ঈদের চাঁদ যেখানে ডুবে যায়

ঈদের আগের রাতে আকাশে চাঁদ উঠেছিল—পূর্ণ, উজ্জ্বল, যেন সবার জন্যই। শহরের ধনী পাড়ায় ঘরে ঘরে সেমাইয়ের মিষ্টি গন্ধ, নতুন জামার খসখস শব্দ, শিশুদের হাসি। কিন্তু শহরের পূর্ব প্রান্তে, পুরনো বাস টার্মিনালের ভাঙা ছাদের নিচে, ফুটপাতের এক কোণে বসে ছিল দশ বছরের ছেলে রাহিল। তার গায়ে ছেঁড়া একটা লাল টি-শার্ট, পায়ে জুতো নেই। চোখ দুটো খালি, যেন অনেক আগেই স্বপ্ন দেখা শেষ হয়ে গেছে।
সে চাঁদের দিকে তাকিয়ে ছিল না। চাঁদ দেখে কী হবে? চাঁদ তো খাবার দেয় না, আশ্রয় দেয় না, মা-বাবার কোল ফিরিয়ে দেয় না। রাহিল শুধু জানত—আজ রাতেও পেট খালি থাকবে। তার পাশে শুয়ে ছিল ছোট্ট মায়া, সাত বছরের মেয়ে। দুজনেই একই রাস্তার সন্তান। কেউ তাদের জন্ম দিয়েছিল, তারপর ভুলে গিয়েছিল।
রাহিলের হাতে ছোট একটা আঠার প্যাকেট ছিল। নেশা। ক্ষুধা ভোলানোর একমাত্র ওষুধ। মায়া ফিসফিস করে বলল, “দাদা, কাল ঈদ। সবাই নতুন জামা পরবে। আমরা কি পাব?”
রাহিল কোনো উত্তর দিল না। সে জানত, উত্তর নেই।
সেই রাতেই, অনেক দূরে, কালিন্দী নদীর ওপার থেকে একটা বাস ছেড়েছিল। বাসের নাম ছিল স্বপ্নযান। ভিতরে ছিলেন চল্লিশজন যাত্রী—যারা ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফিরছিলেন। মায়ের কোলে শিশু, বাবার কাঁধে ছেলে, নতুন শাড়ি আর পাঞ্জাবির প্যাকেট। সবার চোখে একই স্বপ্ন—আগামীকাল সকালে ঈদগাহে যাওয়া, কোলাকুলি, ক্ষমা চাওয়া, হাসি।
বাসটি যখন কালিন্দী সেতুর কাছে পৌঁছাল, হঠাৎ একটা ভয়ংকর শব্দ। চালক নিয়ন্ত্রণ হারালেন। বাসটা সেতু থেকে ছিটকে পড়ল গভীর নদীতে। পানির নিচে অন্ধকার। চিৎকার, হাত-পা ছোড়াছুড়ি, তারপর নীরবতা।
পরদিন ভোরে উদ্ধারকারী জাহাজ যখন বাসটিকে টেনে তুলল, তখন শহরের মানুষ জেনে গেল—ছাব্বিশজন চিরতরে চলে গেছেন। তাদের মধ্যে আটজন শিশু। ছোট ছোট শরীরগুলো যেন ঘুমিয়ে আছে, কিন্তু আর জাগবে না।
সেই খবর যখন আলোকনগরের রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ল, রাহিল আর মায়া তখনও ফুটপাতে বসে। একজন লোক পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে বললেন, “কী সাংঘাতিক! এতগুলো শিশু…”
রাহিল চুপ করে শুনল। তারপর মায়ার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “দেখলি? ওরাও ঈদ দেখতে পেল না। আমাদের মতোই।”
মায়া চোখ বড় করে জিজ্ঞেস করল, “দাদা, ওরা কি আমাদের মতো রাস্তায় থাকত?”
রাহিল মাথা নাড়ল। “না। ওরা ঘরে থাকত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবাই একই জায়গায় পৌঁছায়—যেখানে কোনো চাঁদ দেখা যায় না।”
সেদিন ঈদের সকালে আলোকনগরের ধনী পাড়ায় উৎসব চলছিল। কিন্তু রাহিল আর মায়া তাদের সাধারণ জায়গায় বসে রইল। রাহিলের হাতে আঠার প্যাকেটটা এখনও ছিল। সে আর শুঁকতে ইচ্ছে করছিল না। প্রথমবার তার মনে হলো—এই নেশা দিয়ে ক্ষুধা ভোলা যায়, কিন্তু মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের কষ্ট ভোলা যায় না।
বিকেলে একটা এনজিওর গাড়ি এসে থামল। তারা সেমাই, নতুন জামা আর কিছু খাবার বিতরণ করছিল। মায়া খুশিতে হাত বাড়াল। কিন্তু রাহিল জামাটা নিল না। সে শুধু জিজ্ঞেস করল, “আপনারা কি ওই বাসের শিশুদের জন্যও কিছু করবেন?”
লোকটি অবাক হয়ে বললেন, “ওরা তো চলে গেছে ভাই।”
রাহিল শান্ত গলায় বলল, “আমরাও তো চলে যাচ্ছি। প্রতিদিন একটু একটু করে। শুধু কেউ দেখছে না।”
সন্ধ্যায় আকাশে আবার চাঁদ উঠল। একই চাঁদ। কিন্তু এবার সেটা যেন আরও দূরের মনে হলো। রাহিল মায়াকে কাছে টেনে নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “মায়া, যদি কখনো আমরা এই রাস্তা থেকে বেরিয়ে যেতে পারি, তাহলে কাউকে রাস্তায় ফেলে রাখব না। কাউকে একা ঈদ কাটাতে দেব না।”
মায়া ঘুমিয়ে পড়ল তার কোলে। রাহিল চাঁদের দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। তার চোখে জল ছিল না। কিন্তু বুকের ভিতরে একটা গভীর ক্ষত তৈরি হচ্ছিল—যে ক্ষতের নাম ছিল সচেতনতা।
ঈদের চাঁদ সবার আকাশেই ওঠে।
কিন্তু যাদের ঘর নেই, যাদের স্বপ্ন ডুবে গেছে, যাদের ভবিষ্যৎ নেই—তাদের জন্য সেই চাঁদ শুধু একটা নীরব সাক্ষী হয়ে থাকে।
আর রাহিলের মতো শিশুরা প্রতি রাতে সেই চাঁদের দিকে তাকিয়ে একটা প্রশ্ন করে:
“আমাদের জন্যও কি কোনো ঈদ আসবে কখনো?”

