বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

বাহারি ফলের উৎসব

Author

আব্দুল্লাহ আল নাঈম , চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৫ পাঠ: ৬৫ বার

ঘড়ির কাঁটায় সময় তখন দুপুর ২টা। মাথার উপরের গগণটা হালকা মেঘাচ্ছন্ন, প্রাকৃতিক আবহাওয়া আর সূর্যের তাপ সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। দিনটি ছিল শ্রাবণের এক মঙ্গলবারের দুপুর। আকাশটা হালকা মেঘলা থাকলেও বৃষ্টির সম্ভাবনা ছিল না। ক্লাস শেষে একটুখানি ফুরসত পেয়েই উদ্যানের মাঠে একত্রিত হয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী। সংখ্যায় ছিল ৭২ জন। কিন্তু আনন্দের ছলে সেদিন গণনা করেছিলাম ১৮ হালিতে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষের আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে এই প্রথম মৌসুমি ফল উৎসবের আয়োজন ছিল এটি। ফল উৎসবের আয়োজন বাস্তবায়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ উদ্যানের খোলা মাঠকে নির্বাচন করা হয়েছে। উদ্যানের মধ্য-দক্ষিণ কোণের বড় সবুজ মাঠে উৎসবের ভেন্যু নির্ধারণ করা হয়।

পর্যায়ক্রমিকভাবে ছুটে আসছেন সবাই, দুপুর সোয়া ২টার মধ্যেই পূর্ণ হয়ে যায় উৎসবস্থল। বসার জন্য কেউ নিয়ে এসেছিলেন মাদুর বা পাটি, আবার কেউ বিছানার চাদর। আর বাকিরা বসেছেন সারিবদ্ধভাবে মাঠের সবুজ ঘাসে। এ সময় সকলের প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে মুখর হয়ে উঠে উদ্ভিদ উদ্যানের পুরো আঙিনা।

শুধু ফল খাওয়াতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও। ফল পরিবেশনের পূর্বে উদ্যানের আঙ্গিনায় সংগীত, হামদ, নাত, কৌতূক, নাটক, বাংলাম্যাশ আর কাওয়ালি পরিবেশন করা হয়। ক্লান্তিহীন চিত্তে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন সবাই। এভাবে করেই হাসি-ঠাট্টা আর আড্ডার মাধ্যমেই নিজেদের মাঝে তৈরি হয় পরিচয়-পরিচিতি, সুখ-দুঃখ, ঐক্য আর সম্প্রীতির অনুভূতি। সেটা যেন ভ্রাতৃত্ববোধের জায়গা থেকে হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের অদ্ভুত খুনশুটি, বন্ধুত্বের এ শক্তিশালী বন্ধন।

উল্লেখ্য যে, পাহাড়ি ক্যাম্পাস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উদ্ভিদ বাগানের খ্যাতি রয়েছে বেশ। ক্লাসের ফাঁকে সময় পেলে অনেকেই এখানে ঘুরতে আসেন, মন খারাপ থাকলে সবুজের কাঁচা গন্ধের প্রকৃতিতে ছুটে যান। গাছের নিচে এলোপাতাড়ি পড়ে থাকা শুকনো পাতা মাড়ানোর মর্মরধ্বনিতে হাঁটতে গিয়ে আনন্দ খুঁজে পান। কেননা, উদ্ভিদ বাগানের চত্বরজুড়ে ঠাণ্ডা পরিবেশ আর স্নিগ্ধ হাওয়া বয়ে চলে সবসময়। আর এই বাগানটির দেখভালে সবসময় নিরাপত্তাকর্মীরা সরব, সেদিন গিয়ে তাদের আচরণ পেয়েছিলাম আন্তরিকতা ও হৃদ্যতায় পূর্ণ।

উৎসবের আয়োজন নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন বেশ কিছু শিক্ষার্থী, জানিয়েছেন তাদের মনের অনুভূতির বয়ান। তাদের মধ্যে আয়োজকদের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ইমাম হোসাইন বলেন— এত সুন্দর উৎসব পেয়ে আমরা সত্যিই পুলকিত। বন্ধুত্ব, সম্প্রীতি আর সৌহার্দ্যরে বন্ধন যেন আরো দৃঢ় ও মজবুত হয়, সে লক্ষ্যেই সম্মিলিত আয়োজন। আমাদের বন্ধুদের টানা কয়েকদিনের জোর প্রস্তুতির পর এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনেকের সংশ্লিষ্টতা ছিল, আয়োজকদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

বন্ধুত্বের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ ফলের উৎসবকে অনন্য করে তুলেছে উল্লেখ করে জান্নাতুল মাওয়া জায়তুন অভিব্যক্তি প্রকাশ করে বলেন, প্রকৃতির সবুজে বসে ফল খাওয়ার আনন্দ চমৎকার। আয়োজিত ফল উৎসব ছিল এক অসাধারণ অভিজ্ঞতায় পূর্ণ, যা আমাদের রসনাতৃপ্তিই নয়, মনকেও পরিপূর্ণ করে তুলেছে। বিভিন্ন প্রকারের মৌসুমি ফলের সমাহার, সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ এবং বন্ধুত্বের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ আয়োজনকে করে তুলেছে অনন্য ও স্মরণীয়।

সমতল আর পাহাড়ি ভূমিতে উৎপাদিত ফলের স্বাদের পর্যবেক্ষণ নিয়ে কথা বলেছেন আরবি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষার্থী ফারজানা মাহবুবা। চট্টগ্রামের এই বাসিন্দা বলেন, ভূ-প্রকৃতির কারণে সমতলের তুলনায় পাহাড়ি ফলের স্বাদ একটু বেশি হয়। পাহাড়ি এলাকার ঠাণ্ডা জল ও শুদ্ধ বাতাস ফলের গুণগতমান ঠাণ্ডা দেয়, যা স্বাদকে করে তোলে আরো অনন্য। পাশাপাশি কীটনাশক ব্যবহার না হওয়ার কারণে এবং পাহাড়ি মাটিতে খনিজ পদার্থ বেশি থাকায় এই ফলগুলো বেশ সুস্বাদু হয়।

উৎসবের স্মৃতিচারণ করে সাবিত হাসান জানিয়েছেন, সবুজের পটে বসে প্রকৃতির দেওয়া বাহারি ফলের স্বাদ আস্বাদনের অনুভূতি অন্যরকম। এই ধরনের উৎসব আমাদের বন্ধুত্বে পারস্পরিক বন্ধনকে আরো দৃঢ় করে। ফল উৎসব শুধু একটি আয়োজন নয়, এটি আমাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ, সহযোগিতা এবং আনন্দ ভাগাভাগির এক অনবদ্য মাধ্যম।

অবশেষে এলো সাংস্কৃতিক সূচির শেষলগ্নের সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্ত- ফল খাওয়া। সামনে সাজানো ছিল বাংলাদেশের বাহারি সব ফল। উৎসবের আয়োজনে যুক্ত হয়েছিল অন্তত ১০ প্রকারের বিভিন্ন ধরনের ফল। ছিল পেয়ারা, আপেল, খেজুর, পেঁপে, আনারস, ড্রাগন, কলা, গাব, মাল্টাসহ রসালো সব ফলের সমাহার। ক্লাসমেটরা দলবেঁধে ফলের স্বাদে মেতে ওঠেন।

লেখক: সম্পাদকীয় পর্ষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৯ আগস্ট ২০২৫ তারিখে দৈনিক আমাদের সময় ও প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!