বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

কালরাতের শেষে স্বাধীনতার আলো

Author

মো বাইজিদ শেখ , Gopalganj science and technology University

প্রকাশ: ২ এপ্রিল ২০২৬ পাঠ: ৩৬ বার

কালরাতের শেষে স্বাধীনতার আলো

মো. বাইজিদ শেখ

​সব কটা জানালা খুলে দাও না/ আমি গাইব গাইব বিজয়েরই গান… স্যাটেলাইট টিভির ঝলমলে যুগ তখনো আসেনি। বিটিভিতে আটটার সংবাদের ঠিক আগে যখন সাবিনা ইয়াসমিনের এই দরদী কণ্ঠ বেজে উঠত, আমাদের অনেকেরই শৈশব-কৈশোরে এক অদ্ভুত ঘোর তৈরি হতো। সুরের মূর্ছনায় চোখের সামনে ভেসে উঠত লাল-সবুজ পতাকার এক গর্বিত অবয়ব। আজ, ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর যখন গানটি শুনি, বুকের ভেতরটায় হু হু করে ওঠে। মনে হয়, এই গান তো কেবল সুর নয়; এ তো ত্রিশ লাখ শহীদের জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস! এ তো আত্মদানকারী বীরদের একবুক অভিমান, যারা অন্ধকার কবরে শুয়ে আজও আমাদের কাছে আলো চাইছে।

​ইতিহাসের পাতা উল্টে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের সেই ভয়াল কালরাতে ফিরে গেলে আজও শিউরে উঠতে হয়। বসন্তের বাতাস তখনো বইছে ঢাকায়। সারা দিনের ক্লান্ত মানুষগুলো সবে ঘুমাতে গেছে। ঠিক তখনই নরখাদকের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে রাতের অন্ধকারে নিরীহ, নিরস্ত্র বাঙালির ওপর চলল পৈশাচিক উল্লাস। ধ্বংসযজ্ঞ, গণহত্যা, আতঙ্ক আর অশ্রুর মিশ্রণে বাংলাদেশের বাতাস তখন ভারী হয়ে উঠেছিল। এই দিন থেকেই শুরু হয়েছিল একটি নতুন জাতির স্বপ্নযাত্রা—একটি ভূখণ্ডের নয়, একটি চেতনার জন্ম।

​এই চেতনার জন্ম কতটা যন্ত্রণার, তা বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই দিনগুলোর কোনো এক অজপাড়াগাঁয়ে। ১৯৭১ সালের তেমনই এক ঘোর অমানিশা। চারদিকে পাকিস্তানি বাহিনীর নারকীয় তাণ্ডব। গ্রামের টগবগে যুবক রাশেদ। উঠোনের এক কোণে স্ত্রী রেহানা দুই বছরের অবুঝ ফাতেমাকে বুকে চেপে নীরবে কাঁদছে। দেশকে মুক্ত করার অদম্য শপথ রাশেদের চোখে। যাওয়ার আগে রেহানার হাত ধরে সে শুধু ফিসফিস করে বলেছিল, “ফাতেমার স্বাধীন হাসিমুখটার কথা ভেবেই আমাকে যেতে হচ্ছে।” ঘুমন্ত মেয়ের কপালে শেষ চুমু এঁকে ঘুটঘুটে অন্ধকারের বুকে হারিয়ে গেল রাশেদ। রেহানার বুক ফেটে কান্না এলেও সে শব্দ করল না।

​মাসখানেক পরের কথা। খবর এল, সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়ে পাকিস্তানি ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দিয়েছে মুক্তিযোদ্ধারা। কিন্তু বুকে শত্রুর বুলেট নিয়ে বাংলার মাটিতেই চিরতরে ঘুমিয়ে পড়েছে রাশেদ। খবরটা শুনে রেহানার পৃথিবী থমকে গেল। অবুঝ ফাতেমা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আধো বোলে জিজ্ঞেস করল, “বাবা আসবে না?” রেহানা মেয়েকে বুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। রাশেদ আর কোনোদিন ফিরবে না সত্যি, কিন্তু তার ওই বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে ফাতেমারা একদিন এক স্বাধীন ভোরে স্বাধীন দেশের মাটিতে জেগে উঠবে—এই একবুক আশা রেহানার অশ্রুভেজা চোখদুটোকে অদ্ভুত এক গর্বের আলোয় ভরিয়ে তুলল।

​রাশেদের মতো লাখো তরুণের রক্ত আর রেহানাদের নীরব আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের বাংলাদেশ। আজ ৫৫ বছর পর দাঁড়িয়ে আমরা কি সত্যি অনুভব করতে পারি সেই রাতের তীব্রতা? কতখানি বুঝতে পারি, নিদারুণ ভয় আর স্বাধীনতার উদ্দাম স্বপ্ন কীভাবে সেদিন একই আকাশের নিচে, একই বুকে সহাবস্থান করেছিল? আমাদের বোধের সব কটি জানালা খুলে আমরা কি সত্যিই উপলব্ধি করতে পারি, কতখানি ত্যাগ, তিতিক্ষা আর রক্তের বিনিময়ে এই দেশ অর্জিত হয়েছে?

​স্বাধীনতা তো কেবল ২৬শে মার্চ বা ১৬ই ডিসেম্বরের কোনো উৎসব নয়, কিংবা কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়। এটি বুকের গভীরে লালন করার মতো একটি তীব্র অনুভূতি, একটি চলমান দায়বদ্ধতা, একটি প্রশ্ন—যার উত্তর প্রতিটি প্রজন্মকে নতুন করে নিজের কাঁধে তুলে নিতে হয়। একাত্তরের প্রজন্মের দায় ছিল বুকের রক্ত দিয়ে মানচিত্রটি ছিনিয়ে আনা। আর ২০২৬ সালের এই প্রজন্মের দায় হলো, সেই মানচিত্রের প্রতিটি ধূলিকণাকে ভালোবেসে একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তোলা। আজও যখন ক্ষমতার দম্ভে সাধারণ মানুষ পিষ্ট হয়, যখন অধিকার হরণের কান্না বাতাসে ভাসে, তখন কি সেই শহীদদের আত্মা ডুকরে কেঁদে ওঠে না?

​সব কটা জানালা খুলে দাও না…—এই আর্তি আজও ফুরায়নি। আসুন, আজ আমাদের মনের, বিবেকের আর চেতনার সব কটি বদ্ধ জানালা খুলে দিই। সেই খোলা জানালা দিয়ে ঢুকুক একাত্তরের সেই আত্মত্যাগের পুণ্য বাতাস। স্বার্থপরতার দেয়াল ভেঙে আমরা যেন বুকের গহিনে অনুভব করতে পারি সেই শহীদদের ঋণ। যেদিন এ দেশের প্রতিটি মানুষের মুখে হাসি ফুটবে, যেদিন কোনো অবিচার এই মাটিকে কলঙ্কিত করবে না, কেবল সেদিনই আমরা বুক ফুলিয়ে গাইতে পারব বিজয়ের সেই গান। তার আগে পর্যন্ত, এই স্বাধীনতা এক অবিরাম সাধনা, এক পবিত্র দায়বদ্ধতা। চাওয়া এটুকুই।

 

লেখকঃ মো. বাইজিদ শেখ

তরুণ কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী,আইন বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ইমেইলঃshmdbayazid@gmail.com

মোবাইল:01835544692

লেখক: সদস্য, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!