বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

উচ্চশিক্ষা বনাম কর্মসংস্থান

Author

মো বাইজিদ শেখ , Gopalganj science and technology University

প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ৩৪ বার

উচ্চশিক্ষা বনাম কর্মসংস্থান

মো. বাইজিদ শেখ
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত সাফল্যের অন্যতম প্রধান পথ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি যেন জীবনের নিশ্চিত অগ্রগতির প্রতিশ্রুতি—এমন ধারণা এখনো সমাজে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু বাস্তবতার নির্মম চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ক্রমেই বাড়ছে, যা তরুণ প্রজন্মের জন্য এক গভীর সংকটের জন্ম দিচ্ছে। ফলে “উচ্চশিক্ষা বনাম কর্মসংস্থান” আজ একটি জরুরি জাতীয় আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
প্রথমেই যে বিষয়টি সামনে আসে, তা হলো শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে অসামঞ্জস্য। দেশের অধিকাংশ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখনো এমন পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে, যা বর্তমান শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর বাজারের সঙ্গে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ নয়। শিক্ষার্থীরা চার-পাঁচ বছর ধরে তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করলেও বাস্তব দক্ষতার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে। অথচ নিয়োগদাতারা এখন খোঁজেন এমন কর্মী, যারা সমস্যা সমাধানে সক্ষম, প্রযুক্তিতে দক্ষ এবং পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারে। এই ব্যবধান শিক্ষিত বেকারত্ব বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষিত জনশক্তির তুলনায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে বের হচ্ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে নতুন চাকরি সৃষ্টি হচ্ছে না। সরকারি চাকরির সুযোগ সীমিত এবং সেখানে প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র। অন্যদিকে বেসরকারি খাতেও অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার চাহিদা থাকায় নতুন গ্র্যাজুয়েটদের জন্য প্রবেশ কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অনেকেই দীর্ঘদিন বেকার থাকেন বা যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কাজে নিয়োজিত হতে বাধ্য হন।
তৃতীয়ত, দক্ষতা উন্নয়নের ঘাটতি একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। আধুনিক কর্মক্ষেত্রে কেবল একাডেমিক সনদ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ, টিমওয়ার্ক, সৃজনশীলতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এসব দক্ষতা গড়ে তোলার ওপর পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ফলে শিক্ষার্থীরা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের আগেই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার অভাব, ডিজিটাল টুলস ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার অভাব তাদের সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে দেয়।
চতুর্থত, ক্যারিয়ার পরিকল্পনা ও দিকনির্দেশনার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। অনেক শিক্ষার্থীই তাদের আগ্রহ, দক্ষতা এবং বাজারের চাহিদা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা ছাড়াই উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করে। ফলস্বরূপ, পড়াশোনা শেষ করার পর তারা বুঝতে পারে যে তাদের নির্বাচিত বিষয় বা দক্ষতা চাকরির বাজারে তেমন চাহিদাসম্পন্ন নয়।
এই পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো তরুণের না বলা গল্প। একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের সঞ্চয়, বাবা-মায়ের অগণিত ত্যাগ আর এক শিক্ষার্থীর নির্ঘুম রাত—সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে একটি স্বপ্ন: ডিগ্রি শেষ, এবার একটি ভালো চাকরি। কিন্তু যখন সেই স্বপ্ন বাস্তবতার মুখে ভেঙে পড়ে, তখন শুধু একজন ব্যক্তি নয়, ভেঙে পড়ে একটি পরিবারের আশা।
প্রতিদিন অসংখ্য তরুণ চাকরির বিজ্ঞপ্তি খোঁজে, সিভি পাঠায়, পরীক্ষা দেয়, সাক্ষাৎকারে অংশ নেয়—তবুও শেষ পর্যন্ত “দুঃখিত, আপনি নির্বাচিত হননি” এই বাক্যটি যেন তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস কমে যায়, হতাশা গ্রাস করে, এবং অনেকেই নিজেদের যোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলতে শুরু করে। এই মানসিক চাপ কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি একটি সামাজিক সংকটের রূপ নিচ্ছে।
একজন তরুণ যখন তার পরিবারের দিকে তাকিয়ে নিজের ব্যর্থতা অনুভব করে, তখন তার ভেতরের লড়াইটা আর কেবল অর্থনৈতিক থাকে না—তা হয়ে ওঠে মানসিক, আবেগিক এবং অস্তিত্বের প্রশ্ন। “আমি কি ভুল পথে চলেছি?”—এই প্রশ্ন তাকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়।
তবে এই অন্ধকারের মধ্যেও আশার আলো রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাত, ফ্রিল্যান্সিং, আউটসোর্সিং এবং উদ্যোক্তা উদ্যোগ নতুন কর্মসংস্থানের দিগন্ত উন্মোচন করেছে। অনেক তরুণ এখন প্রচলিত চাকরির বাইরে গিয়ে নিজস্ব উদ্যোগে কাজ শুরু করছে, যা ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তৃতি তরুণদের জন্য বৈশ্বিক বাজারে কাজ করার সুযোগ তৈরি করেছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ। শিক্ষাব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করতে হবে এবং পাঠ্যক্রমে ব্যবহারিক জ্ঞান ও দক্ষতার ওপর জোর দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর সংযোগ স্থাপন করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ ও ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। একইসঙ্গে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন ও নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, উচ্চশিক্ষা কেবল একটি ডিগ্রি নয়; এটি একটি স্বপ্ন, একটি প্রত্যাশা এবং একটি জীবনের গল্প। সেই গল্প যেন হতাশার নয়, সম্ভাবনার হয়—তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, সমাজ এবং আমাদের সবার দায়িত্ব। প্রত্যাশা ও বাস্তবতার এই ব্যবধান দূর করতে না পারলে আমরা শুধু বেকারত্বই বাড়াবো না; হারাবো একটি প্রজন্মের আত্মবিশ্বাস ও আগামীর সম্ভাবনা।

লেখকঃ মো. বাইজিদ শেখ
তরুণ কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী,আইন বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইলঃshmdbayazid@gmail.com
মোবাইলঃ01835544692

লেখক: সদস্য, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!