নদীকৃত্য দিবসে হোক বদ্বীপ রক্ষার প্রতিজ্ঞা

নদীকৃত্য দিবসে হোক বদ্বীপ রক্ষার প্রতিজ্ঞা
নাঈমা সুলতানা
সহস্র সভ্যতার স্মৃতি, মানবজীবন ও প্রকৃতির অবিচ্ছিন্নতার সুরের এই ‘নদীমাতৃক বাংলাদেশ’ পরিচয়টি বদ্বীপের ভৌগোলিক অবস্থানের বর্ণনার পাশাপাশি একটি গতিশীল প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রকেও ইঙ্গিত করে। বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, কৃষি উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর ভিত্তিসমূহ মূলত নদীকেন্দ্রীক। তাই প্রতিবছর মার্চ মাসের দ্বিতীয় রবিবার বিশ্বব্যাপী পালিত হয় International Day of Action for Rivers, বাংলায় যা ‘আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস’ হিসেবে বিবেচিত।
এই দিনটি কেবলই নদী নিয়ে প্রতীকী আলোচনা করার দিন নয়; নদীকে ঘিরে মানবসভ্যতার অস্তিত্ব, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং টেকসই উন্নয়নের প্রশ্নকে জনসম্মুখে তুলে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। তাই নদীকে কেবল জলধারা হিসেবে চিন্তা না করে, একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোলজিক্যাল সিস্টেম হিসেবে বোঝা জরুরি।
দেশের বহু শিল্পকারখানা এখনো কার্যকর বর্জ্য শোধনাগার ছাড়া বর্জ্য নদীতে ফেলছে, যা নদীর পানির গুণগত মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। শিল্পবর্জ্য ও রাসায়নিক দূষণ নদীর পানির স্বাভাবিক বর্ণ, গন্ধ এবং আণবিক গঠন পরিবর্তন করছে। ভারী ধাতু, যেমন সীসা, ক্রোমিয়াম বা ক্যাডমিয়াম নদীর পানিতে জমা হচ্ছে এবং জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃত্যু ঘটিয়ে বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে
বাংলাদেশে প্রায় সাতশোটিরও বেশি নদী ও শাখা-প্রশাখা রয়েছে, যা দেশের পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য তৈরি করেছে এক অনন্য জলজ নেটওয়ার্ক । ইতিহাসের আবর্তনে যদি দৃষ্টিপাত করি তাহলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের নদীগুলো মূলত হিমালয় উৎসারিত বৃহৎ নদী অববাহিকার অংশ। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকা পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ নদী ব্যবস্থা, যা প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ পলিমাটি বহন করে এই বদ্বীপ অঞ্চলে জমা করে। এই পলিমাটিই বাংলাদেশের কৃষিজমিকে উর্বর করে এবং ভূমির স্বাভাবিক পুনর্গঠন ঘটায়। অতীতে এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ ছিল। ফলে বাংলাদেশের নদীগুলো স্বাভাবিক গতিপথে প্রবাহিত হয়ে নাব্যতা, পর্যাপ্ত জলস্রোত এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম ছিলো।
কিন্তু নদীমাতৃক দেশের বর্তমান সময়ে দৃশ্যপট নিদারুণ বেদনার। দূষণজনিত এবং মানবসৃষ্ট কারণে আজ বাংলাদেশের বৃহৎ নদীগুলোও বহুমাত্রিক সংকটের মুখে পড়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বহু শিল্পকারখানা এখনো কার্যকর বর্জ্য শোধনাগার ছাড়া বর্জ্য নদীতে ফেলছে, যা নদীর পানির গুণগত মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। শিল্পবর্জ্য ও রাসায়নিক দূষণ নদীর পানির স্বাভাবিক বর্ণ, গন্ধ এবং আণবিক গঠন পরিবর্তন করছে। ভারী ধাতু, যেমন সীসা, ক্রোমিয়াম বা ক্যাডমিয়াম নদীর পানিতে জমা হচ্ছে এবং জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃত্যু ঘটিয়ে বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। এমনকি তা খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে বায়োম্যাগনিফিকেশন প্রক্রিয়ায় মানুষের শরীরেও প্রবেশ করছে। দ্বিতীয়ত, নদী দখল ও ভরাট নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে ব্যাহত করছে। নদীর পানির প্রবাহের গতি পরিবর্তিত হচ্ছে, যার ফলে কোথাও অতিরিক্ত নদীভাঙন, কোথাও অস্বাভাবিক পলি জমা হওয়ার ঘটনা ঘটছে, নদী তার নাব্যতা হারাচ্ছে। অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন নদীর তলদেশের স্বাভাবিক গঠন নষ্ট করে। এতে নদীর মরফোলজি পরিবর্তিত হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে নদীর প্রবাহপথকে অস্থিতিশীল করে তোলে। তৃতীয়ত, প্লাস্টিক দূষণ নদীর জলজ বাস্তুতন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নদীতে জমে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিক জলজ প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করে তাদের স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত করছে এবং পরবর্তীতে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানবস্বাস্থ্যের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথাপি, নদীর এই অবক্ষয় কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট। কেননা,নদীর পানির গুণগত মান নষ্ট হলে মৎস্যসম্পদের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে। অনেক সংবেদনশীল মাছ দূষিত পানিতে বেঁচে থাকতে পারে না, ফলে নদীর জীববৈচিত্র্য দ্রুত কমে যায়। এছাড়াও, নদীর নাব্যতা কমে গেলে নৌপরিবহন ব্যাহত হয়, যা বাংলাদেশের মতো নদীনির্ভর দেশের জন্য অর্থনৈতিকভাবে বড় ক্ষতির কারণ। এমনকি, নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে নদীভাঙ্গন, বন্যা ও জলাবদ্ধতার মতো দূর্যোগের ঝুঁকি বাড়ে। পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, নদীর স্বাভাবিক ফ্লাডপ্লেইন ফাংশন নষ্ট হলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা ও ধ্বংসযজ্ঞ বাড়তে পারে। বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন অনেকাংশেই নির্ভর করছে নদীর সুস্থতার ওপর। নদী যদি তার প্রাকৃতিক প্রবাহ ও পরিবেশগত ভারসাম্য হারায়, তবে কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা- সবই ঝুঁকির মুখে পড়বে।
তাহলে সমাধানের পথ অনুসরণ কি একেবারেই অসম্ভব? উত্তরটি আশাব্যাঞ্জক; তা হলো, বাস্তব ও বিজ্ঞানভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা এই সমস্যার উত্তরণ ঘটাতে পারে। নদী রক্ষার জন্য কেবলমাত্র প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়, বরং বিজ্ঞানভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। এক্ষেত্রে, শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর পরিবেশ আইন প্রয়োগ এবং কার্যকর এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ETP) নিশ্চিত করা জরুরি।
এছাড়াও, নদী দখলমুক্ত করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহপথ পুনরুদ্ধার করা এবং নদীকে একটি জীবন্ত বাস্তুসত্তা হিসেবে বিবেচনা করে নদী রক্ষার আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বাস্তবায়ন হিসেবে সরকারি উদ্যোগে নদীর নাব্যতা রক্ষায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ড্রেজিং পরিচালনা করতে হবে, যাতে নদীর স্বাভাবিক সেডিমেন্ট পরিবহন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। সর্বোপরি, সমন্বিত রিভার বেসিন ম্যানেজমেন্ট পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে, যেখানে নদীকে তার উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত একটি সমন্বিত পরিবেশব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করে নাব্যতা রক্ষা ও প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। সর্বস্তরে জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে নদী সুরক্ষার আহ্বান জানানোও এক্ষেত্রে অনিবার্য।
নদীর স্রোত থেমে গেলে কেবল পানির প্রবাহ নয়, থেমে যাবে সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা, অর্থনীতির গতিশীলতা এবং প্রকৃতির ভারসাম্য। আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবসে তাই আমাদের উপলব্ধি হওয়া উচিত, নদীর সুরক্ষা নিশ্চিত করার অর্থ মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করে তোলা। নদী রক্ষার এই দায়িত্ব কেবল রাষ্ট্রের একার নয়, বরং এটি আমাদের সর্বসাধারণের সম্মিলিত দায়িত্ব – যা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে টিকিয়ে রাখার এক অনিবার্য অঙ্গীকার।

