বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

উন্নয়নের আড়ালে সবুজের নিঃশব্দ মৃত্যু

Author

Nayma Sultana, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় , গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২১ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ৩৪ বার

উন্নয়নের আড়ালে সবুজের নিঃশব্দ মৃত্যু
নাঈমা সুলতানা

মানবসভ্যতার পরিক্রমায় ‘উন্নয়ন’ শব্দটিকে আমরা বরাবরই অগ্রগতির সমার্থক হিসেবে উদযাপন করে এসেছি। কিন্তু সেই অগ্রগতির সৌধ যখন অরণ্যের বিনাশ আর প্রকৃতির ধ্বংসের আর্তনাদের ওপর নির্মিত হয়, তখন তা কেবল সাফল্যের জয়গান থাকে না। রূপ নেয় এক ঐতিহাসিক বিপ্রতীপে, হয়ে ওঠে মানবজাতির এক করুণ আত্মবিরোধিতার মহাকাব্য। আজকের বিপন্ন বনভূমি, বৃক্ষ নিধন বা বনভূমি উজাড় সেই মরীচিকার উন্নতির পিঠে এক নির্মম সত্যের প্রতিচ্ছবি।

সময়ের আবর্তনে ক্যালেন্ডারে ফুটে ওঠা একটি দিন ২১ মার্চ, “আন্তর্জাতিক বন দিবস”, যা নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয় বরং প্রকৃতির সাথে হওয়া অবিচারের ব্যাপারে আত্মসমালোচনার নীরব আহ্বান- যেখানে অরণ্য সংরক্ষণ আমাদের অস্তিত্বের অন্তর্লিখিত শর্ত হিসেবে সামনে আসে। বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে এই দিবস যেন এক অনিবার্য প্রশ্ন তুলে ধরে- আমরা কি সত্যিই উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, নাকি উন্নয়নের মুখোশে প্রকৃতির ক্রমাগত ক্ষয়কে স্বাভাবিক করে তুলছি? উন্নয়ন যেন ক্রমে এমন এক একমাত্রিক বয়ানে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রকৃতি কেবল উপকরণ, অংশীদার নয়। রাষ্ট্রীয় অগ্রগতির দৃশ্যপটে আজ সড়ক প্রসারিত হয়, অবকাঠামো উঁচু হয়, অর্থনীতির গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী হয়; কিন্তু এই দৃশ্যমান উত্থানের অন্তরালে আরেকটি নীরব অবনমন ঘটে-বনভূমি সংকুচিত হয়, বন উজাড় চলে, পাহাড় তার স্থিতি হারায়, আর জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যায় পরিসংখ্যানের বাইরে, প্রায় অদৃশ্য এক ইতিহাসে।কিন্তু প্রকৃতির এই কান্না দেখার ক্ষেত্রেই আজ আমাদের উদাসীনতা। আমাদের উন্নয়ন কি সহাবস্থানের ভিত্তিতে নির্মিত, নাকি এটি এমন এক অগ্রযাত্রা, যা নিজের ভিত্তিকেই নিঃশব্দে ক্ষয় করে? আজ এই প্রশ্নটি তাই মানসপটে বিড়ম্বনা সৃষ্টি করে চলেছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সংকট সমতল ভূমির পাশাপাশি সবচেয়ে তীব্রভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে পাহাড়ি বনভূমিতে। পার্বত্য অঞ্চলের যে বনগুলো একসময় ছিল একেকটি জীবন্ত ইকোসিস্টেম- গাছ, মাটি, পানি, প্রাণী ও মানুষ এক সমন্বিত জীবনের অংশ ছিল। সে গহীন অরণ্যগুলোই বর্তমানে অপরিকল্পিত সড়ক নির্মাণ, ভূমি দখল, পর্যটন কেন্দ্রের সম্প্রসারণ, শিল্পায়নের চাপ এবং একফসলি বৃক্ষরোপণের কারণে দ্রুত তাদের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য হারাচ্ছে। পাহাড়ি অঞ্চলে জুম চাষের পরিবর্তিত রূপ এবং একফসলি বনায়নের সম্প্রসারণও এই সংকটকে জটিল করে তুলেছে। একফসলি বনায়ন আপাতদৃষ্টিতে দেখতে সবুজ হলেও,প্রকৃতপক্ষে একটি জীববৈচিত্র্যহীন পরিবেশ সৃষ্টি করে। জন্ম নেয় “সবুজ মরুভূমি”, যেখানে প্রাকৃতিক বনভূমির জটিলতা ও প্রাণবৈচিত্র্যের স্থান নেই। এই বৃক্ষ নিধন তথা বন উজাড়ের প্রভাব বিশ্লেষণ করলে আমরা এর বহুমাত্রিক এবং গভীর সমস্যা দেখতে পাই। প্রথমত, জীববৈচিত্র্যের ওপর এর প্রভাব অপরিমেয়। অসংখ্য প্রজাতি তাদের আবাসস্থল হারিয়ে ফেলছে। অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে এমনভাবে, যা আমরা নথিভুক্ত করার আগেই হারিয়ে ফেলছি বা “নীরব বিলুপ্তি” ঘটছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। দ্বিতীয়ত, বন উজাড় জলবায়ু ব্যবস্থার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বনভূমি কার্বন শোষণের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড এর ভারসাম্য রক্ষা করে। যখন বন ধ্বংস হয়, তখন এই ভারসাম্য ভেঙে পড়ে, কার্বন নিঃসরণ বাড়ে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং ফলশ্রুতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের গতি ত্বরান্বিত হয়। তৃতীয়ত, স্থানীয় পরিবেশগত প্রভাব, যা আরও গুরুতর এবং তাৎক্ষণিক ক্ষতির। পাহাড়ি এলাকায় বন উজাড়ের ফলে ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে, ইতোমধ্যেই বহু প্রাণহানির কারণ হয়েছে। মাটির পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট দেখা দিচ্ছে, আবার বর্ষায় আকস্মিক বন্যার প্রবণতা বাড়ছে। অর্থাৎ, একটি বন ধ্বংস মানে একটি সম্পূর্ণ ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়া। চতুর্থত, এই সংকটের একটি গভীর সামাজিক মাত্রা রয়েছে। বননির্ভর জনগোষ্ঠী বিশেষত পাহাড়ি আদিবাসীরা তাদের জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি এবং পরিচয়ের ভিত্তি হারাচ্ছে। বন তাদের কাছে কেবল সম্পদ নয়; একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়, উপার্জনের ক্ষেত্র এবং জীবনব্যবস্থার ভিত্তি। সেখানে বন উজাড় মানে একটি নীরব সাংস্কৃতিক বিলুপ্তিও বটে।

এমতাবস্থায় বন সংরক্ষণ আর কেবল পরিবেশবাদীদের এজেন্ডা হিসেবে সীমাবদ্ধ নাই, এখন এটি বৈশ্বিক অভিযোজনে টিকে থাকার কৌশল। যার সমাধান খোঁজার জন্য আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। যেমন- উন্নয়ন পরিকল্পনায় ইকোসিস্টেম-ভিত্তিক পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে, যেখানে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করা হবে একটি কেন্দ্রীয় শর্ত হিসেবে। এছাড়াও, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নকে (EIA) কার্যকর, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক করতে হবে, বনভূমি সংরক্ষণে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং অবৈধ দখল ও কাঠ আহরণ বন্ধে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। একাজে পাহাড়ি বন ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তাদের ঐতিহ্যগত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা টেকসই বন ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যা কমিউনিটি-ভিত্তিক বন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। পাশাপাশি, একফসলি বনায়নের পরিবর্তে প্রাকৃতিক বন পুনরুদ্ধারে জোর দিতে হবে। স্থানীয় প্রজাতির গাছ রোপণ, ক্ষতিগ্রস্ত বনভূমির পুনর্বাসন এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গবেষণা ও বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রচেষ্টা চালাতে হবে। জরুরি যে, আমাদের উন্নয়নের ধারণাকে পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। উন্নয়ন যদি প্রকৃতিকে ধ্বংস করে, তবে তা টেকসই নয়; বরং এটি ভবিষ্যতের সংকটকে ত্বরান্বিত করে। আমাদের এমন এক উন্নয়ন মডেলের দিকে যেতে হবে, যেখানে অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং পরিবেশগত স্থিতিশীলতা একসাথে সমন্বিত হবে। অন্যথায় আমরা খুব শীঘ্রই এমন এক বাস্তবতায় পৌঁছাবো, যেখানে উন্নয়ন থাকবে, কিন্তু টিকে থাকার মতো প্রকৃতি থাকবে না।

যদিও তাৎপর্যপূর্ণ সত্যটি হলো, এই সংকটের মাঝেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আমাদের সামনে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। দেশে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি বনভূমি পুনরুদ্ধারে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে; উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ পুনরোপণ ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। বন সংরক্ষণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের গুরুত্ব এখন নীতিনির্ধারণের আলোচনায় জায়গা করে নিচ্ছে। একই সঙ্গে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ আইন এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিকল্পনার মতো উদ্যোগগুলো একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বন সংরক্ষণ এখন আর প্রান্তিক কোনো ইস্যু নয়; জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার কেন্দ্রীয় কৌশল হিসেবেই এটি বিবেচিত হচ্ছে। ফলে বৈশ্বিক সহায়তা, গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতিও ধীরে ধীরে এই খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

তবে এই অর্জনগুলো তখনই অর্থবহ হবে, যখন এগুলোকে বিচ্ছিন্ন সাফল্য হিসেবে নয়, বরং আমরা একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির অংশ হিসেবে বাস্তবায়ন করতে পারবো । আশার জায়গাটি হলো – প্রকৃতি এখনো সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যায়নি এবং মানুষ এখনো শেখার সক্ষমতা হারায়নি। সঠিক নীতি, জবাবদিহিমূলক শাসন এবং সচেতন নাগরিক অংশগ্রহণ একত্রিত হলে বনভূমি পুনরুদ্ধার সম্ভব, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সম্ভব, এমনকি উন্নয়নের সংজ্ঞাকেও নতুনভাবে গড়ে তোলা সম্ভব। উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে যে কৃত্রিম বিভাজন আমরা তৈরি করেছি, তা ভেঙে দিয়ে আমাদের এমন এক পথ খুঁজতে হবে, যেখানে অগ্রগতি ও সংরক্ষণ একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে।

আন্তর্জাতিক বন দিবস আমাদের সামনে যে বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটায়, তা কেবল পরিবেশগত আলাপ নয়, সভ্যতার আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। আমরা কি এমন এক উন্নয়নের পথে হাঁটবো, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি জীবন্ত পৃথিবী রেখে যাবে, নাকি এমন এক অগ্রগতির ভ্রমে আবদ্ধ থাকব, যা শেষ পর্যন্ত নির্জীব শূন্যতার দিকে নিয়ে যায়? সিদ্ধান্ত আমাদেরই এবং সেই সিদ্ধান্তের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের ভবিষ্যৎ ইতিহাস। পৃথিবীকে নবজাতকের জন্য বাসযোগ্য করে যাবো এই অঙ্গীকারই ব্যক্ত হোক আজ, সবুজের কোলেই লালিত হোক আমাদের প্রকৃতি।

লেখক: দপ্তর সম্পাদক, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২১ মার্চ ২০২৬ তারিখে মূলধারা পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!