বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

ডিগ্রী বাড়ছে, কাজ কমছে, শিক্ষিত তরুণদের ভবিষ্যৎ কোথায়?

Author

মোঃ খালিদ হাসান , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬ পাঠ: ৭৯ বার

এক হাতে সনদ, অন্য হাতে সিভি—চাকরির দরজায় দাঁড়িয়ে হাজারো তরুণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোনোর সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়ছে না কর্মসংস্থানের সুযোগ। তাহলে এত ডিগ্রির গন্তব্য কোথায়?

আসুন, একটু গভীরে যাই। ছোটবেলা থেকেই শুনে আসা একটি বাক্য—“শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড।” কিন্তু এই কথাটিকে আমরা অনেক সময় এমনভাবে বুঝেছি, যেখানে শিক্ষা মানেই পরীক্ষায় ভালো ফল, আর শিক্ষার চূড়ান্ত সাফল্য মানেই একটি বড় ডিগ্রি অর্জন। যেন যার ডিগ্রি যত বড়, সে তত বেশি শিক্ষিত! বাস্তবতা হলো, আমাদের সমাজে একজন মানুষের যোগ্যতা নির্ধারণে তার ডিগ্রিকে আমরা অনেক সময় অতিরিক্ত গুরুত্ব দিই। কিন্তু একটি ডিগ্রি কি সত্যিই একজন মানুষকে কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করে?

এবার একটু পরিসংখ্যানের দিকে তাকানো যাক। ২০২৪ সালে দেশে ২৬.২৪ লাখ বেকারের মধ্যে ৮.৮৫ লাখই ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়-গ্র্যাজুয়েট—অর্থাৎ প্রতি তিনজন বেকারের প্রায় একজনের হাতে ছিল উচ্চশিক্ষার সনদ। তাহলে সমস্যা কোথায়? সমস্যাটি শিক্ষা বা ডিগ্রির অস্তিত্বে নয়; বরং আমরা শিক্ষাকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করছি এবং সেই শিক্ষাকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে কতটা যুক্তিযুক্ত করছি— সেখানে। এখন প্রশ্ন হলো, কীভাবে আমরা এই সংকট মোকাবিলা করে দেশকে এগিয়ে নিতে পারি?

এর একটি সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে ‘Demand-Driven Education Policy’—যেখানে দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের চাহিদা, দক্ষ জনবলের ঘাটতি এবং উন্নয়নের সম্ভাবনাকে বিবেচনায় রেখে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করা হবে।

অর্থাৎ, শুধু “কী পড়ানো হবে”—এই প্রশ্নের মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থাকে সীমাবদ্ধ না রেখে ভাবতে হবে, দেশের কী প্রয়োজন এবং সেই প্রয়োজন পূরণে কেমন দক্ষ মানুষ দরকার। সেই প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই শিক্ষাব্যবস্থার পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। এভাবে দেশের যেসব খাতে দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে, সেসব ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বাড়তে পারে উৎপাদনশীলতা, তৈরি হতে পারে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদে কমানো সম্ভব হতে পারে বেকারত্বের হার। অর্থাৎ, শিক্ষা তখন শুধু চাকরি খোঁজার পথ দেখাবে না; বরং দেশের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রও তৈরি করবে। এই ধরনের শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব উদাহরণ খুঁজতে গেলে আমাদের তাকাতে হবে এমন কিছু দেশের দিকে যারা শিক্ষাকে কেবল সনদ অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখেনি; বরং দেশের অর্থনীতি, শিল্প ও শ্রমবাজারের প্রয়োজনের সঙ্গে শিক্ষাকে যুক্ত করার চেষ্টা করেছে। উদাহরণস্বরূপ৷ চীনের দিকে তাকালে দেখা যায়, শিল্পের পরিবর্তন ও ভবিষ্যৎ কর্মবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষার বিষয় ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যেসব খাতে ভবিষ্যতে দক্ষ জনবলের প্রয়োজন, সেসব ক্ষেত্রে শিক্ষার সুযোগ ও প্রশিক্ষণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাপানও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত ও সরকারের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বাস্তব কর্মজগতের জন্য প্রস্তুত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। আর জার্মানির ‘D vocational education system’-এ একজন শিক্ষার্থী একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করে এবং কর্মক্ষেত্রে সরাসরি বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করে। এসব দেশের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—আমরা কি শুধু কতজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হচ্ছে তা নিয়ে ভাবব; নাকি তারা বের হয়ে দেশের জন্য কী করতে পারছে, সেটিও ভাবব। কারণ একজন শিক্ষার্থীকে শুধু degree holder হিসেবে নয়, একজন Job-ready graduate হিসেবে গড়ে তোলাই হওয়া উচিত শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য। তার মধ্যে থাকতে হবে communication skill, critical thinking, English proficiency, leadership and teamwork-এর সক্ষমতা, digital literacy, AI-related skills এবং বাস্তব সমস্যা সমাধানের দক্ষতা। তাই এখন সময় এসেছে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর। শিক্ষার সাফল্য শুধু কতজন ডিগ্রি পেল, তার সংখ্যায় নয়; বরং সেই শিক্ষা কতজনকে দক্ষ, কর্মক্ষম এবং দেশের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম করে তুলতে পারল—তার মধ্যেই নিহিত। এই পরিবর্তনের দায়িত্ব শুধু শিক্ষার্থীর নয়, রাষ্ট্রেরও। রাষ্ট্রকে শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ চাহিদা বিশ্লেষণ করে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিল্প ও কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হতে হবে আর শিক্ষার্থীদেরও নিজেদের শুধু পরীক্ষার জন্য নয়—ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি ডিগ্রি একজন মানুষকে শিক্ষিত হওয়ার প্রমাণ দিতে পারে, কিন্তু তার জ্ঞান, দক্ষতা ও সেই জ্ঞানকে কাজে লাগানোর সক্ষমতাই তাকে সত্যিকার অর্থে কর্মযোগ্য করে তোলে।

মোঃ খালিদ হাসান

আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

 

লেখক: সাধারণ সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।