – “সাওম আমার জন্য, আর আমিই এর প্রতিদান দিব।”–মিশকাতুল মাসাবীহ। রোজাদার ব্যক্তি আল্লাহ তা’য়ালার কাছে সর্বাপেক্ষা উত্তম ব্যক্তি। হাদিসে এসেছে–“আল্লাহর কাছে রোজাদারের মুখের গন্ধ মিশকের চেয়েও সুগন্ধিময়”–(সহিহ বুখারি: ১৮৯৪, সহিহ মুসলিম: ১১৫১)। রাসুলুল্লাহ (সা.) একদিন সাহাবিদের সাথে রমাদ্বান সম্পর্কে বলেন, “রমাদ্বান মাস আগতপ্রায়, এ মাস অনেক বেশি বরকতময়, আল্লাহ তা’আলা তাঁর বান্দাদের জন্য বিশেষ দৃষ্টি প্রদান করেন এবং খাস রহমত বর্ষণ করেন, গুনাহ মাফ করেন ও দোয়া কবুল করেন।” আরেকটি হাদিসে এসেছে –রমজান মাস এলে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়,জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়”–সহিহ বুখারি: (১৮৯৯, সহিহ মুসলিম: ১০৭৯)। এটি এমন এক মাস, যে মাসে পবিত্র কুরআন নাজিল হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’য়ালা কুরআন মাজীদে ইরশাদ করেছেন– “রমযান মাসই হলো সে মাস যাতে নাযিল করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়াত এবং সত্যপথযাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথনির্দেশ”–(সূরা বাকারা -১৮৫)।তাই, এ মাসে আমাদের কর্তব্য হলো– নিজেদের যাবতীয়  গুনাহ থেকে মুক্ত করে পূর্ণরূপে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা।

রহমত,মাগফেরাত ও নাজাত নিয়ে গঠিত এই মহিমান্বিত মাসটি মুমিনদের জন্য সুখবরের বার্তা বয়ে আনে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “রমজানের প্রথম দশক হলো রহমত, মধ্য দশক হলো মাগফিরাত, আর শেষ দশক হলো জাহান্নাম থেকে মুক্তির সময়”–(বায়হাকি: ৩৪৫৯)। প্রথম দশদিনে পরম করুণাময় আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর রোজাদার বান্দাদের উপর অপার রহম প্রদর্শন করেন। হাদীস শরীফে এসেছে- “রমজান মাস শুরু হলেই রহমতের দরজা খুলে দেওয়া হয়”–(সহীহ মুসলিম, হাদীস ১০৭৯/২)। দ্বিতীয় দশদিনে ক্ষমাশীল আল্লাহ তাঁর রোজাদার বান্দাদের পূর্বের সকল ধরনের পাপের মাগফেরাত বা ক্ষমা করেন।রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—”যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে এবং সওয়াবের আশায় রমাদ্বানের রোজা রাখবে, তার অতীতের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে”–(বুখারী ও মুসলিম)। রমজানের শেষের দশদিনে পাওয়া যায় নাজাত বা মুক্তি। এই শেষ দশ দিন অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। এসময় সকল ধরনের পাপাচার কিংবা লোভ লালসা থেকে
নিজেকে হেফাজত করতে পালন করা হয়
ইতিকাফ। এছাড়াও এই শেষ দশ দিনের বিজোড় রাতে রয়েছে লাইলাতুল কদর, যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। আর লাইলাতুল কদরেই নাজিল হয় পবিত্র গ্রন্থ –আল কুরআন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,”নিশ্চয়ই আমি একে(কুরআন) নাজিল করেছি কদরের রাতে। আর তুমি কি জানো, কদরের রাত কী? কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম”–(সূরা আল-কদর ৯৭:১-৩)।
এছাড়াও রাসুল (সা.) বলেছেন–”যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে নামাজ পড়ে, তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়”–(সহিহ বুখারি: ২০১৪, সহিহ মুসলিম: ৭৬০)
এ থেকেই বোঝা যায়, লাইলাতুল কদর অত্যন্ত বরকতময় রাত, যা আল্লাহর রহমত ও গুনাহ মাফের বিশাল সুযোগ নিয়ে আসে।

রমাদ্বান গুনাহ মাফের এক অনন্য মাস, যেখানে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য রহমতের দরজা উন্মুক্ত করেন, গুনাহ ক্ষমা করেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন। এটি এমন এক মাস, যেখানে প্রতিটি ইবাদত বহু গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়, আর তওবা কবুলের দুয়ার সর্বদা খোলা থাকে।
হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—”যে ব্যক্তি খালেস নিয়তে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একদিন রোজা রাখে, আল্লাহ তার চেহারাকে দোজখের আগুন থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দেন”–(সহিহ মুসলিম)।
রাসুল (সা.) আরও বলেন—”যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমাদানের রোজা রাখে, সে এমনভাবে নিষ্পাপ হয়ে যায়, যেমন সেদিন জন্ম নেওয়া এক নবজাতক” –(সুনানে নিসাই, কিতাবুস সাওম)। হাদিসে এসেছে যে–এই মাসে ফেরেশতারা রোজাদারের জন্য দিন-রাত দোয়া করতে থাকেন– (মাজমাউজ যাওয়ায়েদ)।

রমাদ্বানের প্রতিটি মুহূর্ত মাগফিরাতের প্রতিশ্রুতি বহন করে। আল্লাহর কাছে খাঁটি হৃদয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলে, তিনি শুধু ক্ষমাই করেন না, বরং আগের সব গুনাহ মুছে দেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—”তিন ব্যক্তির দোয়া কখনো ফিরিয়ে দেওয়া হয় না; তাদের একজন হলেন রোজাদার, যতক্ষণ না সে ইফতার করে”–
(তিরমিজি, দোয়া অধ্যায়, হাদিস নম্বর-৩৫৯৮)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন—”রজব আল্লাহর মাস, শাবান আমার মাস, আর রমাদান আমার উম্মতের মাস।”

“সিয়াম বা রোজা ঢালস্বরূপ।”(বুখারি ও মুসলিম)
রোজা শুধু একটি ইবাদত নয়, এটি আমাদের জন্য এক শক্তিশালী রক্ষাকবচও। যুদ্ধের ময়দানে যোদ্ধা যেমন ঢাল দিয়ে নিজেকে শত্রুর আঘাত থেকে রক্ষা করে, তেমনি রোজা আমাদের আত্মাকে পাপ, প্রবৃত্তির দাসত্ব এবং শয়তানের ধোঁকা থেকে রক্ষা করে। আত্মশুদ্ধির এই মাসে আমাদের সকলের উচিত পাপাচার থেকে নিজেদের বিরত রেখে বেশি বেশি নেক আমল করে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা। যারা রমাদ্বান মাসকে যথাযথভাবে পালন করে, তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত লাভ করে। আসুন, আমরা এই মাসের পবিত্রতা রক্ষা করি। প্রতিটি মুহূর্ত ইবাদতে ব্যয় করি, ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং জান্নাতের পথে নিজেদের এগিয়ে রাখার প্রতিশ্রুতি নিই।

।নাম:- উম্মে জোবায়দা
শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ
বিভাগ:- সমাজবিজ্ঞান

লেখক: সাংগঠনিক সম্পাদক, ইডেন মহিলা কলেজ।
এই লেখাটি ৬ মার্চ ২০২৬ তারিখে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!