সংকটের আঁধারে আলো দেখাবে সবুজ শক্তি

বিশ্বজুড়ে যেন বেজে উঠেছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা। হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঢেউ এসে আঘাত হেনেছে আমাদের ছোট্ট এই দেশটিতেও। ইতোমধ্যেই জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ও ফুয়েলের দুষ্প্রাপ্যতা মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে এক অনিশ্চিত অবস্থা দেখা দিয়েছে। উপরন্তু মানুষের ভয়ের সুযোগ নিচ্ছে দেশীয় একদল অসাধু ব্যবসায়ী। ফলে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেকে পেট্রোল পাচ্ছে না। এতে দেশজুড়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক। এরকম চলতে থাকলে সামনে হয়তো আরও ভয়াবহ সময় অপেক্ষা করছে। তাই এখনই এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া অপরিহার্য।
এই সংকট নতুন কিছু নয়। বরং অনিশ্চিত শক্তির উৎসের উপর আমাদের নির্ভরতার এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। শক্তির জন্য আমরা অতিমাত্রায় বহির্বিশ্বের মুখাপেক্ষী। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ১.৯২ মিলিয়ন টন অপরিশোধিত তেল এবং প্রায় ৪.৪২ মিলিয়ন টন পরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। ২০২৪ সালের জন্য প্রস্তাবিত আমদানি হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৬.৫ মিলিয়ন টন তেল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকার। অথচ যেসব দেশ থেকে এই আমদানি করা হয়, সেসব দেশের অবস্থার ওপরে আমাদের কোনো হাত নেই। তারা কখন কেমন সিদ্ধান্ত নেবে, কী ধরণের বিপদে পড়বে, কেমন ঝামেলায় জড়াবে তার কিছুই আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। কিন্তু তাদের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার কুপ্রভাব ঠিকই ভোগ করতে হয় আমাদের। আর তাই অন্য দেশের উপরে আমাদের এরূপ অতিনির্ভরতা কখনো না কখনো আমাদের একটা না একটা বড় সমস্যায় ফেলতোই। আবার হরমুজ প্রণালি বন্ধ না হলেও অনবায়নযোগ্য এই তেল, গ্যাস ইত্যাদি একসময় না একসময় ফুরোবেই। তখন আমরা কী করবো সে ব্যাপারেও আমাদের এখন থেকেই চিন্তাভাবনা করে পদক্ষেপ নেয়া উচিত। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি এখনই এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের অবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা করবো, নাকি সারাজীবন অন্যান্য দেশের দয়াপ্রার্থী হয়ে নিজেদের এরকম ঝুঁকিতে রেখে দেবো?
যদি আমরা নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে চাই, তবে নবায়নযোগ্য শক্তি বা সবুজ শক্তি হতে পারে আমাদের সমাধানের পথ। বিদেশ থেকে বিপুল দামে জ্বালানি আমদানি করার পরিবর্তে নিজেদের শক্তি নিজেরাই তৈরি করতে শিখলে আমরা শক্তিতে স্বাবলম্বী হতে পারবো। এর ফলে সরাসরি উপকৃত হবে আমাদের অর্থনীতি। আর নবায়নযোগ্য শক্তি যেহেতু কখনো শেষ হবে না, তাই এতে আমাদের ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা অনেকাংশে হ্রাস পাবে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণে সুবিধা হবে, একইসাথে কমবে পরিবেশ দূষণও।
গ্রিন হাউজ ইফেক্টের অন্যতম একটি কারণ হলো জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, অন্য কথায় বর্তমানে আমরা যে তেলভিত্তিক শক্তি ব্যবহার করছি তা। পক্ষান্তরে নবায়নযোগ্য শক্তি পরিবেশের ক্ষতি প্রায় করে না বললেই চলে। অর্থাৎ, এটি একদিকে যেমন আমাদের জন্য উপকারী, তেমনি উপকারী পৃথিবীর জন্যও। আর সে জন্যই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের এই যুগে বিশ্ববাসী আজ সবুজ শক্তির দিকে এগোচ্ছে। তাই আমাদেরও আর পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই, সময় এসেছে পরিবর্তনের। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, পানিশক্তি ইত্যাদি একদিক দিয়ে যেমন পরিবেশবান্ধব, তেমনি টেকসই—কারণ এসব শক্তি কখনো শেষ হবে না। এগুলো কাজে লাগিয়ে নিজের শক্তি নিজে তৈরি করতে শিখলে আমাদের আর বৃহৎ শক্তিদের স্বেচ্ছাচারিতার শিকার হতে হবে না, অন্য দেশের অস্থিরতা আমাদের অর্থনীতিতে কুপ্রভাব ফেলতে পারবে না।
বাংলাদেশে টেকসই সবুজ শক্তির উৎসের অভাব নেই। গ্রীষ্মপ্রধান এই দেশে সারাবছর সূর্যের আলো পড়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে—প্রতি বর্গমিটারে গড়ে প্রায় ৪ থেকে ৬.৫ কিলোওয়াট-ঘন্টা সৌর বিকিরণ পাওয়া যায়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এদেশে শুধু সৌরশক্তির সম্ভাবনাই প্রায় ৩০ থেকে ৫০ হাজার মেগাওয়াট, যা দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার বিশাল অংশ মেটাতে সক্ষম। আমাদের নেই বায়ুশক্তির অভাবও। এদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বায়ুর গতি প্রায় ৪.১ থেকে ৭.৫ মিটার প্রতি সেকেন্ড। তবে নদীমাতৃক দেশ হওয়া সত্ত্বেও ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে বড় পরিসরে পানিশক্তি ব্যবহারের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য শক্তির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ আমাদের শক্তির জন্য বাইরের দেশের উপরে নির্ভরশীলতা কমানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই সুযোগ কাজে লাগানো।
কাজেই এখনই সময় টেকসই ও পরিবেশবান্ধব শক্তিতে শিফট করার। বাসাবাড়ি, অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্র সোলার প্যানেল ব্যবহার করে বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো সম্ভব। পেট্রোলচালিত গাড়ির বদলে পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক যানবাহন চালু করা যায়। গ্যাসের চুলার বদলে ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করার মাধ্যমে দেশের সীমিত গ্যাসসম্পদের উপর চাপ কমানোর পাশাপাশি বিভিন্ন গ্যাসজনিত দুর্ঘটনার হার হ্রাস করা যায়। আবার সৌরশক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে লোডশেডিংয়ের মতো সমস্যাও দূর করা সম্ভব। এভাবে সর্বত্রই ধীরে ধীরে বিকল্প নবায়নযোগ্য শক্তি চালু করতে পারলে দেশের চেহারা বদলে যাবে।
তবে এই কাজ শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগে সম্ভব নয়, সরকারেরও এগিয়ে আসা প্রয়োজন। সোলার প্যানেল ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওপর সরকারি ভর্তুকি এবং কর ছাড় দিলে সাধারণ মানুষের কাছে সবুজ শক্তি সহজলভ্য হবে। পাশাপাশি নেট মিটারিং ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও কার্যকর করা প্রয়োজন যাতে মানুষ নিজেদের উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করতে পারে। গ্রামগঞ্জে সোলার হোম সিস্টেম চালুকরণ, নতুন ভবন নির্মাণে সোলার প্যানেল স্থাপনকে বাধ্যতামূলক করা যায়। এছাড়া সহজ কিস্তি সুবিধা, কম খরচের বিভিন্ন সৃজনশীল প্রযুক্তি উদ্ভাবন, এবং নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। একইসাথে সৃষ্টি করতে হবে ব্যাপক গণসচেতনতা। এই কাজে সরকারকে সাহায্য করতে বিভিন্ন এনজিও এবং পরিবেশবাদী সংস্থাও এগিয়ে আসতে পারেন। সরকারি-বেসরকারি সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে দেশকে পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য শক্তির আওতায় নিয়ে আসতে পারলে তা আমাদের সকলের জন্যই হবে কল্যাণকর।
সবুজ শক্তির ব্যবহারে আমাদের অর্থনীতি যেমন নিশ্চয়তা পাবে, তেমনই রক্ষা পাবে পরিবেশ। পাশাপাশি বিশ্ববাসীর কাছেও আমরা স্বনির্ভরতা ও পরিবেশ রক্ষার একটি রোল মডেল হয়ে উঠতে পারবো। তাই দেশ, জাতি, ও প্রাণ-প্রকৃতির কল্যাণে আসুন আমরা এখন থেকেই এই বিকল্পের দিকে অগ্রসর হই। আমাদের সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা, ষড়ঋতুর এই সুন্দর দেশের বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে শক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠি।
