বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

ভিউ সংস্কৃতি ও আমাদের মনুষ্যত্ববোধ

Author

উম্মে জোবায়দা , ইডেন মহিলা কলেজ

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পাঠ: ৪৩ বার

ভিউ সংস্কৃতি ও  আমাদের মনুষ্যত্ববোধ

একবিংশ শতাব্দী অর্থ্যাৎ বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে “ভিউ” এখন এক নতুন ধরনের মানসিক আসক্তিতে পরিণত হয়েছে। আজকের সমাজ পুরোপুরিভাবেই প্রযুক্তি নির্ভর সোশ্যাল মিডিয়ার আধিপত্যে গড়ে উঠেছে। বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এই “ভিউ” নিয়ে চলছে এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা,তা যেন এখন “সংস্কৃতিতে” পরিণত হয়েছে। আর এই ভিউ সংস্কৃতি-ই এখন মানুষের মনুষ্যত্ববোধকে নিয়ন্ত্রণ করছে। একটা ভিডিও কিংবা পোস্ট ভাইরাল হলেই পোস্টকারি নিজেকে সেলিব্রিটি ভাবা শুরু করছে। ভিউয়ের নেশায় বুঁদ হয়ে মানব সমাজ আজ ক্রমেই বিপন্নতার দিকে এগিয়ে চলছে।

সোশ্যাল মিডিয়ার রিলস, শর্টস, কিংবা ফেসবুকের ভিডিওর মাধ্যমে আমরা এখন সত্য, কিংবা গুণগত মান যাচাই না করে, বরং তা কতোটা ভাইরাল হচ্ছে –তা-ই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। এতে করে সস্তা কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা অনেক বেশি উৎসাহিত হয়ে অধিক পরিমাণে অন্যায়কে নিয়ে রসিকতা, কারও ব্যক্তিগত দুঃখ-কষ্ট নিয়ে ফানি ভিডিও বা মিম বানানো শুরু করে। সেগুলোই বারবার ভাইরাল হতে থাকে। আর এসবই যেন আজকের নতুন মুদ্রা। আমরা যেন তা খুব সহজেই “নরমালাইজ” করে ফেলেছি। যেটা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে আমাদের মূল্যবোধকেও। এই ভিউয়ের নেশায় যেন আমরা নিজের অজান্তেই এক অদ্ভুত দাসত্বে বন্দি হয়ে পড়েছি। কয়েক সেকেন্ডের একটা কন্টেন্টে আমরা বিচার করছি মানুষের চরিত্র, মূল্যবোধ কিংবা পুরো একটা ঘটনাকে। মূলত বাস্তবতা হচ্ছে, মানুষ আজ নিজেই নিজেকে পণ্যে রূপান্তরিত করছে। নিজেদের আবেগ, ব্যক্তিত্ব কিংবা  ব্যক্তিগত সম্পর্ক—সবই এখন সস্তা কনটেন্টে পরিণত হয়েছে। এতে করে ব্যক্তিগত সম্পর্কেও ফাটল ধরছে। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো কন্টেন্টে লাইক,ভিউ কম হলে তারা হতাশায় ভেঙে পড়ে যেন তারা লাইক কমেন্টকেই তাদের জীবনের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য বানিয়ে নিয়েছে। যার ফলে প্রতিনিয়ত নৈতিকতার অবক্ষয় হচ্ছে।

একটি বিষয় লক্ষণীয় যে ,আগে যখন কেউ বিপদে পড়তো তখন সবাই সাহায্য করার আপ্রাণ চেষ্টা করতো। আর এখন কেউ বিপদে পড়লে সাহায্য করা তো দূরে থাক, উল্টো তার বদলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কন্টেন্ট তৈরি করার উদ্দেশ্যে ভিডিও করা শুরু করে এবং কোন এঙ্গেল ঠিক রেখে ভিডিও করলে বেশি ভিউ হবে তাও ভাবে। মনে হচ্ছে যেন আমরা কেবল “স্রেফ ভাইরাল” হওয়ার উদ্দেশ্যেই এক অন্ধ প্রতিযোগিতার পিছনে ছুটছি।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এটাই যে,আজকাল কিছু সাংবাদিক মহলও এদিক দিয়ে পিছিয়ে নেই। ভিউয়ের নেশায় তারা বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর অথচ অপ্রাসঙ্গিক ফটোকার্ড তৈরি করছে। এতে করে পাঠকরা তাদের উপর ধীরে ধীরে আস্থা হারাচ্ছে।এই ভিউয়ের প্রতিযোগিতায় অনেক বস্তুনিষ্ঠ এবং তথ্যবহুল কন্টেন্ট টিকিয়ে থাকতে পারছে না। যার ফলে অনেক মেধাবী ব্যক্তিদের পরিশ্রমও বিফলে যাচ্ছে।

এভাবে চলতে থাকলে একসময় নিজেদের অস্তিত্বই সংকটে পড়বে। তাই আমাদের উচিত এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার পিছনে না ছুটে “ভিউ সংস্কৃতি”কে নিয়ন্ত্রণে আনা। আমরা যেন এই ভিউয়ের প্রতিযোগিতায় নিজেদের মূল্যবোধ এবং নৈতিকতাকে বিক্রি করে না দিই। আর আমাদের উচিত ভিউকে নয় সত্যকে গুরুত্ব দেওয়া।
পাশাপাশি কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য সুস্পষ্ট কিছু নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি। যাতে তারা অন্যের একান্ত ব্যক্তিগত জীবনে নগ্ন হস্তক্ষেপ না করে এবং মানবিকতা ও নৈতিকতার সীমা বজায় রেখে কনটেন্ট তৈরি করে। একই সঙ্গে গুণগত মান বৃদ্ধি করে কনটেন্টকে ইতিবাচক ও সৃজনশীলভাবে উপস্থাপন করতে হবে, যেন তা সমাজের উপকারে আসে এবং সম্মানজনক উপায়ে আয়ের একটি টেকসই উৎস হিসেবে গড়ে ওঠে।

লেখক: সাংগঠনিক সম্পাদক, ইডেন মহিলা কলেজ।
এই লেখাটি ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!