সাপ নিয়ে যত কুসংস্কার বনাম বাস্তবতা
সাপ নিয়ে যত কুসংস্কার বনাম বাস্তবতা।
هُوَ ٱلَّذِی خَلَقَ لَكُم مَّا فِی ٱلۡأَرۡضِ جَمِیعࣰا }
পৃথিবীতে যা কিছু আছে তার সব কিছুই তিনি তোমাদের কল্যাণে সৃষ্টি করেছেন। সুরা বাকারা-২৯}
সুতরাং কোনো কিছুই এমনি এমনি সৃষ্টি করা হয়নি। সব কিছু সৃষ্টির পিছনেই রয়েছে মহান আল্লাহর হিকমত। পরিবেশের অন্যান্য জিনিসের মতো সাপও মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু সাপ নিয়ে আমাদের দেশে অনেক বেশি কুসংস্কার রয়েছে তাই সাপ দেখলেই লাঠি হাতে মারা জন্য ছুটে যাই। আজকে আমরা সাপ সম্পর্কিত বিভিন্ন কুসংস্কার ও তার আসল বাস্তবতা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করব।
উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে বাংলাদেশে প্রায় ৯৪ প্রজাতির সাপ রয়েছে। এদের মধ্যে তিন-চতুর্থাংশ সাপ নির্বিষ। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি পরিচিত Non venomous সাপের মধ্যে অন্যতম হলো ঢোঁড়া সাপ। এটি প্রচন্ড রাগী প্রজাতির সাপ এবং রেগে গেলেই কামড়াতে চায়। যেহেতু সে নির্বিষ তাই নিজের আত্মরক্ষার জন্যই এমন টা করে। তারপরেই রয়েছে দুধরাজ। নাম শুনেই মনে হচ্ছে এই সাপ বোধহয় দুধ খায়। সিনেমার সাপ দুধ খায় কিন্তু বাস্তবে শুধু এই সাপ না বরং কোনো সাপ-ই দুধ খায় না। সাপ সরীসৃপ প্রজাতির মাংসাশী প্রাণী। এরা মূলত ইঁদুর, ব্যাঙ, পাখি,মাছ ও পোকামাকড় খেয়ে জীবনধারণ করে। এছাড়াও রয়েছে লাউডগা ও ঘরগিন্নীসাপ।মেটে ও বেত আচড়া সাপ মৃদু বিষধর। তবে এই বিষ মানুষের জন্য ক্ষতিকর না। এটি কেবল ব্যাঙ ও ছোট মাছের মতো শিকার কে কাবু করতে ব্যবহৃত হয়। অজগরও Non venomous সাপ। এর প্রধান শক্তি হলো পেশিশক্তি। অজগর তার শিকার কে পেচিয়ে শ্বাসরোধ করে মেরে তারপর গিলে খায়। ছোটবেলায় আমরা বাংলা বইতে পড়ি ‘অ’ তে অজগর। অজগরটি আসছে তেড়ে। না, অজগর তেড়ে আসে না। অজগর খুবই অলস প্রকৃতির সাপ। এটি শিকারকে জন্য উৎপেতে থাকে। শিকার তার কাছাকাছি আসলে তখন শিকার করে খায়। কোনো সাপই তেড়ে আসে না। কারণ সাপ কোনো হিংস্র প্রাণী নয়।বরং এটি শিকারী প্রাণী। সাপ সাধারণত শিকারকে আক্রমণ করে। মানুষকে সাপ যখন বিপদ মনে করে করে তখন ভয় পেয়ে মানুষকে আক্রমণ করে।
আমাদের সমাজে একটি বহুল প্রচলিত কুসংস্কার আছে যে সাপ প্রতিশোধ পরায়ণ। যখন কোনো সাপকে মেরে ফেলা হয় তখন তার সঙ্গী সাপ আসেপাশে থাকলে সে পরবর্তীতে প্রতিশোধ নেয়। অথবা কোনো সাপকে মারার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে পরবর্তীতে ঐ সাপ কোনো না কোনো একদিন প্রতিশোধ নেয়।বাস্তবতা হলো সাপ খুবই নিম্ন মস্তিষ্কের প্রাণী। পাশাপাশি সাপের কোনো ইমোশন নাই। সাপ শুধু তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানায়। যার উপর প্রতিশোধ নিবে তাকে চিনে রাখা এবং পরবর্তীতে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তাকে অনুসরণ করার জন্য যে তীক্ষ্ণ ও দীর্ঘমেয়াদী বুদ্ধি ও আবেগ প্রয়োজন। তা সাপের একদম-ই নেই।
অজগরের সবচেয়ে বড় প্রজাতি হলো গোলবাহার অজগর। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে এটি প্রায় ২৮ ফুট পযর্ন্ত লম্বা হতে পারে। এটি পৃথিবীর একমাত্র সাপ যেটি মানুষ গিলে খাওয়ার রেকর্ড করেছে।
বাংলাদেশের বহুল পরিচিত বিষধর সাপের মধ্যে অন্যতম হলো:- পদ্ম গোখরো। এটি তীব্র বিষধর সাপ। পদ্ম গোখরো বাংলাদেশের একমাত্র সাপ যা,বিষ দাঁতের মাধ্যমে ইঞ্জেক্ট করার পাশাপাশি বিষ ছুড়তেও পারে। খৈইয়া গোখরো সাপও তীব্র বিষধর কিন্তু এটি পদ্ম গোখরার মতো বিষ ছুড়তে পারে না। বাংলাদেশের আরেকটি অন্যতম বিষধর সাপ হলো কমনক্রেইট বা কালাচ সাপ। এটি মূলত নীশাচর প্রাণী। রাতের বেলায় যেহেতু পরিবেশ এমনিতেই বেশ ঠান্ডা থাকে তাই এই সাপ উষ্ণতার খুজে অথবা খাবারের খুজে বসত বাড়িতে ঢুকে যেতে পারে।বেডরুমে ঢুকার মতো ব্যবস্থা থাকলে বিছানায়ও উঠে যেতে পারে। এই সাপ বিছানায় উঠে মানুষকে কামড়ানোর অসংখ্য রেকর্ডও আছে। এই সাপের বিষ নিউরোটক্সিন বিষ। এই সাপের দাঁত খুবই ছোট হওয়ায় এটা কামড় দিলে মানুষ ঘুমের মধ্যে বুঝতে পারে না বা মশার কামড় ভেবে এড়িয়ে যায়। এতে করে অধিকাংশ সময়ই মানুষ ঘুমের মধ্যে paralyzed হয়ে মারা যায়। কিং কোবরা তীব্র বিষধর সাপ। এর অন্যতম প্রধান খাদ্য হলো সাপ। তাই একে ‘সাপ খেকু’ সাপও বলা হয়। সাধারণত অন্য প্রজাতির সাপ ডিম পাহারা না দিলেও স্ত্রী কিং কোবরা ডিম পাহারা দেয়। বাংলাদেশের অন্যতম তীব্র বিষধর আরেকটি সাপ হলো সঙ্খীনি । এটিও নিশাচর প্রাণী। এটি কাল-হলুদ রঙের খুবই সুন্দর ব্যান্ডেড সাপ। এরা খুবই লাজুক স্বভাবের হয়। যার কারণে সারাদেশে এই সাপ থাকা সত্ত্বেও মানুষকে কামড়ানোর কোনো ইতিহাস নাই। তাই বাংলাদেশে এর কোনো প্রতিষেধকও নেই। এছাড়াও রয়েছে রাসেলস ভাইপার ও পিট ভাইপার।
সাপ শুধু মানুষের ক্ষতিই করে না বরং অনেক উপকারও করে। সাপের বিষ থেকে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদযন্ত্রের সমস্যাসহ বিভিন্ন জটিল রোগের ঔষধ তৈরি করা হয়। পাশাপাশি ইঁদুরে খেয়ে পরিবেশ রক্ষা করে। স্ত্রী ইঁদুর জন্ম নেওয়ার মাত্র ছয় সপ্তাহের মধ্যেই গর্ভধারণ করতে পারে। গর্ভকালীন সময় ১৯-২১ দিন। এবং এরা একবারে সর্বনিম্ন ছয় থেকে সর্বোচ্চ বারোটি বাচ্চা জন্ম দিতে পারে। সাপ যদি ইঁদুরে খেয়ে না কমায় তাহলে পরিবেশে ইঁদুর মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাবে। যা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করবে। আবার কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী ইঁদুর বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ধান নষ্ট করে। সাপ ইঁদুর খেয়ে ফসলের ক্ষতিও অনেকটা কমিয়ে আনে।
তাই সাপ দেখলেই মেরে ফেলবেন না। বরং স্থানীয় রেস্কিউ টিমের সাথে যোগাযোগ করে সাপকে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দিবেন। দূর্ঘটনাবসত সাপের কামড় খেলে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে যথাযথ চিকিৎসা নিবেন।
তাজরিন আক্তার মানছুরা।
আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
