বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

পরিবেশ সুরক্ষায় বৈশ্বিক মানদণ্ডে বাংলাদেশ

Author

Nayma Sultana, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় , গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ৩ এপ্রিল ২০২৬ পাঠ: ২২ বার

পরিবেশ সুরক্ষায় বৈশ্বিক মানদণ্ডে বাংলাদেশ
নাঈমা সুলতানা

প্রকৃতির শ্বাশত সৌন্দর্যের অনুষঙ্গের বাইরেও- পরিবেশ আজ সভ্যতার টিকে থাকার মৌলিক ভিত্তি, রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দু এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভাগ্যরেখা হিসেবে রূপ লাভ করেছে। পরিবেশ আজ আর কেবল নীতিগত আলোচনার বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার একটি কেন্দ্রীয় অক্ষ, যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্রের কার্যক্রম মূল্যায়িত হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক কাঠামোর ভেতরে। এই কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জাতিসংঘ- যার অধীনে পরিবেশ সুরক্ষার জন্য গড়ে উঠেছে এক বিস্তৃত নীতিমালা, চুক্তি এবং পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা,বায়ুর অদৃশ্য বিষ, নদীর নিঃশ্বাসরুদ্ধ যন্ত্রণা এবং বিলুপ্তির পথে ছুটে চলা জীববৈচিত্র্য – সবকিছু মিলিয়ে পৃথিবী যেন এক নীরব সংকটের মধ্যে প্রবেশ করছে। এই বৈশ্বিক বাস্তবতায় জাতিসংঘ যে পরিবেশগত মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে, তা কেবল একটি নীতিগত কাঠামো নয় বরং টেকসই ভবিষ্যতের জন্য এক অপরিহার্য রোডম্যাপ। সেই মানদণ্ডে বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে,বৈশ্বিক মানদণ্ডে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা, সীমাবদ্ধতা এবং সম্ভাবনার একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি তুলে ধরা তাই সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান। কেননা, একদিকে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর শীর্ষে, অন্যদিকে অভিযোজন সক্ষমতার এক অনন্য উদাহরণ। এই দ্বৈত বাস্তবতার ভেতরেই নিহিত বাংলাদেশের পরিবেশগত অবস্থানের জটিলতা।

জাতিসংঘের পরিবেশ সংক্রান্ত কার্যক্রমের মূল চালিকাশক্তি হলো জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি এবং বৈশ্বিক উন্নয়নের রূপরেখা নির্ধারণকারী টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা(এসডিজি) । এই কাঠামোর অধীনে এসডিজি ১৩ (জলবায়ু পদক্ষেপ), এসডিজি ১৪(জলজ সম্পদ সংরক্ষণ) এবং এসডিজি ১৫ (স্থলজ বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ) সরাসরি পরিবেশগত অগ্রগতির সূচক হিসেবে বিবেচিত। পাশাপাশি, প্যারিস এগ্রিমেন্ট জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দেশগুলোর নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি নির্ধারণ করে। বাংলাদেশ এই আন্তর্জাতিক কাঠামোর একটি সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। বিশেষত United Nations Framework Convention on Climate Change-এর আওতায় বাংলাদেশ “Climate Vulnerable Forum”-এর অন্যতম দৃঢ় কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ফোরামে অভিযোজন বা এডাপটেশন ইস্যুকে জোরালোভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে, যা বৈশ্বিক আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ন্যারেটিভ। তবে সূচকগুলোর কিছু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখালেও সামগ্রিকভাবে এখনো একটি অসম্পূর্ণ অভিযাত্রার মধ্যেই রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্জনের কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে অভিযোজন সক্ষমতার প্রসঙ্গ। তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, অভিযোজন সক্ষমতায় বাংলাদেশ অনেক উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় এগিয়ে। ভিয়েতনাম এবং ফিলিপাইনের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে দৃশ্যমান হয়, বাংলাদেশ দুর্যোগ প্রস্তুতি ও কমিউনিটি-ভিত্তিক অভিযোজনে একটি কার্যকর মডেল তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং উপকূলীয় বনায়ন এসব উদ্যোগ জাতিসংঘের বিভিন্ন রিপোর্টে প্রশংসিত হয়েছে। এছাড়াও ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী, জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তির বিস্তার, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে সৌরশক্তির বিস্তার গ্রামীণ জীবনে এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে, এই পলিসিগুলোর বাস্তবায়ন কি মাঠপর্যায়েও একই মাত্রায় প্রতিফলিত হচ্ছে?কেননা, মিটিগেশন বা দূষণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন,জমেছে কিছু গভীর ও কাঠামোগত সংকট, যা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
ঢাকার বায়ুদূষণে আজ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিরাপদ সীমার বহু গুণ বেশি দূষিত বায়ু প্রতিদিন নাগরিকদের শ্বাসপ্রশ্বাসে প্রবেশ করছে। ইটভাটা, অপ্রতুল নির্গমন নিয়ন্ত্রণ, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং নির্মাণকাজের ধুলাবালি সব মিলিয়ে বায়ু যেন এক অদৃশ্য বিষাক্ত আবরণে পরিণত হয়েছে। এটি শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়; এটি উৎপাদনশীলতা, অর্থনীতি এবং জীবনমানের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে। নদনদী যা একসময় বাংলাদেশের প্রাণপ্রবাহ ছিল- আজ তা অনেক ক্ষেত্রেই দূষণের ভারে জর্জরিত। শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিক এবং অপরিকল্পিত নগর বর্জ্য নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও জীববৈচিত্র্যকে বিপন্ন করছে। জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী একটি নদীকে কেবল জলধারা হিসেবে নয়, একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র হিসেবে সংরক্ষণ করা জরুরি- যেখানে বাংলাদেশ এখনো কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। বনভূমি ও জীববৈচিত্র্যে সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও রয়েছে সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুতর সংকট। কৃষিজমির পরিমাণ হ্রাস,প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হয়ে কৃত্রিম বনায়নের বিস্তার জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারছে না।
এই বিপ্রতীপ বাস্তবতা একটি বিষয় স্পষ্ট করে যে, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতিতে সক্রিয় ঠিকই কিন্তু বাস্তবায়নে এখনো কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। যা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন কৌশলগত, সমন্বিত এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ পদক্ষেপ।
প্রথমত, জাতিসংঘের কাঠামোর সঙ্গে অভ্যন্তরীণ নীতির বাস্তব সংযোগ স্থাপন করতে হবে। SDGs বা Paris Agreement কেবল আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি হিসেবে নয়; বরং জাতীয় বাজেট, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্মপরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করতে হবে। দূষণকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে “জিরো টলারেন্স” নীতি গ্রহণ, পরিবেশ আদালতের কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
দ্বিতীয়ত, ডেটা-ভিত্তিক পরিবেশ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। UNEP এবং অন্যান্য সংস্থার সহায়তায় রিয়েল-টাইম দূষণ মনিটরিং, স্যাটেলাইট ডেটা ব্যবহার এবং ওপেন ডেটা প্ল্যাটফর্ম চালু করা গেলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও কার্যকর হবে। নগর ব্যবস্থাপনায় পরিবেশকে কেন্দ্রস্থলে আনতে হবে। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, সবুজ অবকাঠামো বৃদ্ধি, এবং নির্মাণ খাতে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির বাধ্যতামূলক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসারে নীতিগত প্রণোদনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়াতে হবে। Green Climate Fund-এর মতো তহবিল থেকে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সুবিধা পেলেও তা আরও কৌশলগতভাবে ব্যবহার করা প্রয়োজন বিশেষত নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নগর পরিকল্পনায়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন আনা ছাড়া বিকল্প নেই। উৎস পর্যায়ে বর্জ্য পৃথকীকরণ, প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা এবং বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদনের প্রযুক্তি বিস্তৃত করতে হবে। এটি শুধু দূষণ কমাবে না; বরং অর্থনীতিতেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।
চতুর্থত, জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে পরিবেশ বিষয়ক চিন্তায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষা কেবল নীতিনির্ধারকদের কাজ নয়; এটি নাগরিক আচরণের অংশ হওয়া জরুরি। শিক্ষা, গণমাধ্যম এবং সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবেশ সচেতনতা একটি সাংস্কৃতিক চর্চায় পরিণত করতে হবে। তুলনামূলক শিক্ষাকে নীতিতে রূপান্তর করতে হবে। দিল্লির বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, নেদারল্যান্ডসের পানি ব্যবস্থাপনা বা ভিয়েতনামের উপকূলীয় অভিযোজন এসব উদাহরণ থেকে শেখা এবং তা স্থানীয় বাস্তবতায় প্রয়োগ করা জরুরি।
সর্বোপরি, বাংলাদেশকে একটি “policy-driven state” থেকে “implementation-driven state”-এ রূপান্তর করতে হবে। কারণ, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে নাগরিক জীবনে তার বাস্তব প্রয়োগ ও প্রভাবের উপর।
পরিবেশ সুরক্ষার বৈশ্বিক মানদণ্ডে বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। প্রকৃতি যখন বিচার করে, তখন সে কোনো সীমানা বা অর্থনীতি মানে না, তাঁর বিচার সর্বজনীন ও নির্মম। আমরা যদি আজ প্রকৃতিকে রক্ষা না করি, তবে কাল প্রকৃতি আমাদের অস্তিত্বের কোনো চিহ্ন রাখবে না। জাতিসংঘের কাঠামো আমাদের যে একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে, এখন প্রয়োজন সেই পথ ধরে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাওয়ার। সঠিক কৌশল, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সমন্বয়ে বাংলাদেশ কেবল অনুসারী নয় বরং ভবিষ্যতে একটি পথপ্রদর্শক রাষ্ট্র হিসেবেও আত্মপ্রকাশে সক্ষম হবে। এই লড়াই শুধুমাত্র পরিবেশ বাঁচানোর নয়- এটি টিকে থাকার, নেতৃত্ব দেওয়ার এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের লড়াই।

লেখক: দপ্তর সম্পাদক, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে রূপালী বাংলাদেশ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!