বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

হোক জয় বিবেকের

Author

আব্দুল্লাহ আল নাঈম , চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২ জুলাই ২০২৫ পাঠ: ১৮০ বার

জীবনের চেয়ে মূল্যবান কিছু নেই। অথচ সমাজে কিছু কিছু প্রথা ও তথাকথিত রেওয়াজ মানুষের জীবনকেই তুচ্ছ করে তোলে। সময়ের সঙ্গে সভ্যতা যতই অগ্রসর হোক না কেন, কিছু কুসংস্কার এখনো সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বেঁধে আছে। এ অমানবিক চর্চাগুলোর কারণে প্রতিনিয়ত অপমান, অবহেলা, এমনকি আত্মহত্যার মতো ভয়ানক পরিণতির শিকার হতে হয় মানুষকে, বিশেষত নারীদের।

সমাজে কিছু রেওয়াজ এমনভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, যেন তা ধর্ম বা আইনের চেয়েও বড় কিছু। অথচ এসব প্রথার পেছনে নেই কোনো ধর্মীয় ভিত্তি, নেই কোনো যুক্তি। শুধু লোকলজ্জা আর সামাজিক মর্যাদার অপব্যাখ্যা থেকে জন্ম এসব মানসিক শোষণের। নারীকে যেন কেবল পরিবারের ইজ্জত বহনকারী হিসাবে ভাবা হয়, তার আত্মমর্যাদা বা ব্যক্তি স্বাধীনতা যেন প্রথার মুখে ম্লান হয়ে যায়।

যেমন, বিয়ের পর মেয়ের বাবার বাড়ি থেকে কুরবানির পশু পাঠানো, ঈদের কাপড় পাঠানো বা উপহার দেওয়ার যে প্রথা চালু আছে, তা অনেক পরিবারে এক ধরনের মানসিক সন্ত্রাসে পরিণত হয়েছে। এই ‘রেওয়াজ’ না মানলে মেয়েকে শ্বশুরবাড়িতে অপমানিত হতে হয়, কথায় কথায় শুনতে হয় কটূক্তি, এমনকি তার স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির লোকজনের অবহেলার মুখোমুখি হতে হয়।

অপমানের যন্ত্রণা অনেক নারী সহ্য করতে না পেরে চরম পথ বেছে নেন। এ ঘটনা নিছক পারিবারিক কলহ নয়, এটি এক ধরনের কাঠামোবদ্ধ সামাজিক সহিংসতা, যার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি।এই প্রেক্ষাপটে প্রথা নয়, বিবেকের জায়গা থেকেই সমাজ পরিচালিত হওয়া উচিত। একটি সমাজ তখনই সুস্থ ও সভ্য হয়, যখন সেখানে মানবিকতা ও সহানুভূতি প্রাধান্য পায়, প্রথা নয়। কোনো রেওয়াজ যদি মানুষের সম্মানহানির কারণ হয়, কারও মানসিকতাকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়, তবে সেটি পরিত্যাজ্য।

প্রথার দোহাই দিয়ে কাউকে আত্মহননের পথে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই সভ্যতার পরিচায়ক হতে পারে না। আমাদের দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী যৌতুক দাবি করা দণ্ডনীয় অপরাধ। ‘যৌতুক নিরোধ আইন ১৯৮০’ ও ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০’-এর মতো আইন রয়েছে; কিন্তু এসব আইন বাস্তবায়নে রয়েছে ঘাটতি। নির্যাতনের শিকার হলেও অনেক নারী সামাজিক মানসম্মানের ভয়, সংসার ভাঙার শঙ্কা বা প্রতিবাদের পথ জানা না থাকার কারণে চুপ থাকেন। ফলে এ কুপ্রথাগুলো টিকে থাকে এবং আরও বহু নারীকে একই পথের দিকে ঠেলে দেয়।

এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হলে শুধু আইন দিয়ে হবে না। প্রয়োজন সামগ্রিক সামাজিক সচেতনতা, নৈতিক শিক্ষার প্রসার এবং ধর্মীয় সহমর্মিতা। শিশুদের শৈশবেই পাঠ্যবইয়ে মানবিক মূল্যবোধ শেখানোর পাশাপাশি এসব কুসংস্কারকে ঘৃণা করতে শেখানো জরুরি। একই সঙ্গে মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত, শিক্ষক ও সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের এ ব্যাপারে দায়িত্ব নিতে হবে। ধর্মীয় আলোচনায় বারবার তুলে ধরতে হবে, এসব কুসংস্কার কোনো ধর্মই সমর্থন করে না। দেশে মানবিক ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলো কুরবানির সময় গরিব-অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর মতো উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকে।

যারা সামর্থ্য না থাকার কারণে ঈদের দিনে কোরবানির পশুর মাংস জোগাড় করতে পারেন না, তাদের পাশে এ সংস্থাগুলোকে দাঁড়াতে দেখা যায়। এ প্রতিষ্ঠানগুলো যে ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে, তা সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। আমাদের উচিত এ ধরনের কার্যক্রমের প্রচার ও প্রসার ঘটানো। একই সঙ্গে গণমাধ্যমেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এগিয়ে আসতে হবে সমাজের তরুণদেরও। কারণ, তরুণরাই সমাজ পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি। মানবিক সমাজ গড়াই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। রেওয়াজ নয়, বিবেকের জয় হোক।

লেখক: সম্পাদকীয় পর্ষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২ জুলাই ২০২৫ তারিখে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!