শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

ক্যাম্পাসে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক

Author

রাকিবুল হাসান মুন্না , বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ৪৩ বার

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো জ্ঞানচর্চা ও মুক্তচিন্তার পাদপীঠ হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে তা নারী শিক্ষার্থীদের জন্য এক আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। ২০০৯ সালে মহামান্য হাইকোর্ট প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানিবিরোধী অভিযোগ সেল বা কমিটি গঠনের ঐতিহাসিক নির্দেশনা দিলেও দেড় দশক পর বাস্তব চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। কাগজে-কলমে প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিযোগ সেল থাকলেও ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা সেখানে কার্যকর প্রতিকার পাচ্ছেন না; বরং অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিকভাবে আরও হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে।

গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যৌন হয়রানির বিস্তার ভয়াবহ। ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত তথ্যে দেশের আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৬ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী কোনো না কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। এ ছাড়া গত ১০ বছরে দেশে ২ হাজার ১১৩টি যৌন হয়রানি এবং ৯ হাজার ২৯৫টি ধর্ষণের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত গবেষণায় উঠে এসেছে যে, প্রায় ১০০ শতাংশ নারী শিক্ষার্থীই ক্যাম্পাসে অন্তত একবার অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ বা আপত্তিকর আচরণের মুখোমুখি হয়েছেন।

তবে এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো ভুক্তভোগীদের নীরবতা। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রায় ৮৫.৭ শতাংশ ভুক্তভোগীই কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেন না। এই বিশাল নীরবতার পেছনে কাজ করে বিচার না পাওয়ার প্রবল আশঙ্কা, দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া, সামাজিক লোকলজ্জা এবং রাজনৈতিক প্রভাব। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা মনে করেন, অভিযোগ করলে তাঁদের একাডেমিক ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেওয়া হবে বা সমাজ তাঁদেরই ‘ভিকটিম ব্লেমিং’ বা দোষারোপ করবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো সমাজের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক নাদির জুনাইদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষক সাজু সাহা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের একজন শিক্ষক এবং পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এমনকি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) একজন নারী শিক্ষার্থী তাঁর বিভাগের শিক্ষকের বিরুদ্ধে ৩১ পৃষ্ঠার দীর্ঘ অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন।

ইউএন উইমেন পরিচালিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ক্যাম্পাসে যৌন হয়রানির ৪১.৪ শতাংশের কারণ হলো রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহার। অনেক সময় অভিযুক্ত শিক্ষকরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় নিজেদের রক্ষা করেন এবং অভিযোগকারীকে উল্টো মানহানির মামলার ভয় দেখান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় নারী লাঞ্ছনার ঘটনায় তিন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হলেও শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হার অত্যন্ত নগণ্য। একমাত্র পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সুব্রত কুমার বিশ্বাসকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করার ঘটনাটি একটি বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

যৌন হয়রানি যেমন অপরাধ, তেমনি এটি একজন শিক্ষার্থীর পুরো ভবিষ্যৎ ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গবেষণালব্ধ তথ্যমতে, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ পড়াশোনায় মনোযোগ হারিয়ে ফেলেন, ক্লাস বর্জন করেন এবং অনেকের একাডেমিক ফলাফল বা জিপিএ আশঙ্কাজনকভাবে খারাপ হয়ে যায়। মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব আরও সুদূরপ্রসারী। যৌন হয়রানির শিকার ছাত্রীরা প্রচণ্ড মানসিক চাপ, দীর্ঘমেয়াদি বিষণ্নতা, নিদ্রাহীনতা এবং অসহায়ত্ব অনুভব করেন। এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রযুক্তিনির্ভর যৌন হয়রানির শিকার তরুণীদের মধ্যে ৩৪.৯ শতাংশ আত্মহত্যার চিন্তায় ভোগেন। এটি জাতীয় উদ্বেগের বিষয়। ভুক্তভোগীরা সামাজিকভাবে নিজেদের গুটিয়ে নেন এবং একাকিত্বের মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করেন।

হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচ সদস্যের অভিযোগ কমিটি থাকার কথা থাকলেও ইউজিসির পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে এসব কমিটি অকার্যকর। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা অভিযোগ সেলের অবস্থানই জানেন না, অথবা সেই কমিটির প্রতি তাঁদের আস্থা নেই। এই সংকট নিরসনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) সম্প্রতি কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, অভিযোগ পাওয়ার পর যদি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এটা আমার কাজ নয় বলে এড়িয়ে যায়, তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ইউজিসি ব্যবস্থা নেবে।

স্বচ্ছতা ও দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করতে ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ন্যায়পাল নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। ইউএন উইমেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে ইউজিসি পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সচেতনতা তৈরিতে একটি বিশেষ প্রকল্পও পরিচালনা করছে। তবে শুধু অভিযোগ সেল থাকলেই হবে না; এর কার্যকারিতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কঠোর জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ইউজিসির পরামর্শ অনুযায়ী প্রথিতযশা নাগরিকদের মধ্য থেকে ন্যায়পাল নিয়োগ করে একটি স্বতন্ত্র ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থার মাধ্যমে অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

পুরো বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে মুক্ত রাখতে হবে। তদন্ত চলাকালে অভিযোগকারী ও অভিযুক্তের পরিচয় গোপন রেখে ভুক্তভোগীকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। তবে শুধু আইন বা প্রশাসনিক কড়াকড়ি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়; প্রয়োজন পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তন ও নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করা। এ জন্য নিয়মিত সচেতনতামূলক সেমিনার, জেন্ডার এডুকেশন ও জেন্ডার-ট্রান্সফরমেটিভ প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে। পাশাপাশি ক্যাম্পাসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সিসিটিভি, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস ও হটলাইন চালুর মাধ্যমে নিরাপত্তা ও তাৎক্ষণিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়কে ভয়ের সংস্কৃতিমুক্ত করে মেধা বিকাশের নিরাপদ ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে এসব পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া উচিত নির্ভয়ে জ্ঞান অর্জনের এক পবিত্র ভূমি। সেই পবিত্র ভূমিই যখন কালিমালিপ্ত হয়, তখন জাতির মেধা বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। দেড় দশকের কাগুজে প্রতিশ্রুতি পেছনে ফেলে এখনই সময় কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করার। কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা ও সম্মিলিত প্রতিরোধই পারে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক বাসভূমিতে পরিণত করতে।

রাকিবুল হাসান মুন্না
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।

লেখক: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে রূপালী বাংলাদেশ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।