বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

স্বাধীনতাযু্দ্ধে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন

Author

আবু তালহা আকাশ , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২১ পাঠ: ৪৭ বার

স্বাধীনতাযু্দ্ধে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন

রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষায়, “স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়?” সত্যিকার অর্থেই তাই প্রতিটি প্রাণীই চায় স্বাধীনভাবে বাঁচতে। বনের পশু থেকে শুরু করে উড়ন্ত পাখি সবাই চায় স্বাধীনতা! চায় একটি সুস্থ, সুন্দর ও স্বাভাবিক মুক্ত জীবন। আর তাই তো বনের পশু পাখি কেউই চায় না খাঁচায় বন্দী হয়ে থেকে জীবন কাঁটাতে। আর মানুষ তো সৃষ্টির সেরা জীব। স্বভাবতভাবেই তারা স্বাধীন চেতা। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা চায় স্বাধীনতা নিজের মতামত ও সিদ্ধান্তের সঠিক মূল্যায়ন এবং তার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন।
স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত মৌলিক অধিকার। সেই স্বাভাবিক বিষয়টা যখন প্রতিবন্ধকতা হিসেবে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়! তখন সেটা দূর করতেই আমরা নানা রকম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হই। আবার সেটা যদি হয় কোনো নির্দিষ্ট জাতি কিংবা গোষ্ঠীর দ্বারা স্বীকার, তখন আমরা এর থেকে রক্ষা পেতে সর্বোচ্চ পরিস্থিতি হিসেবে সম্মুখীন হই যুদ্ধের। ইতিহাস থেকে আমরা এমনটাই দেখি। ঠিক এভাবেই যখন বাঙালিদের ওপরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচারের মাত্রা সীমা অতিক্রম করে; ঠিক তখনই বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে দেশের হাজারো মানুষ যখন একত্রিত হতে থাকে স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষে। ঠিক সেই সময়ে নিজেদের অধিকার সচেতন, স্বাধীনচেতা, মুক্তমনা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ব্যক্তিরাও তাদের সাংস্কৃতিক অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে এই মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে। তাই তো আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে সামাজিক ও সংস্কৃতিক অঙ্গনের যেসকল ব্যক্তিত্ব আছেন; তাদের রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল ও অবিস্মরণীয় ভূমিকা। আমাদের এই বাংলাদেশ এবং এসকল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ভূমিকা একই সূত্রে গাঁথা।
বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন বলতে প্রথমই যার নাম প্রতিটি বাঙালির মনে প্রতিধ্বনিত হয় তা হলো, ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’। মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র প্রচার থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে সহায়ক মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক অসংখ্য গান, কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক  প্রচার করে শান্তি প্রিয় বাঙালিদের মনে শক্তি, উৎসাহ, উদ্দীপনা তৈরি করে গেছে সারাটিক্ষণ। বাঙালি সূর্য সন্তানেরা যখন স্বাধীনতা অর্জনের জন্য হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল, সাংস্কৃতিক ব্যক্তি তথা কর্মীদের কাছে সংস্কৃতিই হয়ে ওঠেছিল তাদের হাতিয়ার।
মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে রাজনৈতিক বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। শুধু মুক্তিযুদ্ধই নয়, ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুন্থানসহ সকল রাষ্ট্রীয় সংকটে দেশের সাংস্কৃতিক কর্মীরা সবসময় থেকেছে সোচ্চার। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাকবাহিনীর নির্মম আঘাতের প্রবলতার কারণে বিভিন্ন সময়ে দেশের  শিক্ষক, সঙ্গীত রচয়িতা, সুরকার-গীতিকার, শিল্পী, কবি, সাংবাদিক, নাট্যকার,  সাংস্কৃতিক কর্মী তথা চিত্রশিল্পী সহ সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ব্যক্তিত্বরা ছদ্মনামে তাদের কলম ও কন্ঠ অস্ত্র ব্যবহার করে; অস্ত্রধারী যোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করে গেছেন প্রতিটি মূহুর্তে। জানিয়ে দিয়েছেন দেশের প্রতিটি অঞ্চলের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশ ও আন্দোলনে সাহিত্য-সংস্কৃতির বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সত্যপ্রকাশে প্রণোদনা জাগিয়েছে এমনকি তা ইতিহাস সংগ্রহের যে সঠিক উৎস সেই উৎস হিসেবে লিপিবদ্ধ রয়ে গেছে। কবিরা তাদের লেখনির মাধ্যমে যে অগ্নি ঝরা মনোবল ও উত্তাপ তৈরি করেছে সেসময়ের স্বাধীনতাকামী মানুষের মনে তা দুচারটি শব্দে বর্ণনা করার মত বিষয় নয়।
“মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি, জয় বাংলা বাংলার জয়, পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে রক্ত লাল রক্ত লাল, নোঙর তোল তোল”, গান গুলোর প্রতিটি কথা একএকটা বুলেটের চেয়েও অনেক শক্তিশালী। মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে রচিত অসংখ্য কবিতার ভেতরে সিকান্দার আবু জাফরের, ‘বাংলা ছাড়ো’; সুফিয়া কামালের, ‘আজকের বাংলাদেশ’; জসিমউদ্দিনের, ‘দগ্ধগ্রাম’; হাসান হাফিজুর রহমানের, ‘যখন উদ্যত সঙ্গীন’; এছাড়াও রয়েছে আরো অগনিত কবিতা। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে যা প্রতিনিয়ত প্রচারিত হতো।
১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের প্রতিবাদে সেসময়ে রচিত আবদুল গাফফার চৌধুরীর কবিতা, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’; মাহবুবুল আলম চৌধুরীর কবিতা, ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’; শামসুর রাহমানের, ‘আসাদের শার্ট’ ১৯৬৯ এর গণআন্দোলনের সুমহান কাব্যিক দলিল। এসকল গান ও কবিতাগুলোই যেন সেসময়ের মুক্তিকামী মানুষের মনকে অনুপ্রাণিত করতে অনুপ্রেরণার বাতীঘর হিসেবে কাজ করেছে।
শুধু দেশীয় নয় বাংলাদেশের যুদ্ধ নাড়া দিয়েছিল সারা পৃথিবীর অসংখ্য শিল্পী ও সাংস্কৃতিমনা হৃদয়কে। ১৯৭১ সালে অ্যান্থনী মাসকারেণহাসই প্রথম সাংবাদিক যিনি পাকিস্তান থেকে পালিয়ে গিয়ে লন্ডনের দি সানডে টাইমস্ পত্রিকায় তখনকার বাংলাদেশ ভূখণ্ডে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম স্বজন হত্যার কাহিনী স্ববিস্তরে লিখে বিশ্বজনমতের সামনে তুলে ধরেন। যার এই লেখনির মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্ববাসী বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম হত্যাকান্ডের চিত্র উপলব্ধি করে বাংলাদেশের অনুকূলে কাজ করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে গেছে।
আমরা সকলেই জানি, ১ আগস্ট ১৯৭১ সালের যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে, ‘Concert For Bangladesh’ এর কথা। যা ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছিল পুরো বিশ্বে। নিউ ইয়র্ক সিটির ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে প্রায় ৪০,০০০ দর্শকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত, সাবেক বিটল্স সঙ্গীতদলের লিড গিটারবাদক জর্জ হ্যারিসন এবং ভারতীয় সেতারবাদক রবিশঙ্কর কর্তৃক সংগঠিত দুটি কনসার্ট বিশ্বকে ভাবিয়ে তোলে। তাদের গানগুলো বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষের কানে পৌঁছে দিয়েছিল বাংলাদেশের রক্তাক্ত জন্মের কাহিনী। কনসার্ট হতে প্রায় ২৪৩,৪১৮.৫০ ইউএস ডলার (উইকিপিডিয়া) সংগৃহীত হয় যার পুরোটাই ইউনিসেফের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশের জন্য দিয়ে দেয়া হয়।
৫২ এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির প্রতিটি আন্দোলন ও প্রতিবাদের অংশ হিসেবে দেশ বিদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ভূমিকা বাঙালির ইতিহাসের অস্থিমজ্জার সাথে মিশে রয়েছে। আর তাই তাদের ব্যাতিরেকে বাংলাদেশ নামটি কল্পনা করাও অকল্পনীয়। এজন্যই স্বাধীনতার অর্ধশত বছরে এসেও আমরা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, শহীদ বুদ্ধিজীবী সহ সকল শহীদ-গাজী মুক্তিযোদ্ধাদের আমরা যেভাবে স্মরণে রেখেছি পাশাপাশি সামাজিক ও সংস্কৃতিক অঙ্গনের সকল মানুষদেরও আমরা কোনো সময়ের জন্যও ভুলিনি এবং প্রত্যাশা থাকবে পূর্বের সময়ের মত বর্তমান ও আগামীর অধিকার আদায় সহ সকল ক্ষেত্রে এসকল অঙ্গনের ভূমিকা থাকবে পূর্বের মতই। এমনকি আজও দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন আমাদের অনুপ্রেরণার বাতিঘর হিসেবেই কাজ করছে।
ই-মেইল- abutalhaakash98@gmail.com
লেখক: সভাপতি, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৯ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে দৈনিক মানবকণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত।
প্রকাশিত: দৈনিক মানবকণ্ঠ
Paper Cutting
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।