শিক্ষা শেষেও কেনো কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়না?
একজন শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন পড়াশোনা করেন, পরিবারের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও তাঁর শিক্ষার পেছনে অর্থ ব্যয় হয়, আর স্বপ্ন থাকে একদিন ভালো চাকরি করবেন, পরিবারের দায়িত্ব নেবেন এবং দেশের উন্নয়নে অবদান রাখবেন। কিন্তু স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর যখন বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় কাটে, তখন সেই স্বপ্ন ধীরে ধীরে হতাশায় রূপ নেয়। প্রশ্ন জাগে, যে শিক্ষা মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করার কথা, সেই শিক্ষা অর্জনের পরও কর্মসংস্থান নিশ্চিত হচ্ছে না কেন? বাংলাদেশের শিক্ষিত বেকারত্বের সংকট আজ এমনই এক বাস্তবতা, যা ব্যক্তি, পরিবার ও জাতীয় অর্থনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।
পরিসংখ্যানের আড়ালে উদ্বেগজনক বাস্তবতা
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর বেকারত্বের হার ছিল ১৩.৫৪ শতাংশ, যা ২০২৩ সালের ১৩.১১ শতাংশের চেয়ে বেশি। ২০২৪ সালে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার। একই সময়ে দেশের সামগ্রিক বেকারত্বের হার ছিল ৩.৬৬ শতাংশ। অর্থাৎ, জাতীয় গড়ের তুলনায় উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই পরিসংখ্যান আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের মধ্যে বিদ্যমান অসংগতিকে স্পষ্ট করে তোলে।
অন্যদিকে, বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩ অনুসারে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের শ্রমশক্তির মধ্যে প্রায় ১৯ লাখ ৪০ হাজার তরুণ বেকার ছিলেন। বেকার তরুণদের মধ্যে ৩১.৫ শতাংশের ছিল তৃতীয় স্তরের বা উচ্চশিক্ষার যোগ্যতা। অর্থাৎ, শিক্ষার স্তর যত বাড়ছে, চাকরির নিশ্চয়তা তত বাড়ছে এমন সরল সমীকরণ বাংলাদেশের বাস্তবতায় কার্যকর হচ্ছে না।
শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের মধ্যে ব্যবধান
শিক্ষিত বেকারত্বের অন্যতম প্রধান কারণ হলো শিক্ষার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের চাহিদার অসামঞ্জস্য। প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ডিগ্রি অর্জন করছেন। কিন্তু তাঁদের একটি বড় অংশ কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, যোগাযোগক্ষমতা ও সমস্যা সমাধানের অভিজ্ঞতা অর্জনের পর্যাপ্ত সুযোগ পান না।
অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো মুখস্থনির্ভর শিক্ষা ও পরীক্ষার ফলাফলকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। অথচ আধুনিক কর্মক্ষেত্রে নিয়োগদাতারা শুধু সনদ নয়, কাজের বাস্তব দক্ষতাও প্রত্যাশা করেন। ফলে একজন শিক্ষার্থী ভালো ফলাফল করেও চাকরির প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারেন।
এখানে শিক্ষার্থীদের এককভাবে দায়ী করা যায় না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাঠ্যক্রম প্রণয়নকারী কর্তৃপক্ষ এবং নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাবও এই সংকটের গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
চাকরির সীমিত সুযোগ ও নিয়োগের জটিলতা
বাংলাদেশে অনেক শিক্ষিত তরুণের প্রধান লক্ষ্য সরকারি চাকরি। এর পেছনে চাকরির স্থায়িত্ব, সামাজিক মর্যাদা এবং আর্থিক নিরাপত্তার আকাঙ্ক্ষা কাজ করে। কিন্তু সরকারি পদসংখ্যা সীমিত হওয়ায় বিপুলসংখ্যক প্রার্থী দীর্ঘ সময় ধরে নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত থাকেন। তাঁদের অনেকেই বেসরকারি চাকরি, কারিগরি প্রশিক্ষণ কিংবা বিকল্প পেশার সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন না।
অন্যদিকে, বেসরকারি খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেও সব খাতে সমান গতিতে তা বাড়ছে না। অনেক চাকরিতে অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়, অথচ নতুন স্নাতকদের সেই অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ সীমিত। আবার কোথাও শিক্ষাগত যোগ্যতার তুলনায় বেতন কম, কোথাও চাকরির নিরাপত্তা দুর্বল। ফলে চাকরি পাওয়া এবং মানসম্মত কর্মসংস্থান পাওয়ার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।
নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব, দীর্ঘসূত্রতা এবং অনিয়মের অভিযোগও চাকরিপ্রার্থীদের আস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে। যোগ্যতার ভিত্তিতে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা তাই অত্যন্ত জরুরি।
সমাধান কোথায়?
প্রথমত, শিক্ষাব্যবস্থাকে কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল যোগাযোগ, তথ্য বিশ্লেষণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং সমস্যা সমাধানের মতো দক্ষতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ এবং বাস্তবভিত্তিক প্রকল্পের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে সামাজিকভাবে মর্যাদাপূর্ণ করে তুলতে হবে। দেশের শিল্প, কৃষি, নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বিবেচনা করে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সাজাতে হবে। শুধু সাধারণ ডিগ্রির সংখ্যা বাড়ানো নয়, কোন দক্ষতার কতজন কর্মী প্রয়োজন, তার ভিত্তিতে শিক্ষার পরিকল্পনা করা জরুরি।
তৃতীয়ত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং স্থানীয় উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি কেবল সরকারি নিয়োগের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠায় সহজ ঋণ, প্রশিক্ষণ, পরামর্শ এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে তরুণেরা উদ্যোক্তা হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারবেন।
চতুর্থত, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগ, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদা ও চাকরির সুযোগ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সহজলভ্য করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা বিষয় নির্বাচন ও ক্যারিয়ার পরিকল্পনায় বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
পঞ্চমত, নারী ও প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, যাতায়াতের সুবিধা, ডিজিটাল প্রশিক্ষণ এবং আঞ্চলিক শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ রাজধানীকেন্দ্রিকতা থেকে বের করে আনতে হবে।
ডিগ্রি নয়, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সমন্বয় চাই
শিক্ষিত বেকারত্বের সমাধান শুধু নতুন চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ কিংবা চাকরিপ্রার্থীদের আরও বেশি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থা, অর্থনীতি, শিল্পনীতি ও কর্মসংস্থান পরিকল্পনার সমন্বিত সংস্কার। প্রতিবছর কতজন শিক্ষার্থী ডিগ্রি অর্জন করছেন, তার পাশাপাশি কতজন কর্মসংস্থান পাচ্ছেন, তাঁদের দক্ষতা কতটা কাজে লাগছে এবং নতুন কর্মক্ষেত্র কতটা তৈরি হচ্ছে এসব বিষয় নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে।
বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। যথাযথ শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলে এই জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উদ্ভাবন এবং সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু তাঁদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলে জনমিতিক সুবিধাই একসময় অর্থনৈতিক চাপে পরিণত হতে পারে।
সুতরাং, শিক্ষিত বেকারত্বের সমাধান খুঁজতে হলে আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে আমরা কি শুধু ডিগ্রিধারী মানুষ তৈরি করছি, নাকি দক্ষ, সৃজনশীল ও কর্মক্ষম নাগরিক গড়ে তুলছি? এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান নীতির দিকনির্দেশনা। শিক্ষা তখনই প্রকৃত অর্থে সফল হবে, যখন তা মানুষের জ্ঞান ও বিবেককে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি সম্মানজনক জীবিকা অর্জনের বাস্তব সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।
