অকৃত্রিমতার আবেদন ধারা বয়ে চলুক

অকৃত্রিমতার আবেদন ধারা বয়ে চলুক
দূর্বা ঘাস দিয়ে জল ঝরা, ধানের সবুজ শীষে আঙুল মেলালে আঙুল- জলকণার সখ্য, জল ঝরা দূর্বাতে খালি পায়ের পাতা মেলালে শিশির ভেজা ঘাসের ছোঁয়া, দৃষ্টি মেলালে কুহেলি জড়ানো দিগন্ত; প্রকৃতির অপরূপ-রূপের মাঝে বাঙালি হৃ দয়ের আবেদন হয়ে ওঠে গরম-অমৃত ভাপা পিঠা, হাড় কাঁপানো শীতের সকালের মাটির কলসি ভরা কাঁচা খেজুর রস, দুধ-খেজুর রসের মিশ্রণে অকৃত্রিম ঘ্রাণে ভরপুর চিতই পিঠা (চাকতি সদৃশ এ এক নরম তুলতুলে লোমকূপ বিছানো, সুগন্ধি ছড়ানো বাঙালি খাদ্য।)
শীতের উত্তরে হাওয়া এখনো গুনগুনিয়ে সুর তুলে কানের পাশ বেয়ে চলে, উত্তরে হিমেল হাওয়ারা এখনো স্নান করায় তার শুভ্রতা দিয়ে, শরীরে-হৃ দয়ে পুলক জাগায়; তার-আমাদের সখ্য এখনো জীবন্ত। এ আজকের আমরা শৈশবের শীতের বিকালে চাদরখানা গায়ে মুড়িয়ে দাদু-নানু-মামা-চাচাদের পেছনে ছুটতাম মাটির কলসি-হাঁড়ি খেজুর কাণ্ডে লাগানো দেখতে, লেপ-কম্বলের সঙ্গে ভালোবাসার বিচ্ছেদ ঘটিয়ে খুবই ভোরে উঠে বসে থাকতাম পাটালিগুড় বানানোর উদ্দেশ্যে আগুনের আঁচে বসানো কড়াইকে হার মানিয়ে কাঁচা খেজুর রসকে নিজের পাকস্থলির করে নিতে। আজও প্রকৃতির সেই সুন্দরতম হাতছানি থাকলে আমাদের অনুজেরা ছুটত, ওরাও খেজুর রস ছিনিয়ে নেওয়ার প্রতিযোগী হতো।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হলেও বড়ই সত্য, আমরা বাঙালিই আছি, শীতও আসে, আমাদের বাঙালি চাহিদাও একই আছে শুধু নেই আমাদের সচেতনতার দৃষ্টি, আমরা কৃত্রিম বস্তুকে বসিয়েছি অকৃত্রিমতার জায়গাতে; এগুলো নিয়েই বাঙালি মনকে বোঝাচ্ছি তৃপ্ত থাকতে। সেই হাতছানি দিয়ে ডাকা প্রকৃতি বিলীনপ্রায়, শিল্পীর তুলিতে আঁকা খেজুর গাছের সমারোহ প্রকৃতিতে একসময় বিদ্যমান থাকলেও আজ তা সমারোহ থেকে হঠাৎ খুঁজে পাওয়া গাছ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। খেজুর গাছের ক্রমহ্রাসের ফলে আমরা সেই অকৃত্রিম-নিখাদ পাটালিগুড়ও পাচ্ছি না, পাচ্ছি না সেই চুলার পাশে বসে গোগ্রাসে গেলার মতো অমৃত স্বাদের গরম ভাপা পিঠা, পাচ্ছি না সেই হাঁড়ি হাঁড়ি কলসি কলসি কাঁচা খেজুর রস।
আমরা বাঙালিরাই পারব সেই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে যদি একটু সচেতন হই, অকৃত্রিমতার স্থানকে কৃত্রিমতায় পূর্ণ না করি। আমাদের হৃ দয়-মন-জিহ্বাকে তৃপ্ত করার উদ্দেশ্যে, বাঙালিপনা গাম্ভীর্য বজায় রাখতেই খেজুর গাছকে বাঁচিয়ে রাখা উচিত; প্রকৃতির নিকট ক্ষমার আবেদন রেখে নতুন খেজুর গাছের জীবন দিতে উদ্যমী আমাদেরকেই হতে হবে কারণ প্রকৃতির সেই সুন্দরতম হাতছানির অভ্যেসকে আমরাই ধ্বংস করেছি।
জারিয়াতুল হাফসা,
শিক্ষার্থী, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
