আশার আলো দেখছেন পঞ্চগড়ের চা চাষীরা
চা বাংলাদেশের একটি অর্থকরি ফসল । দুই দশক আগে শুরু হওয়া নীরব বিপ্লবে পরিবর্তন হয়েছে উত্তরের জনপদ পঞ্চগড়ের ভাগ্য ও অর্থনীতি । এক সময় চরম দারিদ্র্যে জীবন কাটানো এর জেলার মানুষ অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী হয়েছে চা চাষের মাধ্যমে । এর ফলে একদিকে যেমন গড়ে উঠেছে কর্মসংস্থান একই সঙ্গে পরিবর্তন হয়েছে এ জেলার মানুষের অর্থ-সামাজিক অবস্থন । এতে হাজার হাজার বিঘা অনাবাদি ও গো-চারণ জমি হয়ে উঠেছে সমতল ভূমির সবুজ চায়ের ভূ-স্বর্গ । অর্থনীতির সাথে যুক্ত হয়েছে ছিলো এ এলাকার পর্যটন বাণিজ্য । প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দর্শন করতে আসে এ জেলার সবুজে ভরা চা বাগান ও কাঞ্চনজঙ্ঘা । দুই দশক আগে বাণিজ্যিক ভাবে শুরু হওয়া এ যাত্রায় আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশে অর্গানিক চা উৎপাদনে খ্যাতি পেয়েছে ও সিলেটের পরে অবস্থান করে নিয়েছে পঞ্চগড়ের চা ।
বাণিজ্যিক ভাবে চা- বাগানের যাত্রা শুরু :-
ভারতের বিখ্যাত দার্জিলিং অঞ্চলের সাথে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার ভৌগোলিক ও আবহাওয়াগত মিল থাকায় এবং এখানকার উঁচু পতিত জমি দেখে ১৯৯০ সালের শেষের দিকে বাণিজ্যিক ভাবে চা চাষের চিন্তা শুরু হয় । ১৯৯৬ সালে তৎকালীন সরকারের নীতিনির্ধারক ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অনুপ্রেরণায় এখানে চা চাষের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয় ।
পরবর্তীতে ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে কাজী শাহেদ আহমদ ( কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেট ) এবং অন্যান্য উদ্যোগে তেঁতুলিয়া ও পঞ্চগড় সদর উপজেলায় পরীক্ষামূলক ও বাণিজ্যিাকভাবে চা চাষের গোড়াপত্তন হয় । এছাড়া ঐতিহাসিক প্রথম চারাটি করা হয়ে ছিলো পঞ্চগড় মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণে । বর্তমানে বৃহৎ বাগানের পাশাপাশি প্রান্তিক কৃষকেরা তাদের বাড়ির আঙিনায় , পুকুড়পাড়ে ও উঁচু জমিতে ক্ষুদ্র পরিসরে চা চাষ শুরু করেন । পঞ্চগড়ে সমতল ভূমিতে সফল ভাবে চা চাষের পাশাপাশি অর্গানিক বা জৈব চা উৎপাদনের জন্য বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছে । বর্তমানে সিলেটের পর চা উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পঞ্চগড় ।
পৃথিবীর সেরা চা উৎপাদিত হচ্ছে এখানে , বাংলাদেশের একমাত্র প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে ১০০ ভাগ অর্গানিক চা উৎপাদন করছে কাজী অ্যান্ড কাজী টি সহ আরো অনেক প্রতিষ্ঠান । তাদের চা বাগান সম্পূর্ণ কম্পোজিট টি এস্টেট । আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশে অর্গানিক চা উৎপাদনে খ্যাতি পেয়েছে কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেটের । এই অর্গানিক চা উৎপাদন্ন হয়ে বিক্রি হচ্ছে লন্ডন, দুবাই , জাপান ও আমেরিকায় । দেশীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করছে পঞ্চগড়ের চা । পঞ্চগড়ের চা কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে দেশের তৃতীয় চা নিলাম কেন্দ্র ।
সম্ভাবনার পাশাপাশি সংকটও চরমে : –
দেশের সমতল ভূমিতে চা ভূ-স্বর্গ গড়ে উঠলেও তৈরি হয়েছে নানা সংকট । এসব সংকটের মধ্যে রয়েছে চাষিদের উৎপদিত চা পাতার ন্যায্য দাম না পাওয়ার অভিযোগ । এতে করে চা চাষীরা ছিলো চরম হতাশায় । ২০১৭ সাল এরপর থেকে কয়েক বছর ধরেই পাচ্ছিলো না চা পাতার ন্যায্য মূল্য । শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারণে ইংরেজ নীলকরদের মতোই চুষে নেয়া হচ্ছিলো কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য । প্রতিনিয়তই লোকসান গুনতে হচ্ছিলো চাষীদের । উৎপাদিত চা পাতা বিভিন্ন অজুহাতে কেটে নিচ্ছিলো ৪০ থেকে ৫০ ভাগ চা পাতা । এতে করে চা চাষীরা উৎপ্দন খরচ তুলতে পারছিলো না লাভ এর মুখ দেখা তখস বিলাসীতা । সে সময় প্রতি কেজি কাঁচা চা পাতার মূল্য নির্ধারণ করা হয়ে ছিলো ১৮ টাকা কিন্তু বিভিন্ন অজুহাতে কাঁচা চা পাতা কিনা হয়ে ছিলো ১০ থেকে ১৫ টাকা দরে। এতে কষেকেরা কীটনাশক ,শ্রমীক খরচ ,সেচের খরচ ও সংসার চালাতে হিমসীম খেতে হতো । এর ফলে চা চাষীরা সে সময় ক্ষোভে কেটে ফেলে ছিলো হেক্টরের পর হেক্টর চা বাগান । এতে সে সময় চা চাষীরা সে সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ছিলো একই ভাবে দেশ হারিয়ে ছিলো অর্থনৈতিক সম্পদ ।
আশার আলোর মুখ দেখছেন :
এক সময় সিন্ডিকেটের কারনে কেজি প্রতি কেজি কাঁচা চা পাতা ১০ থেকে ১৫ টাকা বিক্রি হতো ,সেখানে বর্তমানে চলতি মৌসুমে পূর্বে সকল রের্কড ভেঙ্গে প্রতি কেজি কাঁচা চা পাতা বিক্রি হচ্ছে ৪৮ থেকে ৫০ টাকায় । এই পরিমাণ মূল্য পেয়ে আনন্দিত পঞ্চগড়ের চা চাষীরা । পঞ্চগড় জেলার হড়িভাষা ইউনিয়নের চা চাষী বিজয় গোপাল রায় জানায় এই পরিমাণ মূল্য পাওয়ায় তারা আনন্দিত । তিনি জানায় মার্চ থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত চা উত্তোলনের মৌসুম। চা চাষে সঠিক সময়ে পানি দেওয়া , কীটনাশক প্রয়োগ করা , সঠিক সময়ে চা পাতা কাটতে হয় না হলে চা পাতার ভালো দাম দিতে চায় না চা কারখানার মালিকেরা । তিনি জানায় এই দাম যদি বহাল থাকে তাহলে খুব ভালো হয় এবং তিনি আরো জানায় সরকার যদি সার , কীটনাশক ও হাতে কলমে প্রশীক্ষণ দিয়ে সাহায্য করতো তাহলে আমরা খুব লাভবান হতাম । চা বোর্ডের মতে বর্তমান সময়ে , অক্সন মার্কেটে পঞ্চগড়ের যে প্রক্রিয়া জাত চা রয়েছে সেটা বেশি দামে বিক্রি হওয়ার এবং চা কারখানার প্রতিযোগীতার মূলক কার্যক্রমের কারণে এই দাম বৃদ্ধি পেয়েছে । চা বোর্ডের মতে ২০২৪ সালে ৯ কোটি ৭৭ লাখ কেজি কাঁচা চা পাতা উৎপাদন হয়েছে এবং ২০২৫ সালে কাঁচা চা পাতার উৎপাদন বুদ্ধি পেয়েছে ৫৮ লখ্য কেজি। এতে ৩১ টি চা কারখানায় চা উৎপাদন হয়েছে ২ কোটির বেশি চা ।
২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পঞ্চগড়ের চা চাষীদের জন্য ছিলো এক কাল সময় এ সময় চাষীরা পাচ্ছিলো না নেয্য দাম আরেক দিকে সার ও কীটনাশক এর দাম বৃদ্ধি হতাশায় ধংস করে ছিলো হেক্টরের পর হেক্টর জমি চা বাগান । সেখান থেকে মুখ ঘুরে ২০২৬ সালে বছরে প্রথম মৌসুম থেকেই কাঁচা চা পাতার দাম বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং বর্তমানে কাঁচা চা এর দাম গিয়ে ঠেকে ৪৮ থেকে ৫০ টাকায় । যেহেতু চা বর্তমানে দেশের একটি অর্থকরি ফসলে পরিণত হয়েছে এবং জিডিপি তেও একটি বড় অবদান রাখছে তাই সরকারের উচিত দেশের চা শিল্প সহ দেশের নতুন চা শিল্প এলাকা উত্তরে চা-ভূস্বর্গ বা সমতলের চা চাষীদের প্রতি নজর দেওয়া । সকারের উচিত উত্তরের জনপদের পতিত ও গোচারণ ভূমিতে চা চাষে উৎসাহী করে তোলা ও তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে করে তোলা । তাদের সঠিক সময়ে সার ও কীটনাশক দিয়ে সাহায্য করা । নতুন ও পুরাতন সকল চা চাষীদের চা বোর্ডের নিবন্ধনের আওতায় আনা ও নিবন্ধীত সকল চাষীদের সরকারী সাহায্য করা ( যেমন : প্রশিক্ষণ দেওয়া , সার , কীটনাশক দেওয়া , তাদের খোজ খবর নেওয়া ) । কাঁচা চা এর দাম ধরে রাখার জন্য চা কারখানা প্রতিষ্ঠা করা । চা কারখানা প্রতিষ্ঠা করতে বিনিয়োগ কারিদের সরকারি সকল সাহায্য প্রদান করা ( যেমন : অইননী কাগজের কাজ ) , চা চাষী ও কারখানার মালিক বা বিনিয়োগ কারিদের ঋণ দিয়ে সাহায্য করা । চা নিলাম কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা । কাঁচা চা দাম ধরে রাখার জন্য মূল সমস্যা সিন্ডিকেট বন্ধ করা , অক্সন মার্কেটের প্রতি নজর রাখা ।
