বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

হামের ছোবলে শূন্য মায়ের কোল

Author

মো বাইজিদ শেখ , Gopalganj science and technology University

প্রকাশ: ২ এপ্রিল ২০২৬ পাঠ: ৪৮ বার

হামের ছোবলে শূন্য মায়ের কোল​

মো. বাইজিদ শেখ

সভ্যতার এত উৎকর্ষ আর চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতির যুগে দাঁড়িয়েও যখন একটি শিশু ‘হাম’-এর মতো একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগে প্রাণ হারায়, তখন তা শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি থাকে না; তা হয়ে ওঠে আমাদের সামগ্রিক সচেতনতা ও সমাজব্যবস্থার গালে এক করুণ চপেটাঘাত। সামান্য জ্বর আর গায়ের লালচে র‍্যাশ থেকে শুরু হওয়া এই রোগটি যখন নিউমোনিয়া বা মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস)-এর মতো ভয়ংকর রূপ নিয়ে ছোট্ট একটি শিশুর শ্বাস কেড়ে নেয়, তখন এক অসহায় মায়ের আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। এই নির্মম মৃত্যু কেবল হৃদয়বিদারক নয়, এটি আমাদের জন্য চরম লজ্জারও।

বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (EPI) আমাদের অনেক সাফল্য রয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। কিন্তু তারপরও দেশের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, হাওর, চরাঞ্চল কিংবা শহরের ঘিঞ্জি বস্তিগুলোতে মাঝে মাঝেই হামের প্রাদুর্ভাব আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—আমাদের সুরক্ষা বলয়ে এখনও কিছু ফাটল রয়ে গেছে।

কেন ঘটছে এই নির্মম মৃত্যু? হাম নিয়ে আমাদের সমাজে বেশ কিছু ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, এটি শিশুদের একটি অতি সাধারণ রোগ এবং একবার হলে এমনিতেই সেরে যায়। এই আত্মতুষ্টিই ডেকে আনে সবচেয়ে বড় বিপদ। এছাড়া, টিকার দ্বিতীয় ডোজটি না দেওয়া, টিকা সংক্রান্ত ভিত্তিহীন গুজব, কুসংস্কার এবং অপুষ্টির কারণে অনেক শিশু এই ভাইরাসের সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে। মনে রাখতে হবে, হাম কোনো সাধারণ রোগ নয়; এটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে এবং অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জন্য আক্ষরিক অর্থেই একটি নীরব ঘাতক।

আমাদের করণীয় ও সমাধান:

১. টিকার পূর্ণাঙ্গ ডোজ নিশ্চিত করা: শিশুকে ৯ মাস বয়সে প্রথম এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ এমআর (MR – Measles and Rubella) টিকা দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। এক ডোজ টিকা সম্পূর্ণ সুরক্ষা দিতে পারে না। দেশের প্রতিটি শিশু যেন এই দুই ডোজ টিকা পায়, তা নিশ্চিত করা প্রতিটি অভিভাবকের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব।

২. গুজব ও কুসংস্কার প্রতিরোধ: টিকা নিয়ে সমাজে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণাগুলো শক্ত হাতে দমন করতে হবে। গণমাধ্যম, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং ধর্মীয় নেতাদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বোঝাতে হবে যে, টিকাই হাম প্রতিরোধের একমাত্র বৈজ্ঞানিক ও নিরাপদ উপায়।

৩. পুষ্টি ও ভিটামিন ‘এ’ নিশ্চিতকরণ: অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের হামে মৃত্যুর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। হাম আক্রান্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শে শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়াতে হবে, যা জটিলতা এবং মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।

৪. তৃণমূলের স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সক্রিয় করা: কমিউনিটি ক্লিনিক ও মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে দুর্গম ও পিছিয়ে পড়া জনপদগুলোতে টিকাদান কর্মসূচি আরও নিবিড়ভাবে পরিচালনা করতে হবে। কেউ যেন নজরদারির বাইরে না থাকে।

শেষ কথা, যে রোগের শতভাগ কার্যকর টিকা আমাদের হাতের নাগালে বিনামূল্যে পাওয়া যায়, সেই রোগে ভুগে একটি শিশুরও পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়া মেনে নেওয়া যায় না। আমাদের সামান্য অবহেলা, একটুখানি অসচেতনতা যেন আর কোনো মায়ের কোল খালি না করে। আসুন, আজই আমরা প্রতিজ্ঞা করি—আমাদের প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় এনে একটি হামমুক্ত, সুস্থ ও সুরক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তুলব। শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।

লেখকঃ মো. বাইজিদ শেখ

তরুণ কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী,আইন বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ইমেইলঃshmdbayazid@gmail.com

মোবাইল:01835544692

লেখক: সদস্য, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে দৈনিক সময়ের আলো পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!