অসম অর্থনীতি: ঈদের আনন্দ সার্বজনীন হবে কবে?

অসম অর্থনীতি: ঈদের আনন্দ সার্বজনীন হবে কবে?
মো বাইজিদ শেখ
আকাশে শাওয়ালের একফালি চাঁদ উঁকি দিলেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এক অনাবিল আনন্দ। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের এক অপূর্ব মিলনমেলা। ধনী-গরিব কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক কাতারে দাঁড়ানোর এই দিনটি মূলত ভেদাভেদ ভুলে যাওয়ার দিন। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে যদি প্রশ্ন করা হয়—ঈদের এই আনন্দ কি সত্যিই সার্বজনীন? উত্তরটি বড্ড কঠিন এবং রূঢ়। আমাদের চারপাশে তাকালেই এক অসম অর্থনীতির নিষ্ঠুর চিত্র চোখে পড়ে, যা ঈদের এই সার্বজনীনতার ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।
অধিকার ও সমতার সাংঘর্ষিক রূপ:সংবিধানে সুযোগের সমতা ও ন্যায়বিচারের কথা সুনির্দিষ্ট থাকলেও বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে চিত্রটি অনেকটাই ভিন্ন। আইনের চোখে সবাই সমান—এই নীতির চর্চা অনেক ক্ষেত্রেই হোঁচট খাচ্ছে। সম্পদের সুষম বণ্টন না হওয়ায় মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে দেশের বেশিরভাগ সম্পদ কুক্ষিগত হচ্ছে। প্রভাবশালীরা সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে, আর প্রান্তিক মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার ও বিচার থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা যেন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। একদিকে উন্নয়ন আর কাঠামোগত অগ্রগতির চাকচিক্য, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের নীরব সংগ্রাম।
শহরের বিলাসবহুল শপিংমলগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় সেখানে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। লাখ টাকার পোশাক, দামি পারফিউম আর জুতো কেনার প্রতিযোগিতায় মত্ত সমাজের একটি বিশেষ শ্রেণি। তাদের কাছে ঈদ মানেই বিদেশে ঘুরতে যাওয়া কিংবা আভিজাত্যের প্রদর্শনী। অন্যদিকে, সমাজের বৃহত্তর একটি অংশ—নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা—ফুটপাতের দোকানে বা সস্তা মার্কেটে গিয়েও দরদাম করতে করতে ঘাম মুছে ফেলছেন। সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে নিজের জন্য একটি নতুন জামা কেনার চিন্তাও বাদ দিতে হচ্ছে অনেককে। এক দেশে, একই উৎসবে এমন আকাশ-পাতাল বৈষম্য সত্যিই হতাশাজনক।
রাজধানীর এক বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে দশ বছরের শিশু গৃহকর্মী ময়নার ঈদ কাটে রান্নাঘরের ধোঁয়ায়। বাড়ির মালিকের সমবয়সী মেয়ে যখন দশ হাজার টাকার লেহেঙ্গা পরে উৎসবে মেতেছে, ময়নার গায়ে তখন মালিকের দেওয়া ফুটপাতের সস্তা ও মাপে বড় একটি সুতির ফ্রক। ড্রয়িংরুমে যখন উৎসবের ভোজে সবাই ব্যস্ত, ময়না তখন রান্নাঘরের এক কোণে মেঝেতে বসে নীরবে চোখের জল ফেলে। সে ভাবে, গ্রামে তার ছোট ভাইটার কি ঈদে কোনো নতুন জামা জুটেছে? একই ছাদের নিচে মাত্র কয়েক হাত দূরত্বে থাকা দুটি শিশুর এই আকাশ-পাতাল ব্যবধানই আমাদের সমাজের রূঢ় অর্থনৈতিক বৈষম্যের সবচেয়ে করুণ চিত্র।
ঈদের আনন্দ অনেকটাই নির্ভর করে উৎসবের আয়োজনের ওপর। কিন্তু বর্তমান বাজার পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার অনেকটাই বাইরে চলে গেছে। আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি এবং অসাধু বাজার সিন্ডিকেটের কারণে চাল, ডাল, মাংস থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি জিনিসের দাম সাধারণের নাগালের বাইরে। একজন শ্রমজীবী মানুষের সারা মাসের আয় দিয়ে যেখানে পরিবারের স্বাভাবিক ভরণপোষণই অসম্ভব, সেখানে ঈদের বাড়তি খরচ তাদের কাছে এক বিশাল বোঝা। জিডিপি প্রবৃদ্ধি বা মাথাপিছু আয়ের পরিসংখ্যান যতই চাকচিক্যময় হোক না কেন, সম্পদের সুষম বণ্টন না হওয়ায় এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছাচ্ছে না।
বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ধনকুবের। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে দেশের বেশিরভাগ সম্পদ কুক্ষিগত হয়ে পড়ছে। ইসলামি অর্থব্যবস্থায় জাকাত ও ফিতরাকে সম্পদ বণ্টনের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ধরা হয়, যা সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য আনতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে জাকাত প্রদানের ব্যবস্থাটি কাঠামোগত ও উৎপাদনমুখী না হয়ে কেবলই লোকদেখানো শাড়ি-লুঙ্গি বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। ফলে দারিদ্র্য বিমোচনে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
ঈদের আনন্দ কেবল তখনই সার্বজনীন হবে, যখন সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও স্বস্তি পাবে। এর জন্য রাষ্ট্রকে এমন সুষম অর্থনৈতিক নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে যাতে সম্পদ গুটিকয়েক মানুষের হাতে জিম্মি না থাকে। পাশাপাশি কঠোর হাতে বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে হবে। শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করাও সমান জরুরি। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক জাকাত ব্যবস্থাপনা তৈরি করে সেই তহবিলকে উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করে হতদরিদ্রদের স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নিতে হবে।
ঈদের চাঁদ কেবল ধনীর আকাশে নয়, গরিবের আকাশেও ওঠে। কিন্তু সেই চাঁদের আলোয় সবার ঘর সমানভাবে আলোকিত হয় না। যতদিন পর্যন্ত সমাজে এই তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য বিরাজ করবে, ততদিন ঈদের আনন্দ সার্বজনীন হওয়ার কথাটি কেবলই বইয়ের পাতার একটি তাত্ত্বিক বুলি হয়েই থাকবে। আমাদের সকলের উচিত নিজ নিজ অবস্থান থেকে বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করা, তবেই হয়তো একদিন সত্যিকার অর্থেই ঈদের আনন্দ ঘরে ঘরে সমানভাবে উদযাপিত হবে।
বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে যেদিন প্রতিটি জীর্ণ কুটিরেও এক চিলতে হাসির রেখা ফুটবে, সেদিনই সত্যিকার অর্থে পূর্ণতা পাবে ঈদের চাঁদ। আসুন, কেবল নিজেদের ভোগে নয়, বরং সবার সাথে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমেই আমরা এক সার্বজনীন ঈদের অপেক্ষায় নিজেদের প্রস্তুত করি।
মো বাইজিদ শেখ
শিক্ষার্থী, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল: shmdbayazid@gmail.com
মোবাইল:01835544692

