শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

সুযোগ পেলেই কি সবাই গবেষক? মেধার ফিল্টারিং ও শিক্ষকদের অধিকার ।

Author

রনি মিয়া , গুরুদয়াল সরকারী কলেজ

প্রকাশ: ৪ অক্টোবর ২০২৬ পাঠ: ৭৮ বার

 

বিশ্ব শিক্ষক দিবস এলেই শিক্ষককে ঘিরে নানা আয়োজন, আলোচনা ও শুভেচ্ছা দেখা যায়। কিন্তু একজন শিক্ষকের পেশাগত অধিকার, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগের ক্ষেত্রে বাস্তব চিত্র কি সত্যিই সমতার? একজন শিক্ষক কোন স্তরের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত—এই পরিচয় কি তাঁর জ্ঞান অর্জনের সুযোগ নির্ধারণ করবে?

শিক্ষকের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগকে ব্যক্তিগত সুবিধা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একজন শিক্ষক যখন উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন, গবেষণায় যুক্ত হন এবং নতুন জ্ঞান অর্জন করেন, তার সুফল শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীর শ্রেণিকক্ষেই ফিরে আসে। তাই বিষয়টি শিক্ষকের ব্যক্তিগত অধিকার যেমন, তেমনি শিক্ষার মানোন্নয়নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অথচ বাস্তবতায় শিক্ষকতার বিভিন্ন স্তর ও প্রতিষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী উচ্চশিক্ষার সুযোগ ও র্দীঘমেয়াদী স্টাডি লিভ পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের র্পাথক্য দেখা যায় ।  সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারি কলেজের শিক্ষকরা প্রাতিষ্ঠানিক বিধিবিধানের আওতায় উচ্চশিক্ষার জন্য ছুটি, ডেপুটেশন বা গবেষণার সুযোগ তুলনামূলকভাবে সহজে পান। অন্যদিকে এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজের কোনো শিক্ষক মেধার ভিত্তিতে এমফিল বা পিএইচডিতে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার পরও দীর্ঘমেয়াদি ছুটি, এনওসি বা বিকল্প শিক্ষক সংক্রান্ত প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে যেতে পারেন। 

উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়ার তুলনামূলক বাস্তব চিত্র

ক্রম শিক্ষক/প্রতিষ্ঠানের ধরন সুযোগের প্রশাসনিক সহজপ্রাপ্যতা সংক্ষিপ্ত বাস্তব চিত্র
১ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তুলনামূলকভাবে সহজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অধ্যাদেশ/স্ট্যাটিউটের আওতায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উচ্চশিক্ষার সুযোগ।
২ সরকারি কলেজের শিক্ষক সহজ বিসিএস ক্যাডার বিধি/শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ডেপুটেশন বা পূর্ণ বেতনে উচ্চশিক্ষার সুযোগ।
৩ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শর্তসাপেক্ষে সহজ প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি আইন ও ইউজিসির প্রত্যাশার আওতায় উচ্চতর ডিগ্রিধারী শিক্ষক তৈরির সুযোগ।
৪ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাঝারি নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা ও ডিএসএইচই অনুমোদনের আওতায়; শিক্ষক সংকটে দীর্ঘমেয়াদি ছুটি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
৫ এমপিওভুক্ত কলেজের শিক্ষক কঠিন এমপিও নীতিমালা ও ১৯৭৯ সালের প্রবিধান; ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত ও আর্থিক/প্রশাসনিক বাস্তবতার প্রভাব থাকতে পারে।
৬ এমপিওভুক্ত স্কুলের শিক্ষক বেশ কঠিন ১৯৭৯ সালের প্রবিধান ও ছুটি বিধিমালার কাঠামোর পাশাপাশি বিকল্প শিক্ষক ও ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত জটিলতা।
৭ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক তুলনামূলক কঠিন জনবল সংকটের কারণে দীর্ঘমেয়াদি ছুটি বাস্তবে কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
৮ কিন্ডারগার্টেন ও সম্পূর্ণ বেসরকারি স্কুল/কলেজ সীমিত দীর্ঘমেয়াদি ছুটিতে বেতন-ভাতা ও চাকরি ধরে রাখার প্রশ্নে বড় সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে।

( নোট: এটি কোনো শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানকে মর্যাদাক্রমে সাজানো নয়; উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়ার প্রশাসনিক সহজপ্রাপ্যতার তুলনামূলক চিত্র ) 

 

প্রশ্ন হলো ,একই দেশের শিক্ষক কিন্তু উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এক ভিন্ন বাস্তবতা কেনো  ? শিক্ষার বিভিন্ন স্তরের উচ্চশিক্ষিত শিক্ষকের  প্রয়োজনীয়তার ভিন্নতা  কি এই বাস্তবতার কারন  , নাকি বিভিন্ন স্তরের শিক্ষকদের মেধার তারতম্য , আগ্রহ , সুযোগ সৃষ্টির জটিলতা ইত্যাদি ।

 

আইন ও নীতিতে কি উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন স্বীকৃত নয় ? 

 বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রকে গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা এবং উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার  দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে । 

অন্যদিকে  ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা ও সমান আইনি সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে।

 ফলে শিক্ষক কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত—এই পরিচয়ের কারণে উচ্চশিক্ষার সুযোগে যে পার্থক্য তৈরি হয়, তা সাংবিধানিক সমতার নীতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা বিবেচনার দাবি রাখে।

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, পেশাগত উন্নয়ন, জ্ঞান হালনাগাদ এবং গবেষণায় অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া সরকার ও নীতিগতভাবে উচ্চ শিক্ষাকে উৎসাহিত করে । 

অন্যদিকে, ১৯৭৯ সালের স্বীকৃত বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারী চাকরি প্রবিধানের ২৩ নম্বর প্রবিধানে স্টাডি লিভের বিধান রয়েছে। সেখানে নির্দিষ্ট শর্তে পেশাগত যোগ্যতা উন্নয়নের জন্য স্টাডি লিভের সুযোগ রাখা হয়েছে। একই প্রবিধানের ২৪ নম্বর প্রবিধানে বলা হয়েছে, কোনো ছুটি অধিকার হিসেবে দাবি করা যাবে না। অর্থাৎ বিধানে সুযোগ থাকলেও বাস্তব প্রয়োগে প্রশাসনিক কাঠামো ও অনুমোদন প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। 

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও শিক্ষককে পেশাগতভাবে উন্নত করার প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃত। ১৯৬৬ সালের ( UNESCO-ILO Recommendation ) সনদ-এর ৯৫ নম্বর অনুচ্ছেদে নির্দিষ্ট বিরতিতে শিক্ষকদের স্টাডি লিভ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে; পূর্ণ বা আংশিক বেতন এবং চাকরির জ্যেষ্ঠতা ও পেনশন-সংক্রান্ত সুবিধার ধারাবাহিকতার কথাও সেখানে রয়েছে। এটি বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক আইন নয়, তবে শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নের একটি আন্তর্জাতিক নীতিগত মানদণ্ড।

সবার জন্য একই ব্যবস্থা নয়, প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক সমাধান

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সমান অধিকার মানেই সব স্তরের শিক্ষকের জন্য হুবহু একই নিয়ম নয়। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা স্তরের বাস্তবতা আলাদা। কোনো প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি ছুটি দিলে পাঠদান ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি বেশি হলে সেখানে বিকল্প শিক্ষক বা অন্য কোনো ব্যবস্থার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু একজন শিক্ষক যদি মেধার ভিত্তিতে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল বা পিএইচডিতে ভর্তির সুযোগ অর্জন করেন, শুধু তাঁর কর্মস্থলের ধরনকে কারণ দেখিয়ে সেই উচ্চশিক্ষার পথ কঠিন  হয়ে যাওয়া উচিত কি না—সেটিই মূল প্রশ্ন।

 

তাহলে সমাধান কী?

এই সমস্যার একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে শিক্ষক উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য একটি পৃথক ও সমন্বিত আইনি কাঠামো তৈরি করা। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে।

প্রথমত , বাংলাদেশ শিক্ষক উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা অ্যাক্ট তৈরি করা , সেই অ্যাক্টের আওতায় অনুমোদন প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল ও কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার আওতায় আনা যেতে পারে। একজন শিক্ষককে একাধিক দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের পেছনে ঘুরতে না হয়ে নির্দিষ্ট অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আবেদন, যাচাই ও সিদ্ধান্তের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।  সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষেত্রে  , প্রতিষ্টানের ধরন , শির্ক্ষাথীর সংখ্যা , শিক্ষকের সংখ্যা , পাঠদান র্কাযক্রমের ক্ষতিগ্রস্থতা , আর্থিক চাপ ইত্যাদি ‍সুনিদিষ্ট্র কাঠামো তৈরি করতে হবে , যাতে কোন শিক্ষককে উচ্চশিক্ষা গ্রহনের ক্ষেত্রে ব্যক্তি বাধার সম্মুখিন না হতে হয়  এবংতিনি  যে শ্রেনির শিক্ষকই হোক , সে যেনো জানতে পারে উচ্চশিক্ষাগ্রহনে তার ধাপসমূহ ।  

দ্বিতীয়ত, সাময়িক খন্ডকালীন শিক্ষক তহবিল ( Proxy Teacher Fund ) : কোনো শিক্ষক এমফিল ছুটিতে গেলে , মাউশির অনুমতিক্রমে ম্যানেজিং কমিটি ওই সময়ের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করে  প্রক্সি শিক্ষক নিয়োগ দিবে  । 

তৃতীয়ত, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনা করে আলাদা বাস্তবায়ন কাঠামো থাকতে পারে। অর্থাৎ, একটি নীতির আওতায় থেকে বাস্তব প্রয়োগে স্তরভেদে প্রয়োজনীয় পার্থক্য রাখা যেতে পারে। তবে সকল স্তরের শিক্ষদের জন্য উচ্চশিক্ষা গ্রহনের কাঠামো হবে সুস্পষ্ট  এবং সুনিধারিত । 

তাই ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবসে শুধু শিক্ষককে শুভেচ্ছা জানানো নয়, শিক্ষকের পেশাগত অধিকার ও জ্ঞানচর্চার সুযোগ নিয়েও নতুন করে ভাবা দরকার। একজন শিক্ষককে শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদানকারী ব্যক্তি হিসেবে দেখলে চলবে না। তাঁকে জ্ঞানচর্চার অংশ হিসেবেও দেখতে হবে। একজন শিক্ষক যত বেশি শিখবেন, গবেষণা করবেন এবং নতুন জ্ঞান অর্জন করবেন, শিক্ষার্থীরাও তত বেশি সমৃদ্ধ হওয়ার সুযোগ পাবে। শিক্ষকের কর্মস্থল আলাদা হতে পারে, প্রতিষ্ঠানের ধরন আলাদা হতে পারে, প্রশাসনিক কাঠামোও আলাদা হতে পারে—কিন্তু একজন যোগ্য শিক্ষকের জ্ঞান অর্জনের অধিকার কি এতটাই আলাদা হতে পারে? বিশ্ব শিক্ষক দিবসে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই হতে পারে শিক্ষকের প্রতি আমাদের সবচেয়ে অর্থবহ সম্মান।

লেখক: সাধারন সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে দৈনিক আলোকিত সকাল পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।