মৃত্যুর উপত্যকায় তারুণ্য: আত্মহত্যা কি কেবলই ব্যক্তিগত দায়?

মৃত্যুর উপত্যকায় তারুণ্য: আত্মহত্যা কি কেবলই ব্যক্তিগত দায়?
মো বাইজিদ শেখ
খবরের কাগজের পাতা উল্টালেই বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলেই আজকাল প্রায়শই একটি খবর মনকে গভীরভাবে বিষণ্ণ করে তোলে—তরুণদের, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা। সম্ভাবনাময় একেকটি প্রাণ ঝরে যাচ্ছে নীরবে। যখন কোনো তরুণ জীবনের সমাপ্তি টানার মতো চরম সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সমাজ খুব সহজেই তার ওপর ‘পরাজিত’ বা ‘ভীতু’ হওয়ার তকমা সেঁটে দেয়। কিন্তু একটিবারও কি আমরা তলিয়ে দেখি, এই মৃত্যুর দায় কি কেবলই সেই তরুণ বা তরুণীর একার? নাকি আমাদের সমাজ, শিক্ষাব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রিক কাঠামোর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে এই আত্মহননের মূল কারণ?
প্রত্যাশার পাহাড় ও সফলতার ইঁদুর দৌড়
আমাদের সমাজকাঠামোতে একজন তরুণের জীবন যেন তার নিজের নয়; বরং তা পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশা পূরণের এক নির্মম রেসট্র্যাক। জিপিএ ফাইভ, নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়া, এবং পরবর্তীতে একটি ‘নিরাপদ’ বা উচ্চ বেতনের চাকরির পেছনে ছুটতে গিয়ে তরুণরা নিজেদের সত্তাকে হারিয়ে ফেলছে। এই ইঁদুর দৌড়ে যারা সামান্য হোঁচট খায়, সমাজ তাদের ব্যর্থতার সিলমোহর দিয়ে দেয়। এই অবিরত চাপ এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ একজন তরুণকে তীব্র একাকীত্ব ও হতাশার দিকে ঠেলে দেয়, যা অনেক সময় তাকে আত্মহত্যার মতো চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।
মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি সামাজিক ট্যাবু ও উদাসীনতা
শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে আমরা যতটা সোচ্চার, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমরা ঠিক ততটাই উদাসীন। বিষণ্ণতা, উদ্বেগ (Anxiety), বা তীব্র মানসিক চাপকে আজও আমাদের সমাজে ‘পাগলামি’ বা ‘ধর্মীয় বিশ্বাসের অভাব’ হিসেবে দেখা হয়। একজন শিক্ষার্থী যখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে, তখন তার কথা শোনার বা তাকে পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের আওতায় আনার মতো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা আমাদের পরিবার বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নেই। মনের ভেতরে জমতে থাকা এই নীরব রক্তক্ষরণ একসময় তাকে মৃত্যুর উপত্যকায় নিয়ে যায়।
আইনি ও সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা: একটি জুরিসপ্রুডেনশিয়াল বিশ্লেষণ
বিষয়টিকে কেবল সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে, আইনি ও মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। আমাদের সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের ‘জীবনের অধিকার’ (Right to Life)-কে একটি অলঙ্ঘনীয় মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল বাহ্যিক আঘাত থেকে নাগরিককে রক্ষা করা নয়, বরং এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা যেখানে একজন নাগরিক সুস্থ ও সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে। পর্যাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কাঠামোগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারা কি পরোক্ষভাবে সেই সাংবিধানিক অধিকারের লঙ্ঘন নয়?
অন্যদিকে, আমাদের ঔপনিবেশিক আমলের দণ্ডবিধির (Penal Code, 1860) ৩০৯ ধারা অনুযায়ী, আত্মহত্যার চেষ্টাকে এখনও একটি দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। যে মানুষটি চরম মানসিক যন্ত্রণায় ভুগে, সমাজের সব দরজা বন্ধ দেখে মৃত্যুর পথ বেছে নিতে চেয়েছিল, বেঁচে গেলে তাকে আইনি কাঠগড়ায় দাঁড় করানো বা শাস্তির ভয় দেখানো কতটা অমানবিক হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। আধুনিক আইনবিজ্ঞান বা জুরিসপ্রুডেন্স দাবি করে, আত্মহত্যার চেষ্টাকারী কোনো অপরাধী নন; তিনি একজন ভুক্তভোগী। তার প্রয়োজন কারাগার বা জরিমানা নয়, তার প্রয়োজন সহানুভূতিশীল মানসিক চিকিৎসা ও আইনি সুরক্ষা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের করণীয়
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেবল সার্টিফিকেট উৎপাদনের কারখানা হলে চলবে না; এগুলোকে হতে হবে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর ও সার্বক্ষণিক সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং সেন্টার স্থাপন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। শিক্ষকদের হতে হবে আরও বেশি শিক্ষার্থীবান্ধব। পাশাপাশি, জাতীয় পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও এর বাস্তবায়ন জরুরি।
পরিশেষে, আত্মহত্যা কোনো একক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একজন তরুণের আত্মহত্যা মূলত আমাদের সামাজিক কাঠামোর এক চরম ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি—এটি এক ধরনের কাঠামোগত হত্যা (Structural murder)। সমাজকে বুঝতে হবে, একটি মৃত স্বপ্নের চেয়ে একটি জীবন্ত প্রাণ অনেক বেশি মূল্যবান। দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে সহানুভূতি ও ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিলেই কেবল মৃত্যুর এই উপত্যকা থেকে তারুণ্যকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
মো বাইজিদ শেখ
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ , গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

