রক্তিম শৃঙ্খলে বন্দি বিবেক:একটি বিদ্যাপীঠ ও ফ্যাসিবাদের বোঝা সাথে নিয়েপথ চলার মুহূর্ত
রক্তিম শৃঙ্খলে বন্দি বিবেক: একটি বিদ্যাপীঠ ও ফ্যাসিবাদের বোঝা সাথে নিয়েপথ চলার মুহূর্ত
ভূমিকা: স্বপ্নের অপমৃত্যু ও পিঞ্জরের হাতছানি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল ইটের প্রতিটি স্থাপত্য, প্রতিটি স্তম্ভ যখন বাঙালির সুদীর্ঘ মুক্তির ইতিহাসের নীরব সাক্ষ্য বহন করে, তখন গত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে সেই একই ঐতিহ্যবাহী প্রাঙ্গণ পরিণত হয়েছিল এক প্রজন্মের স্বপ্ন ও সম্ভাবনার মানসিক বধ্যভূমিতে। উচ্চশিক্ষার আলোকবর্তিকা হাতে নিয়ে যে তরুণটি চোখে অজস্র স্বপ্ন আর বুকভরা আশা নিয়ে এই পবিত্র আঙিনায় প্রথম পা রেখেছিল, তাকে শুরুতেই স্বাগত জানানো হয়েছিল ‘গণরুম’ নামক এক অমানবিক, অস্বাস্থ্যকর এবং পীড়াদায়ক প্রকোষ্ঠে। যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থীর নিজস্বতা, স্বকীয়তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নির্মমভাবে লুণ্ঠিত হতো এবং শুরু হতো এক দীর্ঘস্থায়ী, মানসিক দাসত্বের সুদূরপ্রসারী পাঠ। এই প্রবন্ধটি কেবল কোনো ব্যক্তিগত দুঃখগাথা বা বিচ্ছিন্ন রোদন নয়, বরং একটি সুসংগঠিত, দমনমূলক ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে যাওয়া হাজারো শিক্ষার্থীর সম্মিলিত যন্ত্রণার এক মর্মস্পর্শী দালিলিক আখ্যান, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সতর্ক করে তোলার জন্য অপরিহার্য।
গণরুম: যেখানে মনুষ্যত্ব নিলাম হতো
গণরুম কেবল একটি গাদাগাদি করে বহু মানুষকে একসাথে থাকার সাধারণ জায়গা ছিল না; এটি ছিল ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার প্রাথমিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, যেখানে শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোকে কাজে লাগানো হতো। এক একটি সংকীর্ণ কক্ষে যখন ৪০-৫০ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে পশুর মতো ঠাসাঠাসি করে থাকতে বাধ্য করা হতো, তখন সেটি কেবল স্থানের অভাবজনিত সমস্যা ছিল না, বরং ছিল একজন শিক্ষার্থীর আত্মসম্মানকে নির্মমভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রথম পরিকল্পিত পদক্ষেপ। সেখানে শান্ত পরিবেশে পড়াশোনার কোনো সুযোগই ছিল না, ছিল কেবল রাজনৈতিক বড় ভাইদের উচ্চকিত, কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর আর মিছিলে যাওয়ার অলিখিত কিন্তু বাধ্যতামূলক পরোয়ানা। বিছানার প্রতিটি ইঞ্চি দখলের জন্য একজন ছাত্রকে যখন তার সহজাত বিবেক, নীতিবোধ ও মানবিক মূল্যবোধ বিসর্জন দিতে হতো, তখনই ফ্যাসিবাদের প্রথম জয় সুনিশ্চিত হতো, যা তাদের মানসিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিত। এই পরিবেশে জন্ম নিত হতাশা, ক্ষোভ আর এক ধরনের আত্মসমর্পণ, যা তাদের প্রতিবাদী সত্তাকে ক্রমশ বিলীন করে দিত।
গেস্টরুম: মধ্যরাতের অন্ধকার ও পৈশাচিকতার উল্লাস
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচেয়ে কালো এবং বিভীষিকাময় অধ্যায়টি রচিত হতো মধ্যরাতের নির্জন প্রহরের ‘গেস্টরুম’গুলোতে। যখন পুরো ঢাকা শহর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন এবং নিস্তব্ধতায় নিমগ্ন থাকত, তখন হলের দীর্ঘ করিডোরগুলো প্রকম্পিত হতো বুটের কর্কশ শব্দে আর ক্ষমতাপ্রাপ্তদের অট্টহাসিতে। গেস্টরুম ছিল এক অন্ধকার বিচারালয়, যেখানে আইনের শাসন নয়, চলত ক্ষমতার নির্মম স্বেচ্ছাচারিতা; বিচারক ছিলেন একদল বিবেকহীন, ক্ষমতাধর ক্যাডার, আর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতো প্রথম বর্ষের ভীতসন্ত্রস্ত নবীন শিক্ষার্থীদের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা, তুচ্ছ কারণে অকথ্য গালিগালাজ শ্রবণ এবং মানসিক নির্যাতনের সেই দৃশ্যগুলো কোনো সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে না; বরং তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেই মনে করিয়ে দিত।
সেখানে কোনো প্রকার যুক্তি, তর্ক বা মানবিক আবেদন চলত না, চলত কেবল ক্ষমতা ও পেশিশক্তির ভয়াল দম্ভ। একজন শিক্ষার্থী যখন সারাদিনের ক্লান্তি শেষে ক্লাসের চাপ কাটিয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিত, তখনই তাকে জোরপূর্বক টেনে আনা হতো এই মানসিক টর্চার সেলে। এই গেস্টরুম সংস্কৃতি আসলে ছিল একটি সুপরিকল্পিত, সুদূরপ্রসারী প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তাশক্তিকে পঙ্গু করে দেওয়া হতো, যাতে তারা কখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে বা প্রতিবাদ করতে সাহসী না হয়। ফ্যাসিবাদ এভাবেই তার বিষাক্ত শিকড় গেড়েছিল আমাদের চেতনার গভীরে, প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মানসিকভাবে পরাধীন করে তোলার উদ্দেশ্যে।
প্রশাসনিক আপস ও প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়
সবচেয়ে আশ্চর্যের এবং বেদনার বিষয় ছিল এই অমানবিকতার বিরুদ্ধে হলের অভিভাবকতুল্য প্রশাসনের নির্বিকার ভূমিকা এবং নির্লিপ্ততা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী শিক্ষকেরা যখন হলের প্রভোস্ট কিংবা হাউজ টিউটরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল আসনে বসে গেস্টরুমের এই পৈশাচিকতা দেখেও না দেখার ভান করতেন, তখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের শেষ আশাটুকুও নির্মমভাবে ধূলিসাৎ হয়ে যেত। প্রশাসনের এই চাটুকারিতা, মেরুদণ্ডহীনতা আর পদের মোহে অন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রবণতা মূলত ফ্যাসিবাদকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল, যা এর শেকড়কে আরও গভীরে প্রোথিত করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন তখন কেবল একটি মৃত শব্দে পরিণত হয়েছিল, যা কোনো শিক্ষার্থীর অধিকার রক্ষা করতে পারত না, বরং ক্ষমতার ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছিল। তাদের এই নীরব সম্মতি ফ্যাসিবাদীদের আরও উৎসাহিত করত এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের অসহায়ত্ব বাড়িয়ে দিত।
জুলাইয়ের অগ্নিকাণ্ড ও শৃঙ্খল মুক্তির সংগ্রাম
অন্যায়ের রাজত্ব চিরস্থায়ী হতে পারে না, তা ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যখন রাজপথ শিক্ষার্থীদের রক্তে রঞ্জিত হলো, তখন সেই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের আগুন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল প্রতিটি হলের গণরুমে। যারা বছরের পর বছর ধরে গেস্টরুমে অপমানিত হয়েছে, যারা রাজনৈতিক বড় ভাইদের দম্ভের কাছে জিম্মি ছিল, তারা আর ঘরে বসে থাকেনি। জুলাই বিপ্লব ছিল মূলত সেই অবদমিত যন্ত্রণার এক চূড়ান্ত, বাঁধভাঙা বিস্ফোরণ, যা ছিল প্রতিবাদের এক বিশাল তরঙ্গ। আবু সাঈদ থেকে শুরু করে মুগ্ধ—প্রতিটি শহীদের তাজা রক্ত ছিল গেস্টরুম-গণরুম সংস্কৃতির মুখে এক একটি সজোরে চপেটাঘাত, যা এই বর্বরতার চির অবসানের বার্তা দিয়েছিল। সেদিন মেহনতি মানুষ থেকে শুরু করে আপামর জনসাধারণ যখন ছাত্রদের পাশে এসে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছিল, তখন প্রমাণিত হয়েছিল যে ফ্যাসিবাদ কেবল বন্দুকের নল দিয়ে একটি স্বাধীনচেতা প্রজন্মকে চিরকাল দমিয়ে রাখতে পারে না; শেষ পর্যন্ত সত্য ও ন্যায়ের জয় হয়। এই গণঅভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের সম্মিলিত প্রকাশ।
উপসংহার: নতুনের শপথ ও আগামীর ক্যাম্পাস
আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আকাশে নতুন সূর্য উঠেছে, যা এক নতুন ভোরের আগমনী বার্তা দিচ্ছে। গেস্টরুমের সেই ভয়াল অন্ধকার অপসৃত হয়েছে, নেই কোনো রাজনৈতিক বড় ভাইয়ের চোখরাঙানি বা দাপট। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, এই অমূল্য স্বাধীনতা এসেছে এক সাগর রক্ত আর অসংখ্য ত্যাগের বিনিময়ে, যা কখনও ভোলা উচিত নয়। এই স্মৃতিচারণ কেবল অভিযোগের ঝুলি খোলা নয়, বরং এক কঠোর শপথ, এক প্রতিজ্ঞাবদ্ধ অঙ্গীকার। আমরা চাই না আর কোনোদিন এই পবিত্র ক্যাম্পাসে ‘গণরুম’ নামক কোনো অমানবিক ব্যবস্থার জন্ম হোক, যা শিক্ষার্থীদের মেধা ও মনুষ্যত্বকে ধ্বংস করে। আমরা চাই না আর কোনো শিক্ষক পদের লোভে অন্ধ হয়ে ছাত্রের ওপর নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করুক বা অন্যায়ের নীরব দর্শক হয়ে থাকুক। আমাদের কলম আর মেধা যেন সবসময় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক অতন্দ্র প্রহরী হয়ে থাকে, যা সকল অন্যায়কে প্রতিরোধ করবে। একটি নিরাপদ, গণতান্ত্রিক, সহনশীল এবং মেধার জয়গান গাওয়া ক্যাম্পাসই হোক আমাদের আগামীর চিরন্তন গন্তব্য। যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী তার মেধার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারবে এবং নির্ভয়ে স্বাধীনভাবে প
থ চলতে পারবে।
