টিউশনি মিডিয়ার দৌরাত্ম্য দেখার কি কেউ নেই?

তারেক আল মুনতাছির ▷
বাংলাদেশে বর্তমানে গৃহশিক্ষকতা বা টিউশন দেশের লক্ষ লক্ষ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের উচ্চশিক্ষারত শিক্ষার্থীদের জীবনযুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, এই সেবামূলক ক্ষেত্রটিকে কেন্দ্র করে বর্তমানে গড়ে উঠেছে এক ভয়াবহ অন্ধকার জগত। বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে ‘টিউশন মিডিয়া’ নামক এক শ্রেণির অসাধু চক্র সাধারণ ও অসহায় শিক্ষার্থীদের ওপর যে লুণ্ঠন ও হয়রানি চালাচ্ছে, তা এখন সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এই ভঙ্গুর চক্রের প্রতারণা, জালিয়াতি এবং নারী শিক্ষার্থীদের প্রতি যে চরম অমানবিক আচরণ, তা আজ আমাদের সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের এক নগ্ন দলিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
টিউশন মিডিয়ার প্রতারণার জাল বিছানো হয় অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে। তাদের কার্যক্রম শুরু হয় চটকদার ও লোভনীয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে। ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে বা রাস্তার মোড়ে মোড়ে দেয়ালে সাঁটানো পোস্টারে দেখা যায় “জরুরি ভিত্তিতে উত্তরা বা ধানমন্ডিতে কিংবা বাংলাদেশের যেকোনো শহরের চিত্রিত হয় যে, ৮ম শ্রেণির ছাত্রের জন্য অভিজ্ঞ শিক্ষক প্রয়োজন, বেতন ৭০০০-১০০০০ টাকা”।
এই ধরনের বিজ্ঞাপন দেখে যখন কোনো আর্থিক সংকটে থাকা শিক্ষার্থী যোগাযোগ করে, তখন তাকে প্রথমে একটি ছোট অফিসে ডেকে আনা হয়। সেখানে রেজিস্ট্রেশনের নামে প্রথমেই ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। এরপর বলা হয়, প্রথম মাসের বেতনের ৫০ শতাংশ কিংবা আলোচনা সাপেক্ষে পর্যন্ত কমিশন দিতে হবে। অসহায় শিক্ষার্থীরা টিউশনি পাওয়ার আশায় ধারদেনা করে সেই টাকা অগ্রিম প্রদান করে। কিন্তু টাকা পাওয়ার পরই শুরু হয় মিডিয়া মালিকদের আসল রূপ।
তারা এমন সব ভুয়া ঠিকানা বা মোবাইল নম্বর দেয় যেখানে গিয়ে শিক্ষার্থী জানতে পারে ওই পরিবার আদৌ কোনো শিক্ষক খুঁজছে না। এভাবে কয়েক হাজার টাকা এবং মূল্যবান সময় নষ্ট করে শিক্ষার্থী যখন মিডিয়ার কাছে টাকা ফেরত চায়, তখন তাকে ভয়ভীতি দেখানো হয় বা অফিস থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়।
এই ধরণের জালিয়াতি নিয়ে আমাদের দেশের মূলধারার গণমাধ্যমে অসংখ্য লোমহর্ষক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, গত বছর একটি শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদে (২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫) উঠে এসেছিল যে, টিউশন মিডিয়ার প্রতারণার ফাঁদে শাবির শিক্ষার্থীরা। আবার, রাজধানীর ফার্মগেট ও নীলক্ষেত এলাকায় ডিবি পুলিশ বেশ কিছু ভুয়া টিউশনি মিডিয়া অফিসে অভিযান চালিয়েছে। সেই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, একই ছোট কক্ষ ভাড়া নিয়ে তিনটি আলাদা নামের মিডিয়া চালানো হচ্ছিল। তারা মূলত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অগ্রিম ফি নিয়ে কয়েক সপ্তাহ পর পর অফিসের সাইনবোর্ড বদলে ফেলে এবং পুরনো ফোন নম্বরগুলো বন্ধ করে দেয়। শত শত শিক্ষার্থী এভাবে তাদের টিউশন ফি’র জমানো টাকা হারিয়ে পথে বসেছে। এই চক্রটি এতটাই শক্তিশালী যে, তারা প্রতিনিয়ত তাদের নাম ও অবস্থান পরিবর্তন করে জালিয়াতি চালিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা কার বিরুদ্ধে কোথায় অভিযোগ করবে তাও বুঝতে পারে না।
সবচেয়ে ভয়াবহ ও উদ্বেগের বিষয় হলো নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও তাদের ওপর চলা মানসিক-শারীরিক হয়রানি। ছাত্রীরা সাধারণত নিরাপদ কর্মসংস্থান হিসেবে টিউশনিকে বেছে নেয়। কিন্তু প্রতারক চক্র অনেক সময় ‘ভুয়া অভিভাবক’ সেজে নারী শিক্ষকদের টার্গেট করে। গণমাধ্যমে এমন খবরও এসেছে যে, টিউশনি মিডিয়ার মাধ্যমে যোগাযোগ করে এক ছাত্রী একটি নির্দিষ্ট বাসায় পড়াতে গিয়ে শ্লীলতাহানি ও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মিডিয়াগুলো কোনো রকম যাচাই-বাছাই ছাড়াই নারী শিক্ষকদের অনিরাপদ বা নির্জন এলাকার বাসায় পাঠিয়ে দেয়।
শুধু তাই নয়, অনেক মিডিয়া মালিক নারী শিক্ষকদের ব্যক্তিগত তথ্য ও মোবাইল নম্বর অসাধু ব্যক্তিদের কাছে বিক্রি/ দিয়ে করে দেয়। এর ফলে ওই ছাত্রীরা দিনের পর দিন ফোনে কুপ্রস্তাব, বাজে মেসেজ এবং ব্ল্যাকমেইলের শিকার হন। নিরাপত্তাহীনতার এই চরম পরিস্থিতির কারণে অনেক মেধাবী ও আত্মনির্ভরশীল হতে চাওয়া ছাত্রী এখন এই পেশায় আসার সাহস পাচ্ছেন না, যা তাদের আর্থিক স্বাবলম্বী হওয়ার পথে বড় বাধা।
এই পুরো ব্যবস্থাটি একটি অত্যন্ত ভঙ্গুর ও জরাজীর্ণ কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এর যৌক্তিক কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই খাতের জন্য আমাদের দেশে কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বা আইনি কাঠামো নেই। গৃহশিক্ষকতা বা টিউটর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য কোনো লাইসেন্স বা জবাবদিহিতার বালাই নেই। অনেকে ঘরের বসে এটা পরিচালনা করে। এটা ভালো দিকও আছে। তবে অনেক সময় বাধ্য হয়ে নিতে হয়। একটা টিউশন পেতে কত আহাজারি! প্রথম মাসের বেতনের হাফ কমিশন, আবার সেই টিউশনে টাকা বেশে হলে পরের মাসে আবার কমিশন নেয়। ফলে যে কেউ একটি ঘর ভাড়া নিয়ে একটি টেবিল-চেয়ার পেতে মিডিয়া খুলে বসতে পারে। এই অরাজকতার সুযোগ নিচ্ছে সুবিধাবাদী চক্র। তারা জানে যে, সাধারণ শিক্ষার্থীরা আইনের ঝামেলায় জড়াতে চায় না এবং তাদের কোনো কেন্দ্রীয় সংগঠন নেই। ফলে প্রতিবাদ করার মতো কেউ নেই। আবার অনেক সময় দেখা যায়, এই মিডিয়াগুলো অভিভাবক ও শিক্ষকের মাঝে এক কৃত্রিম দূরত্ব তৈরি করে রাখে। তারা অভিভাবকদের কাছ থেকে এক কথা বলে টাকা নেয়, আবার শিক্ষকদের দেয় অন্য প্রতিশ্রুতি। মাঝখান থেকে মিডিয়া বড় একটি অংশ হাতিয়ে নেয় এবং কোনো সমস্যা হলে দায় নিতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। অনেক সময় অভিভাবকরাও শিক্ষকদের সাথে বিরূপ আচরণ করেন বা মাসের শেষে পাওনা বেতন না দিয়ে তাদের বিদায় করে দেন, যেখানে শিক্ষকের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ থাকে না।
শিক্ষার্থীদের এই অসহায়ত্বের পেছনে আরও একটি বড় কারণ হলো কর্মসংস্থানের অভাব। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী যখন তার পড়ার খরচ মেটাতে হিমশিম খায়, তখন সে বাধ্য হয়েই এই সব মিডিয়ার খপ্পরে পড়ে। তারা জানে এটি ঝুঁকিপূর্ণ, তবুও পেটের দায়ে তারা এই জুয়া খেলে। আর এই চরম অভাবকেই পুঁজি করে মিডিয়াগুলো নিজেদের পকেট ভারী করছে। তারা শিক্ষার্থীদের কোনো মানুষ হিসেবে নয়, স্রেফ ‘পণ্য’ হিসেবে বিবেচনা করে।
এই সামাজিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। প্রথমত, প্রতিটি টিউশনি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে সরকারি বা স্থানীয় প্রশাসনের অধীনে নিবন্ধিত হতে হবে এবং তাদের সার্ভিস চার্জের একটি সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দিতে হবে। লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়মিত কঠোর অভিযান চালাতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় ও বড় বড় কলেজের নিজস্ব ‘টিচার্স লাউঞ্জ’ বা ‘টিউটর সেল’ থাকা উচিত, যেখানে অভিভাবকরা সরাসরি যোগাযোগ করে বিশ্বস্ত শিক্ষক খুঁজে পাবেন। এতে করে অসাধু মাঝারিশ্রেণির দৌরাত্ম্য বন্ধ হবে। তৃতীয়ত, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে থাকা ভুয়া বিজ্ঞাপনদাতাদের শনাক্ত করতে সাইবার ক্রাইম ইউনিটের নজরদারি বাড়ানো দরকার।
টিউশন সেক্টরের এই অরাজকতা কেবল ব্যক্তিগত কোনো সমস্যা বললেও কম হয়ে যায়। হাজার হাজার মেধাবী মুখ যখন সামান্য আয়ের আশায় পথে পথে ঘুরে প্রতারিত হয় এবং লাঞ্ছিত হয়, তখন তা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতাকেই নির্দেশ করে। শিক্ষার মতো পবিত্র একটি বিষয়কে নিয়ে যারা এমন নোংরা ও বিপজ্জনক ব্যবসায় মেতে উঠেছে, তাদের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সময়ের দাবি। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা না গেলে মেধাবী প্রজন্ম হতাশায় নিমজ্জিত হবে, যার প্রভাব পড়বে পুরো জাতির ওপর। তাই এই প্রতারণা ও হয়রানির ভঙ্গুর চক্র ভেঙে দিয়ে একটি স্বচ্ছ ও নিরাপদ ব্যবস্থা গড়ে তোলা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।

