বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

রাজনীতির এক অদ্ভুত বাস্তবতা হলো—যে দল বিরোধীদলে থাকে, তারা সংবিধানের নানা ধারা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, পরিবর্তনের দাবি জানায়। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর একই দল আবার সেই সংবিধানকেই শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে।

Author

তৌফিক সুলতান , ঢাকা মেডিকেল ইনস্টিটিউট

প্রকাশ: ৩ এপ্রিল ২০২৬ পাঠ: ৯০ বার

সংবিধান, শাসন ও নৈতিকতা ফাঁদে পড়া রাষ্ট্রকাঠামো

বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে আলোচনায় আজ একটি অস্বস্তিকর সত্য সামনে আসে: সংবিধান কি জনকল্যাণের পথে বাধা, নাকি তা অপব্যবহারের শিকার হয়ে সেরূপ দেখা দিচ্ছে? উত্তরটি সরল নয়।

 

সমস্যা সংবিধানে নয়, প্রয়োগে

সংবিধান কখনোই সরাসরি কোনো কার্যক্রম নিষিদ্ধ বা অনুমোদনের তালিকা নির্ধারণ করে না। এটি একটি কাঠামো—যার ভেতর আইন প্রণয়ন, নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসন চলে। প্রকৃত সমস্যা তৈরি হয় যখন এই কাঠামোর প্রয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি দেখা দেয়।

ক্ষমতাসীন দল যখন নিজেদের সুবিধামতো আইন করে বা বিদ্যমান আইনের ব্যাখ্যা পরিবর্তন করে, তখন সংবিধান কার্যত তাদের নিয়ন্ত্রণযন্ত্রে পরিণত হয়। সাধারণ মানুষ তখন দেখে—সংবিধান যেন শক্তিশালীদের ঢাল, দুর্বলদের জন্য সীমাবদ্ধতা।

রাজনীতির দ্বৈত চরিত্র

এখানেই সবচেয়ে জটিল বাস্তবতা: বিরোধীদলে থাকা দল সংবিধানের নানা ধারা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, পরিবর্তনের দাবি জানায়। ক্ষমতায় গেলেই একই দল সেই সংবিধান আঁকড়ে ধরে। এই দ্বিমুখী অবস্থান সংবিধানকে নিরপেক্ষ কাঠামোর বদলে ক্ষমতার হাতিয়ারে পরিণত করে।

বাংলাদেশে সংবিধানের একাধিক সংশোধনী এসেছে—কখনো ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে, কখনো বিরোধী দল দুর্বল করতে, কখনো নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রভাবিত করতে। ফলে সংবিধান স্থিতিশীল নীতিমালার চেয়ে রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হয়ে উঠেছে।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংকট

একটি সুস্থ রাষ্ট্রের ভিত্তি হলো স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ। কিন্তু নিয়োগ, পদোন্নতি বা প্রশাসনিক প্রভাবে যদি বিচারব্যবস্থাকে প্রভাবিত করা হয়, তবে কাগজে-কলমে স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে পড়ে। আইন বিভাগও যখন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না হয়, আইনের শাসন দুর্বল হয়।

সমাধান কী?

কারও ধারণা, নতুন সংবিধান প্রণয়ন বা বিকল্প শাসনব্যবস্থা (যেমন খিলাফত) সমস্যার সমাধান করবে। কিন্তু ইতিহাস বলে—শুধু কাঠামো বদলালে হয় না। পৃথিবীতে সংবিধান বদলেছে, শাসনব্যবস্থা পাল্টেছে, কিন্তু প্রশাসনিক সততা, জবাবদিহিতা ও নৈতিক নেতৃত্ব না থাকলে কোনো ব্যবস্থাই টেকসই হয়নি।

প্রয়োজন দ্বিমুখী পদ্ধতি:
১. সংবিধানের অস্পষ্ট ও অপব্যবহারযোগ্য ধারা চিহ্নিত করে সংস্কার
২. রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করা

সংবিধান কোনো বাধা নয়, এটি পথনির্দেশক। সংকটের শেকড় সংবিধানে নয়—বরং আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে। একটি শক্তিশালী, নিরপেক্ষ ও সর্বজনগ্রাহ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলাই আসল চ্যালেঞ্জ। যেখানে সরকার ও বিরোধীদল উভয়েই সংবিধানের মৌলিক কাঠামো রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে।

রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তার সংবিধানে নয়—বরং সেই সংবিধানকে কে, কীভাবে ব্যবহার করে, তার ওপর নির্ভর করে একটি জাতির ভবিষ্যৎ। আইন নয়, মানুষের চরিত্রই শেষ পর্যন্ত জাতির গতি নির্ধারণ করে।

সংবিধান একটি আয়না সেখানে আমাদের রাজনৈতিক চরিত্র প্রতিফলিত হয়। সেই চরিত্র যত দুর্বল, যে কাঠো模ই দিই না কেন, ফল একই থাকবে।

লেখক: শিক্ষক & প্রতিষ্ঠাকালীন দপ্তর সম্পাদক, সমন্বিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে দৈনিক অনুসন্ধান নিউজ পোর্টাল পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!