খেলার নিয়ম ও অলীক নালিশ
সেদিন এক পড়ন্ত বিকেলে নিজের মতো গুছিয়ে বসছিলাম, ঠিক তখনই ছন্দপতন। আমার ছোট ভাই এসে অপর ছোট ভাইয়ের বিরুদ্ধে একরাশ ক্ষোভ উগড়ে দিল। তার সোজা নালিশ— অপরজন নাকি খেলার নিয়ম ভাঙছে। আমি কিছুটা উদাসীনভাবেই প্রশ্ন করলাম, “তাতে আমার কী?” খেলাটা তাদের, নিয়মগুলোও তাদেরই বানানো। সেই কৃত্রিম নিয়মের ভাঙা-গড়ায় আমার কেন মাথা ঘামাতে হবে?
এই অতি সাধারণ পারিবারিক ঘটনাটি আমাকে এক গভীর জীবনদর্শনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল। আমরা মানুষরা ঠিক এভাবেই প্রতিনিয়ত বিধাতার দরবারে এমন সব তুচ্ছ ও অর্থহীন বিষয় নিয়ে নালিশের ঝুলি মেলে ধরি, যার আদতে কোনো শাশ্বত ভিত্তি নেই। মহাবিশ্বের প্রেক্ষাপটে কোনটি ‘ন্যায়’ আর কোনটি ‘অন্যায়’, তা নির্ধারণ করার মাপকাঠিটাই বা কী? আর সেই মানদণ্ডই বা তৈরি করছে কে?
আমাদের সমাজব্যবস্থার দিকে তাকালে এক নির্মম পরিহাস চোখে পড়ে। আমরা এমন এক অসম প্রতিযোগিতার ফাঁদ (System) তৈরি করেছি, যেখানে সাফল্যের মঞ্চে জায়গা পায় কেবল একজন, আর বাকি দশ হাজার মানুষ ছিটকে পড়ে অন্ধকারের অতল গহ্বরে। নির্মম সত্য হলো, এই ব্যর্থ হওয়া বিশাল জনগোষ্ঠী আবারও সেই বিধাতার কাছেই ছুটে যায় করুণ আরজি নিয়ে— “হে ঈশ্বর, আমার সাথেই কেন এমন হলো? এটা কেমন বিচার?”
আসলে আমরা নিজেদের এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ভাবি যে, মহাবিশ্বের মহান স্রষ্টা কেন আমাদের এই নশ্বর, বস্তুগত আর ক্ষণস্থায়ী চাওয়া-পাওয়া পূরণ করলেন না, তা নিয়ে আমরা ক্ষোভ প্রকাশ করি। অথচ আধ্যাত্মিক বা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, এই জাগতিক সাফল্যের মোহ নিয়ে আমাদের প্রথম থেকেই মাথা ঘামানোর কথা ছিল না।
জনপ্রিয় মার্কিন ধারাবাহিক ‘দ্য বিগ ব্যাং থিওরি’-র একটি দৃশ্য এখানে প্রাসঙ্গিক মনে পড়ছে। শেলডন যখন ড্রাগনে বিশ্বাস করত, তখন তার মা তাকে বোকা বলেছিলেন। জবাবে শেলডন চমৎকার একটি পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিল, “তুমি বিশ্বাস করো অন্তরীক্ষে এমন এক অলৌকিক সত্তা আছেন যিনি তোমার সব মনস্কামনা পূরণ করেন। সেই বিশ্বাসের চেয়ে আমার ড্রাগনের গল্পটা কীভাবে বেশি বোকা বোকা শোনায়?”
আমরা প্রতিনিয়ত নিজেদের তৈরি নিয়মের জালে ফেঁসে গিয়ে পরম সত্তার ওপর দায় চাপাতে ভালোবাসি। কিন্তু দিনশেষে, আমরা কি একবারও ভেবে দেখেছি— এই জাগতিক খেলায় নিয়ম ভাঙার দায় কি সত্যিই তাঁর, নাকি আমাদের নিজেদেরই অপরিপক্বতার?
