বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

উখিয়া-টেকনাফের বিপন্ন অস্তিত্ব

Author

মুহাম্মদ রিদুয়ান , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ পাঠ: ৩৫ বার

মানবিকতার বোঝা

উখিয়া-টেকনাফের বিপন্ন অস্তিত্ব

মুহাম্মদ রিদুয়ান

২০১৭ সালের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আজও গা শিউরে ওঠে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তার নির্মম ও অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে যখন লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের দিকে ছুটে আসছিল, তখন উখিয়া-টেকনাফের সাধারণ মানুষ কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ করেনি। নিজেরা হাজারো অভাব-অনটনে থাকা সত্ত্বেও তারা মানবতার সর্বোচ্চ দুয়ার খুলে দিয়েছিল। নিজেদের মাথা গোঁজার ঠাঁই, গোলার ধান, বিশুদ্ধ খাবার পানি, এমনকি পরমযত্নে আগলে রাখা সামাজিক নিরাপত্তাটুকুও বিলিয়ে দিয়েছিল আশ্রিত সেই ভাগ্যহীন মানুষগুলোর জন্য। বিশ্ববাসী অবাক হয়ে দেখেছিল বাংলাদেশের একটি প্রান্তিক জনপদের মানুষের এই অভাবনীয় উদারতা। কিন্তু আজ দীর্ঘ ৯ বছর পর, ২০২৬ সালের এই সময়ে এসে যখন আমরা পেছনে ফিরে তাকাই, তখন বুক চিরে একটি করুণ ও আর্তনাদময় প্রশ্ন বেরিয়ে আসে। আর সেটি হলো-মানবিকতার এই মহৎ ও ঐতিহাসিক আতনাদন ত্যাগের বিনিময়ে আদৌ কী পেল উখিয়া-

টেকনাফের এই আদি জনগোষ্ঠী? বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক বাহবা কুড়ানোর মোহে তৎকালীন স্বৈরাচারী ও অদূরদর্শী সরকারের নেয়া একতরফা সিদ্ধান্তের মাশুল এই এলাকার নিরীহ মানুষদের আজও দিতে হচ্ছে। উখিয়া-টেকনাফ আজ অবহেলা, প্রশাসনিক উদাসীনতা আর পরিবেশগত এক মহা বিপর্যয়ের শিকার। একটি আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক সংকটের পুরো বোঝা কেবল একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর চাপিয়ে দেয়া শুধু অন্যায়ই নয়; বরং চরম অমানবিকও বটে। তারা নিজেদের জমিতে শরণার্থী রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে, নিজেদের খাবার ভাগাভাগি করে খেয়েছে, অথচ; বিনিময়ে আজ তারা নিজেদের ভিটেমাটিতেই যেন পরবাসীর মতো অসহায়!

আজ এই এলাকার দিকে তাকালে পূর্বের সেই চিরচেনা রূপ আর কোনোভাবেই খুঁজে পাওয়া যায় না। পাহাড় কেটে, দিগন্তজোড়া বনাঞ্চল উজাড় করে গড়ে ওঠা রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর কারণে এই অঞ্চলের ইকোসিস্টেম আজ পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে। যেখানে একসময় সবুজের সমারোহ ছিল, বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ ছিল, আজ সেখানে শুধুই প্লাস্টিক আর পলিথিনের এক বিশাল কৃত্রিম কবরস্থান। উদাহরণস্বরূপ, উখিয়ার কুতুপালং গ্রামের প্রায় ২০০ একর উর্বর কৃষিজমি আজ সম্পূর্ণ চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এই উখিয়ার কুতুপালং এ গড়ে ওঠেছে বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবির। রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে নেমে আসা শত শত টন অপচনশীল প্লাস্টিক বর্জ্য, নোংরা ও রাসায়নিক মিশ্রিত পচা পানি গ্রাস করেছে কৃষকদের একমাত্র জীবিকার সম্বল এই সোনালি মাঠগুলোকে। একসময় যে জমিতে ফলতো সোনার ধান আর হরেক রকমের শীতকালীন সবজি, আজ সেখানে শুধু পচা পানির দুর্গন্ধ ও প্লাস্টিকের স্তূপ। জমির মাটি তার চিরাচরিত উর্বরতা হারিয়ে মৃত প্রায়। স্থানীয় খাল-বিল ও নদী-নালাগুলো

হারিয়েছে তাদের নাব্যতা এবং স্বাভাবিক

জীববৈচিত্র্য। এলাকার ঐতিহ্যবাহী ‘শাপলা বিল’টি যাও একটু অবশিষ্ট আছে, পরিবেশের এই ভয়াবহ দূষণে আগামী দুই-তিন বছরে তার কোনো অস্তিত্ব থাকবে কিনা, তা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে। একসময়ের প্রমত্তা ‘মাছকাইজ্জা ডেফা’র মতো সমৃদ্ধ জলাশয়গুলোতে কি আর কখনো আগের মতো দেশীয় মাছের মেলা বসবে? এই উত্তর আজ কারোর জানা নেই। সংকটটি কেবল পরিবেশ বা কৃষির ওপরই আঘাত হানেনি, এটি অত্যন্ত সুক্ষ্ম ও মারাত্মকভাবে গ্রাস করছে এই জনপদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। রোহিঙ্গা সংকটকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অসংখ্য এনজিও-আইএনজিওর লোভনীয় বা ক্ষণস্থায়ী চাকরি, ছোটখাটো ব্যবসা আর ডোনেশনের মায়াজালে আটকা পড়ে এই এলাকার তরুণদের একটি বড় অংশ আজ পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে দ্রুত উপার্জনের দিকে ঝুঁকে পড়ার এই আত্মঘাতী প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে এই এলাকাকে এক চরম মেধা শূন্যতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সাময়িক অর্থনৈতিক চাকচিক্য হয়তো কারো কারো চোখে দৃশ্যমান; কিন্তু যে কৃষিজমি ধ্বংস হয়েছে, যে পাহাড় কাটা হয়েছে, যে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে, তা কি কোনো অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব? যে ইকোসিস্টেম এক যুগে ধ্বংস করা হলো, জাতিসংঘ বা কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা কি তা কখনো আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারবে? উখিয়া-টেকনাফের মানুষ কোনোভাবেই রোহিঙ্গাদের প্রতি বিদ্বেষী নয়। তারা সেদিনো মানবতার পাশে দাঁড়িয়েছিল, আজও আশ্রিত মানুষের মৌলিক অধিকারের পক্ষে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানবতার এই বিপুল ও অন্তহীন বোঝা কেন কেবল এই অবহেলিত জনপদকেই বহন করতে হবে? যে মাটি একসময় উর্বর ও সবুজ ছিল, আজ তা বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হওয়ার শাস্তি কেন এই নিরপরাধ মানুষগুলো পাচ্ছে?

এই জনপদের মানুষও বাঁচতে চায়, এই জনপদের শিশুরাও সুস্থ পরিবেশে স্বপ্ন দেখতে চায়। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ এবং বর্তমান সরকারের কাছে জোরালো দাবি, উখিয়া-টেকনাফের মানুষের জীবন, কৃষি, ইকোসিস্টেম ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে অবিলম্বে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করুন। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় কৃষকদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ না দিলে এই জনপদের মুক্তি মিলবে না। মানবতার পিঠে আর কতদিন এই অবহেলার চাবুক চলবে?

শিক্ষার্থী, ঢাকা

মুহাম্মদ রিদুয়ান : বিশ্ববিদ্যালয়।

লেখক: সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!