স্বপ্নহীন এক প্রজন্ম: জ্ঞানবিমুখতা ও মূল্যবোধের নীরব পতন
স্ক্রিনের ঝলমলে আলো কি নিভিয়ে দিচ্ছে স্বপ্ন, চিন্তাশক্তি ও মূল্যবোধের দীপশিখা?
যুব সমাজকে বলা হয় একটি জাতির প্রাণশক্তি। আজকের তরুণরাই আগামী দিনের শিক্ষক, গবেষক, প্রশাসক, উদ্যোক্তা, নীতিনির্ধারক ও নেতৃত্বের ধারক। তাই একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার যুব সমাজের চিন্তা, চেতনা, মূল্যবোধ ও স্বপ্নের ওপর। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা উদ্বেগের সঙ্গে আমাদের একটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে – আমরা কি ধীরে ধীরে স্বপ্নহীন, জ্ঞানবিমুখ এবং মূল্যবোধের সংকটে আক্রান্ত একটি প্রজন্ম গড়ে তুলছি?
প্রযুক্তির এই যুগে তথ্যপ্রাপ্তি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় সহজ হয়েছে। জ্ঞানের বিশাল ভাণ্ডার এখন হাতের মুঠোয়। কিন্তু পরিহাসের বিষয় এই যে, তথ্যের প্রাচুর্য বাড়লেও জ্ঞানচর্চার আগ্রহ যেন ক্রমশ কমে যাচ্ছে। বই যা মানুষের সবচেয়ে কাছের বন্ধু, চিন্তার সবচেয়ে বড় সহচর যা নতুন কিছু জানার আগ্রহ সঞ্চারের মাধ্যমে একজন তরুণের ব্যক্তিত্ব গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ আজ সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে অন্তহীন স্ক্রলিংয়ের সংস্কৃতি।
আজকের তরুণদের একটি বড় অংশ এমন এক প্রতিযোগিতার মধ্যে বাস করছে, যেখানে সাফল্যের সংজ্ঞা প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রঙিন জগৎ তাদের সামনে এমন এক জীবনচিত্র তুলে ধরছে, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অন্যের সাফল্য, বিলাসবহুল জীবনযাপন কিংবা জনপ্রিয়তা দেখে অনেকেই নিজের জীবনকে ব্যর্থ মনে করতে শুরু করে।কিন্তু তারা এটা উপলব্ধি করতে ব্যার্থ যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কেবল সফলতার গল্প দেখায় সংগ্রামের নয়। ফলে নিজের স্বপ্ন, সামর্থ্য ও সম্ভাবনার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছে অসংখ্য তরুণ।
এই সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো জ্ঞানচর্চা থেকে দূরে সরে যাওয়া। একসময় বই,পাঠ্যপুস্তক,সংবাদপত্র ছিল মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু, চিন্তার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। কিন্তু আজ এসবের জায়গা দখল করে নিয়েছে স্মার্টফোনের পর্দা। প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে আশীর্বাদ, কিন্তু তার অপব্যবহার হয়ে উঠছে অভিশাপ। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয় করা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা উদ্দেশ্যহীন স্ক্রলিং, ক্ষণস্থায়ী বিনোদনের পেছনে ছুটে চলা এসব ধীরে ধীরে মনোযোগ, ধৈর্য এবং গভীর চিন্তাশক্তিকে ক্ষয় করে দিচ্ছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক তরুণ এখন জ্ঞান ও শিক্ষার দীর্ঘ পথের পরিবর্তে দ্রুত সফল হওয়ার শর্টকাট খুঁজছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হঠাৎ ভাইরাল হওয়া কোনো ব্যক্তির সাফল্যের গল্প দেখে তারা মনে করে, পড়াশোনা বা দক্ষতা অর্জনের আর প্রয়োজন কী! কেউ একজন অল্প সময়ে খ্যাতি ও অর্থ অর্জন করেছে এই দৃশ্য দেখে অনেকেই বছরের পর বছর শিক্ষা অর্জনের মূল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। অথচ তারা ভুলে যায়, ব্যতিক্রম কখনোই নিয়ম নয়। সমাজ ও রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন গড়ে ওঠে জ্ঞান, দক্ষতা, গবেষণা ও পরিশ্রমের ওপর; ক্ষণস্থায়ী জনপ্রিয়তার ওপর নয়।
এই প্রশ্নগুলো শুধু হতাশার বহিঃপ্রকাশ নয়; এগুলো মূল্যবোধের সংকটেরও ইঙ্গিত দেয়। কারণ শিক্ষা কেবল চাকরি পাওয়ার মাধ্যম নয়; শিক্ষা মানুষকে চিন্তা করতে শেখায়, যুক্তিবাদী হতে শেখায়, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য বুঝতে শেখায় এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। যখন একজন মানুষ শিক্ষার এই মৌলিক উদ্দেশ্যকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র অর্থ বা জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে সাফল্যকে বিচার করতে শুরু করে, তখনই মূল্যবোধের অবক্ষয়ের সূচনা ঘটে।
এই মানসিকতা কেবল শিক্ষার প্রতি অনীহাই সৃষ্টি করছে না, বরং নৈতিক মূল্যবোধেরও অবক্ষয় ঘটাচ্ছে। পরিশ্রমের পরিবর্তে সহজ পথের প্রতি আকর্ষণ, দায়িত্ববোধের অভাব, আত্মকেন্দ্রিকতা এবং সহনশীলতার সংকট ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। পরিবারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং সামাজিক জীবনে মূল্যবোধের চর্চা কমে যাওয়ায় এই সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করছে।
মূল্যবোধের পতন সবসময় দৃশ্যমান হয় না; এটি ঘটে নীরবে। যখন পরিশ্রমের চেয়ে শর্টকাট পথকে বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়, যখন চরিত্র গঠনের চেয়ে বাহ্যিক সাফল্যকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়, যখন জ্ঞানার্জনের চেয়ে বিনোদনকে জীবনের প্রধান অনুষঙ্গ বানিয়ে ফেলা হয় তখনই মূল্যবোধের ভিত দুর্বল হতে শুরু করে। যে প্রজন্ম বইয়ের পাতা উল্টানোর চেয়ে পর্দা স্ক্রল করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, সেই প্রজন্মের চিন্তার গভীরতা ও মূল্যবোধের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা স্বাভাবিক। বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, সামাজিক দায়িত্ববোধ, সহনশীলতা, সত্যনিষ্ঠা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মতো গুণাবলিও ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
এর ফলাফলও ভয়াবহ। যখন একজন তরুণ নিজের জীবনকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করতে করতে হতাশ হয়ে পড়ে, তখন সে ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস হারায়। অনেকেই বিষণ্নতা, হতাশা এবং আত্মপরিচয়ের সংকটে ভুগতে শুরু করে। তারা বুঝতে পারে না যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা প্রতিটি সাফল্যের পেছনে অদেখা সংগ্রামের গল্পও থাকে। ফলে তারা নিজেদের সম্ভাবনাকে বিকশিত করার পরিবর্তে নিরাশার অন্ধকারে ডুবে যেতে থাকে।
তবে এই পরিস্থিতির দায় শুধু তরুণদের নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং রাষ্ট্র সবারই দায়িত্ব রয়েছে। পরিবারকে সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নৈতিকতা ও মানবিক শিক্ষার ওপর আরও গুরুত্ব দিতে হবে এবং রাষ্ট্রকে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে তরুণরা তাদের মেধা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন পাবে। পাশাপাশি তরুণদেরও উপলব্ধি করতে হবে যে প্রকৃত সাফল্য রাতারাতি অর্জিত হয় না; এর জন্য প্রয়োজন অধ্যবসায়, জ্ঞান এবং চরিত্রের দৃঢ়তা।
পরিশেষে বলা যায়, যুব সমাজ শুধু একটি বয়সভিত্তিক জনগোষ্ঠী নয়; তারা একটি জাতির ভবিষ্যৎ। সেই ভবিষ্যৎ যদি স্বপ্ন হারায়, জ্ঞানচর্চা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং মূল্যবোধের সংকটে পড়ে, তবে তার প্রভাব পুরো সমাজের ওপরই পড়বে। তাই এখনই প্রয়োজন বইয়ের কাছে ফিরে যাওয়া, জ্ঞানচর্চাকে জীবনের অংশ করে তোলা এবং নৈতিক মূল্যবোধকে পুনরুজ্জীবিত করা। কারণ যে প্রজন্ম বই থেকে দূরে সরে যায়, জ্ঞানচর্চাকে অবহেলা করে এবং মূল্যবোধ হারাতে শুরু করে, সে প্রজন্ম কখনোই একটি সমৃদ্ধ, মানবিক ও আলোকিত জাতি গড়ে তুলতে পারে না।
স্নেহা ফেরদৌস মীম
শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,গোবিপ্রবি
