রোহিঙ্গা সংকটে নিঃশব্দে এগিয়ে আসা হুমকি

তারেক আল মুনতাছির ▷
বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আগমন শুরু হয়েছিল মানবিক ট্র্যাজেডির পরিণতি হিসেবে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযানের মুখে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছিল বাংলাদেশ। সীমান্তের বুকে গড়ে উঠেছিল বিশাল আশ্রয়শিবির। তখন বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের মানবিকতার উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু বছর ঘুরতেই এই শরণার্থীরা পরিণত হতে শুরু করে এক অভ্যন্তরীণ সংকটে, যা এখন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মারাত্মক হুমকিতে রূপ নিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে যে তথ্য উঠে আসছে তা ভয়ঙ্কর ও গভীর উদ্বেগজনক। অনেক রোহিঙ্গা এখন আর শরণার্থী নয় তারা বাংলাদেশের নাগরিক পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে বিভিন্ন জালিয়াতির মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকের রূপ ধারণ করছে। ভুয়া জন্মসনদ, এনআইডি, পাসপোর্ট সবই তাদের নাগালের মধ্যে চলে এসেছে। যেখানে একজন বাংলাদেশির ভোটার হতে নানা ঝুকিতে পড়তে হয় তা তারা খুব সহজেই পেয়ে যাচ্ছে। তারা কেবল কক্সবাজার বা সীমান্ত এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই ছড়িয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম মহানগরীর কালামিয়া বাজার, হালিশহর, পাহাড়তলী, সীতাকুণ্ড, এমনকি রাজধানী ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও।
চট্টগ্রামের কালামিয়া বাজারকে এখন অনেকেই “ছদ্মপরিচয়ের ঘাঁটি” বলে আখ্যায়িত করছেন। এখানে শত শত রোহিঙ্গা পরিবার ভাড়া বাসায় বসবাস করছে, স্থানীয়দের মতো আচরণ করছে, এমনকি ভোটার তালিকাতেও নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে। বেশ কয়েকটি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, অনেক রোহিঙ্গা জন্মসনদ তৈরি করে তা দিয়েই এনআইডি এবং পরবর্তীতে পাসপোর্ট বানিয়ে দেশের বাইরে পর্যন্ত পাড়ি জমিয়েছে। একইভাবে ডেইলি স্টার-এর ২০২৩ সালের ২২ ডিসেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত “Rohingyas in disguise: Getting passports, flying abroad” শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ভুয়া পরিচয়ে তৈরি পাসপোর্টে রোহিঙ্গারা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে অভিবাসী হিসেবে যাচ্ছে। প্রতিবেদনে একাধিক রোহিঙ্গা পরিবারের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে যারা চট্টগ্রামের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ‘বাংলাদেশি’ পরিচয়ে বাড়ি ভাড়া করে বসবাস করছে। তাদের কেউ কেউ মধ্যপ্রাচ্যে কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশেও গেছে, বাংলাদেশের পরিচয়ে। যার ফল স্বরূপ কোনো রোহিঙ্গা বিদেশে অন্যায় করলে বাংলাদেশেরই নাম খারাপ হয়। এবং এটি হয়ে আসছে দিনের পর দিন।
এই অনুপ্রবেশ কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতার পরিচয় হিসেবে দেখছে তা না, এটি দুর্নীতির একটি রূপ যা এখন জাতীয় নিরাপত্তার মূলে আঘাত করছে। রোহিঙ্গারা নিজেরা তো আর কাগজপত্র তৈরি করতে পারছে না। তাদের সহায়তা করছে স্থানীয় কিছু দালালচক্র, জনপ্রতিনিধি ও অসাধু সরকারি কর্মকর্তা। টাকা, রাজনৈতিক যোগাযোগ বা নানা সুবিধার বিনিময়ে তারা এই জালিয়াতির পথ করে দিচ্ছে। নাগরিকত্বের সনদ একসময় ছিল রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রতীক এখন তা হয়ে উঠেছে কেনাবেচার পণ্য হিসেবেই দেখছে তারা। এর ফলাফলও স্পষ্ট। যারা বাংলাদেশের নাগরিক না, তারা এখন এই দেশের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে। মোবাইল সিম নিচ্ছে, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলছে, এমনকি সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ভাতা পর্যন্ত পাচ্ছে। এভাবে রাষ্ট্রের সম্পদ ভোগ করছে সেই জনগোষ্ঠী যারা কখনো এই রাষ্ট্রের অংশই ছিল না।
এটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধন করছে তা না রাজনৈতিক এবং সামাজিকভাবেও মারাত্মক ভাবে এগিয়ে আছে। যদি কোনো অঞ্চলে রোহিঙ্গা পরিচয়ে ভোট প্রদান শুরু হয়, তবে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণেও এই বহিরাগতরা অপ্রত্যক্ষভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। তারা যদি ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক দলের টার্গেট ভোটব্যাংক হয়ে ওঠে, তাহলে তা হবে জাতির জন্য ভয়ঙ্কর আত্মঘাতী পদক্ষেপ।
এই অবৈধ নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রবণতা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে বহুবার। আন্তর্জাতিক মহলে মিয়ানমার বরাবরই দাবি করে আসছে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারা নাকি “বাংলাদেশি মুসলিম”। এখন যখন রোহিঙ্গারাই বাংলাদেশের এনআইডি ও পাসপোর্ট নিয়ে ঘুরছে, তখন সেই দাবি আরও জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এতে করে বাংলাদেশ সরকারের মিয়ানমারের ওপর কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করার শক্তিও কমে আসছে। রোহিঙ্গারা নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল, সেটি নিয়ে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু যখন তারা এই রাষ্ট্রের পরিচয় ও নাগরিক কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু করে, তখন মানবিকতা আর বাস্তবতা এক জায়গায় মিল খুঁজে পায় না। এটি পরিণত হয় আত্মঘাতী উদারতার এক নিষ্ঠুর দৃষ্টান্তে।
সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, দেশের সাধারণ নাগরিক যখন সত্যিকারের নাগরিকত্ব পেতে বা সরকারি সেবা নিতে নানাভাবে হয়রানির শিকার হন, তখন রোহিঙ্গাদের অনায়াসে নাগরিক রূপে প্রতিষ্ঠা পাওয়া আমাদের প্রশাসনিক কাঠামোরই ব্যর্থতা প্রকাশ করে। এটি কেবল সরকারের নয় গোটা জাতির জন্যই লজ্জাজনক।
বর্তমানে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, অনেক রোহিঙ্গা আশ্রয়প্রার্থী ক্যাম্পে বায়োমেট্রিক নিবন্ধন করলেও তারা নির্দ্বিধায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা যাদের আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার কথা, বাস্তবে তারা অনেকটা বাংলাদেশি নাগরিকের মতো চলাফেরা করছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কিছু অসাধু বাংলাদেশি ব্যক্তি নিজেদের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে মোটা অঙ্কের বিনিময়ে এসব রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহে সহায়তা করছে। এর ফলে তারা শুধু ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তই হচ্ছে তা না, সহজেই নাগরিক সুবিধাও পাচ্ছে। যখন তারা কোনো অপরাধে জড়ায় বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হয়, তখন ওই ভুয়া আত্মীয় পরিচয়ের আড়ালেই আবার তাদের ছাড়িয়ে আনা হচ্ছে। এতে করে একদিকে জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে,অন্যদিকে সমাজে অপরাধপ্রবণতা বেড়ে চলেছে।
রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু মানবিক বা আন্তর্জাতিক বিষয় নয় এটি আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও নাগরিক পরিচয়ের জন্য এক গভীর হুমকি। ছদ্মনাগরিকত্বের আশ্রয়ে তারা যেভাবে দেশের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ছে, তা অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণে না আনলে ভবিষ্যতে আমরা নিজের পরিচয় নিয়েই সংকটে পড়ব। এখনই প্রয়োজন কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা। যারা রোহিঙ্গাদের ভোটার বানাতে সহায়তা করেছে নির্বাচন কমিশন বা আঞ্চলিক অফিসের এমন ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে ভুয়া ভোটার রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করে তাদের নাম তালিকা থেকে বাতিল ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এই প্রজন্মের দায়িত্ব সচেতনতা ও সাহসিকতার সঙ্গে এই সংকটের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের প্রকৃত পরিচয় ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। যেন আমরা কেউই নিজের পরিচয় হারিয়ে না ফেলি না কাগজে, না বাস্তবে।

