“নবীন হৃদয়ের অপূর্ণ ইচ্ছার উপাখ্যান!”

মধ্যরাত, সবাই গভীর ঘুমে অচেতন। ঘুম নেই কেবল দু’টো চোখের পাতায়। চোখ-জোড়া চেয়ে আছে জানালা দিয়ে প্রবেশ করা একফালি সোনালি আলোর চাঁদটির দিকে। আজ পূর্ণিমা!
জোৎস্নার এমন অনুপম রূপ আর উঠানের দক্ষিণে থাকা হাসনাহেনা ফুলের সুবাসে বাইশ-বছরের এ যুবকের মনে এখন যে অনুভূতির সঞ্চারণ হচ্ছে, তা অবর্ণনীয়, অপার্থিব। এসবের মাঝে তার মন যেন বারবার ফিরে যেতে চাইছে সেই দেড়-সহস্রাব্দ বছর পেছনে—প্রিয় পয়গম্বরের সময়টাতে।
নিরেট বর্তমান আর অতীত-কল্পনার অন্তর্দ্বন্দ্বে এক সময় বর্তমানের সময়স্রোত থমকে দাঁড়ায়। খুলে যায় অতীতের সেই সোনালি পাঠ। মানসপটের সবুজ ক্যানভাসে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে এক অতি প্রাচীন ছবি। আদনান নিজেকে আবিষ্কার করতে থাকে সেই স্বর্ণযুগে।
সোনার চাদরের মতো শুভ্র মরুভূমি। অচেনা এক সৌরভ ছড়িয়ে আছে বাতাসে। আদনানের মন ভেসে চলে কালের সেই স্রোতে। সে অনুভব করে, সে দাঁড়িয়ে আছে মদিনার মাটিতে। এখানেই প্রিয় রাসুলুল্লাহর নির্মল হাসি বাতাসে ছড়াত মিষ্টি ফুলের সৌরভ! তিনি প্রত্যহ খেলার সাথী হতেন ছোট্ট শিশুদের। আদনানের মন চায়, সে ছুটে যায় এ শহরের অলিগলি, হাট-বাজারে। এসব জায়গাতেই হয়তো লেগে আছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পদচিহ্ন। প্রিয় সাহাবাগণও ঘুরে বেড়িয়েছেন একসময় এসব পথে।
আদনান ভাবে, সে যদি একবারের জন্যও রাসুলুল্লাহর সাক্ষাৎ পেত, তবে কী সে প্রিয় নবিজির সামনে গিয়ে বলতে পারত—ফিদা-কা আবি ওয়া উম্মি, ইয়া রাসুলাল্লাহ!
আদনান শুনতে পায়, মদিনার বাতাসে ছন্দের তালে ভেসে আসা মধুর সুর। এই বুঝি হযরত বিলাল কোথাও আজান দিচ্ছেন! আদনানের মনে হয়, একটি বার যদি সে হযরত বিলালের দেখা পেত, তখন কী সে পারত অকপটে বিলালের হাতখানা ধরে বলতে—আপনি ইসলামের জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তা আজও মুসলিম জাতির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ।
আদনান নিজেকে হঠাৎ আবিষ্কার করে রক্তক্ষয়ী উহুদের সেই মাঠে। চতুর্দিক থেকে শত্রুর মুহুর্মুহু আক্রমণ হচ্ছে, বীরদর্পে লড়ে যাচ্ছেন নবিজি সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবায়ে কিরাম (রাদিআল্লাহু আনহুম)।
অকস্মাৎ শত্রুপক্ষের তীর ছুটে এলো ঝাঁকে ঝাঁকে। সাহাবীরা ছুটে এসে গোল হয়ে ধরেছেন প্রিয় নবিজিকে তীরের আক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিতে। ইস! আদনান যদি থাকত সে সময়টাতে, তবে সে কী পারত নিজেকে শামিল করতে—দৌড়ে গিয়ে নিজের শরীরখানা ঢাল হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেওয়া সাহাবাদের দলটাতে?
হ্যাঁ, আদনান পারত বটে! একবার, শুধু একবার যদি সে প্রিয় রাসুলুল্লাহর সাক্ষাৎ পেত, একটিবারের জন্য সে যদি ওই বরকতময় হাতের স্পর্শ পেত, তাহলে আদনান অনায়াসে নবী সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য নিজের প্রাণ উৎসর্গ করে দিত।
হঠাৎ তীব্র আলোর ঝলকানিতে আদনানের কল্পনায় ছেদ পড়ে। অন্তর্জগৎ আর বাস্তবতার মাঝে তৈরি হয় অন্তরাল। সে ফিরে আসে বর্তমানে। একটু ধাতস্থ হতেই আদনান বুঝতে পারে, খানিকক্ষণ আগের মেঘমুক্ত আকাশ এখন ছেয়ে গেছে কালো মেঘে। বৃষ্টির পূর্বাভাস জানাচ্ছে এমন তড়িৎঝলকানি।
প্রকৃতি বড় রহস্যময়ী! কখন যে শান্ত রূপ থেকে অশান্ত হয়ে উঠবে, তার হদিস কে-ই বা রাখে? তবে ধরিত্রীর বুকে বারিধারা নামবার আগেই তা নামল আদনানের চোখজুড়ে। এ অশ্রু শান্ত, শীতল—অন্য সময়ের মতো উষ্ণ নয়। তার হৃদয় চিরে একটি মাত্র হাহাকারই উঠে এলো—হায়! কল্পনা যদি সত্যিই বাস্তবে রূপ নিত!

