বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা একান্ত প্রয়োজন

‘বই পড়ার মতো আনন্দ আর কিছুতেই নেই! অন্য সবকিছুর চাইতে বইয়ের প্রতি মানুষের ক্লান্তি আসে অনেক দেরিতে।’ প্রায় ২০০ বছর আগে বিখ্যাত লেখিকা জেন অস্টেনের করা এই উক্তিটি আজও প্রাসঙ্গিক। একটা ভালো বই ঠিক যেন একজন অন্তরঙ্গ বন্ধু—যার সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ্য। বই আমাদের চিন্তার জগৎকে নাড়া দেয়, জীবন সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। মানুষের মননের বিকাশে তাই বই পড়ার বিকল্প নেই।
বই পড়ার মাধ্যমে আমরা নতুন নতুন জিনিসের সঙ্গে পরিচিত হই। ঠিক যেন কল্পলোকের টাইম মেশিনের মতোই বইয়ে চড়ে আমরা অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ ঘুরে আসতে পারি। কখনও চলে যাই পৃথিবীর বিপরীত প্রান্তে, কখনও বা নিজেরই বাড়ির পাশে। পাঠক বা পাঠিকা কখনও এক জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকেন না—কল্পনায় তিনি সারা বিশ্ব, এমনকি বিশ্বের বাইরেও নিয়মিত বিচরণ করে থাকেন। কখনও তিনি ভ্রমণ করেন গ্রহ-নক্ষত্রের জগৎ, কখনও খুব কাছ থেকে দেখেন অণু-পরমাণু। কী নেই বইতে! সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান, ধর্ম, প্রযুক্তি সবকিছু সম্পর্কেই আমরা বই পড়ে জানতে পারি। জ্ঞানার্জন এবং বিনোদন লাভের তাই এটি একটি অসাধারণ মাধ্যম।
বই আমাদের মনের চোখ খুলে দেয়। আমরা যখন কোনো উপন্যাস পড়ি, তখন তাতে ঘটা বিভিন্ন ঘটনা, চরিত্র, স্থান ইত্যাদি কল্পনার দৃষ্টিতে দেখি। এই কল্পনা আবার সবার এক রকম নয়। কেউ দেখেন একেবারে পরিষ্কার ছবির মতো দৃশ্য, কারও কাছে সেই ছবিটা একটু ভাসা ভাসা হয়ে ধরা দেয়। কেউ কেউ কোনো ছবিই দেখেন না, বরং কল্পনা করেন শব্দে শব্দে। কিন্তু কল্পনা যেমনই হোক, এতে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে নতুন নতুন সংযোগ তৈরি হয়। একটা জিনিস পড়ে সেটাকে কল্পনার চোখে দেখতে মস্তিষ্ককে কাজ করতে হয়—তার ব্যায়াম হয়, ফলে সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায়। বই পড়ার মাধ্যমে আমরা নতুন নতুন লেখক, চিন্তাবিদ, দার্শনিক, বিজ্ঞানীদের সঙ্গে পরিচিত হই। একটা বই পড়া মানে ঠিক যেন সেই বইয়ের লেখকের সঙ্গে সময় কাটানো, তার সামনে বসে তার চিন্তাভাবনা শোনা। বহু আগেই প্রয়াত হয়েছেন এ রকম বহু মনীষী তাদের লেখার মাধ্যমে আজও আমাদের মাঝে জীবিত। পড়াশোনার অভ্যাস করার মাধ্যমে আমরা এসব জ্ঞানী-গুণীর সংস্পর্শে থাকতে পারি। এতে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের চিন্তা, বিশ্লেষণ, অনুসন্ধান এবং অনুধাবন করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। আমরা নৈতিক, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হয়ে উঠতে পারি। আমাদের চিন্তাচেতনা উন্নত হয়, মন হয় উদার।
বই পড়ার ফলে সমৃদ্ধ হয় আমাদের শব্দভাণ্ডার। একটা বিষয় একজন বই না পড়া মানুষ যেভাবে বর্ণনা করবেন, একজন বইপড়ুয়া মানুষ বর্ণনা করতে পারবেন তার চেয়ে আরও অনেক সুন্দরভাবে। নিজে লেখক হতে চাইলে তাই বেশি বেশি বই পড়ার বিকল্প নেই। যতই পড়বেন, ততই আপনার ভেতরের লেখক সত্তার বিকাশ ঘটবে।
এ ছাড়া বই আমাদের মানসিক চাপ কমাতেও দারুণ সহায়ক। বই পড়ে আমরা বুঝতে শিখি যে, আমরা যেই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তার মধ্য দিয়ে আমাদের আগেও কেউ না কেউ গিয়েছেন—ফলে আমাদের একাকিত্ব কমে। অ
অনেকে বলে থাকেন ডিজিটাল যুগ এসে মানুষের বই পড়ার অভ্যাস চলে যাচ্ছে। কিন্তু আমি বলব, এই ডিজিটাল যুগই হলো বই পড়ার সর্বোৎকৃষ্ট সময়। আমাদের কাছে বই এখন অতীতের তুলনায় অনেক বেশি সহজলভ্য। আগেকার দিনে মানুষকে যেখানে প্রতিটি বই স্বশরীরে সংগ্রহ করতে হতো, সেখানে এই যুগে আমরা সহজেই ইন্টারনেট থেকে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে সেগুলো ঘরে বসেই সংগ্রহ করতে পারি। আমাদের প্রত্যেকের হাতের মুঠোয় এখন এক-একটি লাইব্রেরি অব আলেকজান্দ্রিয়া। বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার তাই এখনই সুবর্ণ সুযোগ।
বই পড়া শুরু করার কোনো বয়স নেই, যে কোনো সময়ই শুরু করা যায়। এতদিন যদি আপনার বই পড়ার অভ্যাস না-ও থেকে থাকে, তবু হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই—আজই অল্প অল্প করে পড়া শুরু করুন। নিজের পছন্দের কোনো টপিকের ওপরে লেখা বই বেছে নিন। এতে আগ্রহ ধরে রাখা সহজ হবে। সহজ ভাষায় লেখা বই দিয়ে শুরু করুন। বর্তমানে ইন্টারনেটে বিশাল বিশাল ডিজিটাল লাইব্রেরি রয়েছে, যেখানে বিশ্বের সেরা লেখকদের বই বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়। আবার এক জায়গায় বসে বই পড়ার সময়-সুযোগ না হলে অডিওবুক শুনতে পারেন। অনলাইনে খুঁজলে অনেক সুন্দর সুন্দর অডিওবুক পেয়ে যাবেন একদম বিনামূল্যে।
মানুষের চিন্তা-চেতনার বিকাশে, সৃজনশীলতা বাড়াতে, মানসিক চাপ কমাতে বই পড়ার বিকল্প নেই। যে জাতি যত বেশি বইপড়ুয়া, তারা তত বেশি উন্নত। পক্ষান্তরে পশ্চাৎপদ জাতির বৈশিষ্ট্য হলো বই পড়ায় অনীহা। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বই সংগ্রহ করা ও পড়া অতীতের তুলনায় অনেক বেশি সহজ- এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। একজন পাঠক বা পাঠিকা শুধু নিজে আলোকিত হন না, তার আশপাশের অন্য সবাইকেও আলোকিত করেন। তাই নিজের ও দেশের কল্যাণে প্রত্যেকের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা একান্ত প্রয়োজন।
