শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

‎ছাং ওডং পাড়ায় পাবিপ্রবি প্রেসক্লাবের এক রাত ‎

Author

মোঃ মনিরুল ইসলাম , পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ পাঠ: ১৪ বার

‎ছাং ওডং পাড়ায় পাবিপ্রবি প্রেসক্লাবের এক রাত
‎
‎মনির খান, পাবিপ্রবি :
‎
‎পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ, মেঘের ভেলা, ঝরনার নির্মল জল আর পাহাড়ি মানুষের সহজ-সরল জীবন সব মিলিয়ে প্রকৃতির এক অন্যরকম সৌন্দর্যের সন্ধানে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সংগঠন পাবিপ্রবি প্রেসক্লাবের বার্ষিক ট্যুর–২০২৬-এর যাত্রা। এই ভ্রমণের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে আছে বান্দরবানের থানচির দুর্গম ছাং ওডং পাড়ায় কাটানো এক রাত।
‎
‎গত ১০ সেপ্টেম্বর পাবিপ্রবি প্রেসক্লাবের ১১ সদস্যের একটি দল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে দলীয় ছবি তুলে বান্দরবানের থানচির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। দলের সঙ্গে ছিলেন কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য, সাধারণ সদস্য ও শিক্ষানবিশ সদস্যরা। পরে চট্টগ্রাম থেকে যুক্ত হন প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আব্দুল্লাহ মামুন ও জাহিদ সোহেল। সব মিলিয়ে আমাদের দল ছিল ১৩ জনের।
‎
‎১১ সেপ্টেম্বর সকালে চট্টগ্রাম হয়ে বান্দরবানে পৌঁছাই আমরা। সেখান থেকে চাঁদের গাড়িতে শুরু হয় পাহাড়ি পথের যাত্রা। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা, চারপাশে সবুজ পাহাড় আর মেঘের আনাগোনা দেখতে দেখতে সন্ধ্যায় পৌঁছাই থানচিতে। গাইড ইদ্রিস ভাইয়ের সহযোগিতায় আগে থেকেই ঠিক করে রাখা হোটেলে উঠি। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তিতে সবাই কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিই। রাতে খাবার শেষে পরদিনের যাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতে বের হই।
‎
‎আমাদের দলের বেশিরভাগ সদস্যই ছিল পাহাড়ি ট্র্যাকিংয়ে নতুন। কারও আগে এমন দুর্গম পথে হাঁটার অভিজ্ঞতা ছিল না, আবার দলের কেউই পুরোপুরি অ্যাডভান্স ট্র্যাকারও ছিল না। তবুও অজানাকে জয় করার আগ্রহে পরদিন সকালে নাশতা শেষ করে আমরা বেরিয়ে পড়ি ছাং ওডং পাড়ার উদ্দেশে।
‎
‎থানচি থেকে সাঙ্গু নদীপথে এগিয়ে যেতে যেতে চোখে পড়ে পাহাড়ের মনোরম দৃশ্য। পথে চিংড়ি ঝরনা, কুমারী ঝরনা পেরিয়ে পৌঁছাই রাজা পাথরে। এখান থেকেই শুরু হয় আমাদের প্রায় তিন থেকে চার ঘণ্টার কঠিন ট্র্যাকিং।
‎
‎শুরুর দিকে সবার মধ্যেই ছিল শতভাগ আত্মবিশ্বাস। পাহাড়ি পথ যেন জয় করতেই হবে এই মনোভাব নিয়ে এগিয়ে চলছিলাম সবাই। কিন্তু এক ঘণ্টা পেরোতেই সেই আত্মবিশ্বাসের জায়গা নিতে শুরু করে ক্লান্তি। কখনো খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠতে হয়েছে, কখনো দুর্গম পথ পেরোতে হয়েছে। পথে ঝিরির স্বচ্ছ পানি বোতলে ভরে তৃষ্ণা মেটানো, কোথাও পাহাড়ি ফল পাওয়া গেলে কিনে খাওয়া আর সুযোগ পেলেই একটু বসে জিরিয়ে নেওয়া এভাবেই এগোতে থাকে আমাদের পথচলা।
‎
‎একসময় আমাদের ১৩ জনের দলটি দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। আমরা ছয়জন প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আলফি সানি ভাইয়ের সঙ্গে ছিলাম। পথের মধ্যে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ায় আমাদের কিছুটা বেশি সময় লাগে। তবে ক্লান্তি ও প্রতিকূলতাকে জয় করে শেষ পর্যন্ত আমরা ছাং ওডং পাড়ায় পৌঁছাতে সক্ষম হই।
‎
‎পাড়ায় পৌঁছে মাচানঘরে প্রবেশ করতেই চোখ আটকে যায় চারপাশের দৃশ্যে। চারদিকে পাহাড়, তার গায়ে মেঘের আনাগোনা মনে হচ্ছিল শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে অন্য এক পৃথিবীতে চলে এসেছি।
‎
‎ছাং ওডং পাড়ায় তখন বসবাস করছিল মাত্র ছয়টি পরিবার। বিকেলে আমাদের জন্য রান্না করা হয় ঝুম চালের ভাত ও ডিম ভুনা। খাবার খেতে বসেই পাড়ার এক ছেলের সঙ্গে শুরু হয় গল্প। গল্প করতে গিয়ে জানতে পারি, দুর্গম এই পাহাড়ি পাড়ায় জীবনযাপন কতটা কঠিন। কয়েকদিন পরপর থানচি থেকে ৪০ থেকে ৫০ কেজি পর্যন্ত পণ্য মাথায় করে উঁচু পাহাড়ের এই পাড়ায় নিয়ে আসতে হয় তাদের। ফলে সমতলের তুলনায় এখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের দামও কিছুটা বেশি।
‎
‎বিকেলের খাবারের পর হঠাৎ শুরু হয় বৃষ্টি। পাহাড়ের গায়ে মেঘ নেমে আসে, চারপাশ ঢেকে যায় বৃষ্টির স্নিগ্ধতায়। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, সত্যিই যেন স্বর্গের কাছাকাছি কোথাও এসে পড়েছি। পাহাড়, মেঘ আর বৃষ্টির সেই অপূর্ব মেলবন্ধন আমাদের ভ্রমণকে আরও স্মরণীয় করে তোলে।
‎
‎এরপর আসে আরেকটি আনন্দের মুহূর্ত। পাড়ার ভিউ পয়েন্টের এক পাশে মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই সবাই সেখানে ছুটে যাই। অনেকদিন পর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পেয়ে ফোনে কথা বলি। পাহাড়ের এত দুর্গম জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রিয়জনদের সঙ্গে কথা বলার অনুভূতিটাও ছিল অন্যরকম।
‎
‎সন্ধ্যার পর পাড়ার একটি দোকানে বসে প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আব্দুল্লাহ মামুন ভাইয়ের সঙ্গে চায়ের আড্ডায় মেতে উঠি। আড্ডায় উঠে আসে ছাং ওডং পাড়ার ইতিহাস। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানতে পারি, ২০০৩ সাল থেকে এই পাড়ার যাত্রা শুরু। পরবর্তীতে পর্যটকদের যাতায়াত বাড়তে থাকলে ধীরে ধীরে পাড়াটি মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে। পাহাড়ি মানুষের জীবন, পাড়ার শুরু, পর্যটকদের আগমন—সব মিলিয়ে গল্পের পর গল্প চলতে থাকে।
‎
‎রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাড়ার জুমঘরে আবার শুরু হয় আমাদের আড্ডা। দিনভর ট্র্যাকিংয়ের ক্লান্তি ভুলে গল্প, হাসি আর খাওয়া-দাওয়ায় কেটে যায় সময়। শেষ পর্যন্ত রাতের খাবার শেষে মাচানঘরে পাশাপাশি সারিবদ্ধ হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি আমরা ১৩ জন।
‎
‎পরদিন সকাল। পাহাড়ের নির্মল বাতাস আর মেঘের আবরণ ভেদ করে নতুন দিনের সূচনা। তবে দিনের শুরুতেই ছিল আমাদের একটি বিশেষ উদ্যোগ ছাং ওডং পাড়ার ভিউ পয়েন্টে পরিচ্ছন্নতা অভিযান।
‎
‎সকালে গাইড ইদ্রিস ভাইয়ের মাধ্যমে পাড়ার প্রধানের ছেলে উমন সিং মারমাকে সঙ্গে নিয়ে আমরা ভিউ পয়েন্টে যাই। সেখানে পর্যটকদের ফেলে যাওয়া বিভিন্ন বর্জ্য পরিষ্কার করে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করি। পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি প্রকৃতিকে পরিচ্ছন্ন রাখার এই ছোট্ট উদ্যোগ আমাদের ভ্রমণকে দিয়েছে ভিন্ন এক অর্থ।
‎
‎অভিযান শেষে ঘরে ফিরে খাবার খেয়ে আবার ব্যাগ কাঁধে তুলে নিই। সামনে অপেক্ষা করছিল আরও দুর্গম পথ গন্তব্য নাফাখুম। শুরু হয় আবারও চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার ট্র্যাকিং।
‎
‎ছাং ওডং পাড়ায় কাটানো সেই এক রাত আমাদের কাছে শুধু একটি ভ্রমণের অংশ নয় এটি ছিল পাহাড়ি মানুষের জীবনকে কাছ থেকে দেখা, প্রকৃতির নির্মল সৌন্দর্য অনুভব করা এবং নিজেদের সীমাবদ্ধতাকে একটু একটু করে অতিক্রম করার অভিজ্ঞতা। ১৩ জনের সেই ছোট্ট দল, পাহাড়ের মেঘ-বৃষ্টি, মাচানঘরে একসঙ্গে ঘুম, ঝুম চালের ভাত, চায়ের আড্ডা আর ভিউ পয়েন্টে পরিচ্ছন্নতা অভিযান সব মিলিয়ে ছাং ওডং পাড়ার সেই এক রাত আমাদের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে।
‎
‎মনির খান
‎পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
‎০১৭৫৬-০৮১৬৮৪
‎

লেখক: সভাপতি, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।