গ্রামীণ পরিবেশে একসঙ্গে ইফতার

কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার মারুকা ইউনিয়নের বুক চিরে বয়ে যাওয়া মেঠোপথ ধরে হাঁটলে দেখা যায় দিগন্তজোড়া সবুজ ফসলের ক্ষেত। সেই সবুজের ঢেউয়ের মাঝখানে শান্ত, নিবিড় এক দ্বীপের মতো জেগে আছে আমাদের অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহাসিক ‘ভরণপাড়া গণকবরস্থান’। চারিদিকের নিস্তব্ধতা আর বটের পাতার ঝিরঝিরে শব্দের মাঝে আজ এক অন্যরকম প্রাণের স্পন্দন। আমরা প্রায় অর্ধশত বন্ধু, বড় ভাই আর অনুজ আজ এখানে সমবেত হয়েছি। উদ্দেশ্য কেবল পেটপুরে একবেলা ইফতার নয়; বরং শেকড়ের টানে এক হওয়া এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে পা বাড়ানোর আগে জীবনের চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক টুকরো স্মৃতি জমা করা।
ইট-পাথরের যান্ত্রিক নগরীতে রেস্টুরেন্টের আলোকসজ্জা কিংবা ধোঁয়াটে ক্যাফের এসি রুমে বসে ইফতার করার সুযোগ আমাদের অনেকেরই আছে। কিন্তু সেই কৃত্রিম আভিজাত্যে হৃদয়ের ক্ষুধা মেটে না। তাই আমরা এবারের রমজানে সব মায়া কাটিয়ে ফিরে এসেছি মাটির সোঁদা গন্ধে ভরা আমাদের এই প্রিয় গ্রামে।
আমাদের এই আয়োজনের পরতে পরতে মিশে আছে বিশুদ্ধ শ্রম আর মমতা। কোনো আধুনিক ক্যাটারিং সার্ভিস নয়, বরং সাতসকালে বাজারের গুরুদায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন আমাদের প্রিয় বড় ভাই এনামুল হক বাবু এবং রিয়াদ ইসলাম বাবু। তাঁদের সাথে ছায়ার মতো সঙ্গী হয়েছিলাম আমি, নাঈম আর মেহেদীসহ আরও অনেক নিবেদিতপ্রাণ।
রমজানের এই তপ্ত দুপুরে বাজারের ভিড়ে দর-কষাকষি করাটাও ছিল এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। প্রতিটি আইটেম কেনার সময় বিক্রেতার সঙ্গে আমাদের সেই দীর্ঘ লড়াই—“ভাই, বিরিয়ানির চালটা একটু ভালো দেখে দেন” কিংবা “আঙুরগুলো কি মিষ্টি হবে?”—এসব প্রশ্নের ভিড়ে চলছিল কড়া দরদাম। রমজানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে সাশ্রয়ী দামে সেরা জিনিসটি খুঁজে বের করার চ্যালেঞ্জটাও আমরা উপভোগ করেছি। এনামুল ভাইয়ের সেই জহুরির চোখ আর রিয়াদ ভাইয়ের কৌশলী দর-কষাকষিতে শেষ পর্যন্ত আমরা জয়ী হয়েছি। টাটকা ফলমূল থেকে শুরু করে গরুর মাংস—সবই আমরা বাছাই করেছি পরম মমতায়। আমাদের এই বাজারে গিয়ে দোকানদারের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করে কেনাকাটা করার মধ্যে যে অকৃত্রিম আনন্দ ছিল, তা যেন কোনো বড় সুপারশপে নির্ধারিত দামে হাজার টাকা খরচ করেও পাওয়া যায় না।
আমাদের এই আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল আমাদের চেনা ঘরদোর। বাড়িতে যখন রান্নার তোড়জোড় শুরু হলো, তখন অন্দরমহল থেকেও মিলেছে অকৃত্রিম সহযোগিতা। রান্নার মূল কাজটি বাইরে হলেও নেপথ্যে মশলা কাটাকাটি আর বাটা-বাটিতে পরম মমতায় হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন আমাদের শ্রদ্ধেয় ফুফু ও ভাবিরা। তাঁদের সেই অক্লান্ত পরিশ্রম আর হাতের ছোঁয়া আমাদের এই আয়োজনে একটি পারিবারিক স্নিগ্ধতা যোগ করেছে।
আর রান্নার মূল জাদুকর ছিলেন অত্র এলাকার সুনামধন্য বাবুর্চি নূরউজ্জামাল মিয়া, যাঁর রান্নার সুখ্যাতি দাউদকান্দি ছাড়িয়ে শহর ছুঁয়েছে। আজ খোলা উঠানে মাটির চুলায় তাঁর হাতের জাদুতে যখন বিরিয়ানি রান্না হচ্ছিল, তখন সেই ঘ্রাণ যেন বাতাসের সঙ্গে মিশে গোটা গ্রামে আমাদের আগমনের জানান দিচ্ছিল। নূরউজ্জামাল মিয়ার রান্নার বিশেষত্ব হলো, তাঁর হাতের বিরিয়ানির স্বাদ মুখে লেগে থাকে বহুদিন। রান্না শেষ হওয়ার পর আমরা পরম যত্নে সেই বিরিয়ানি আর আনুষঙ্গিক খাবারগুলো বাসা থেকে নিয়ে পাড়ি জমাই আমাদের ইফতারের মূল গন্তব্যে—ভরণপাড়া গণকবরস্থানের সেই ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণে।
সবুজ ক্ষেতের মাঝে অবস্থিত গণকবরস্থানের পাশের খোলা প্রান্তরে যখন আমাদের ইফতারের দস্তরখান পরিপাটি করে সাজানো হলো—সেখানে ছিল খেজুর, আপেল, আঙুর, কলা, সালাদ আর প্রাণজুড়ানো ঠান্ডা শরবত। কিন্তু বিরিয়ানির ধোঁয়া ওঠা প্লেটগুলোর সামনে বসে আমাদের মনে এক চাপা দীর্ঘশ্বাস কাজ করছিল। আমরা যারা আজ এখানে প্রায় অর্ধশত বন্ধু আর ভাই কাতার ধরে বসেছি, আমাদের গন্তব্য একেক দিকে।
দিন কয়েক পরেই আমাদের মধ্য থেকে কেউ পাড়ি জমাবে সুদূর প্রবাসে উচ্চশিক্ষার নেশায়, কেউ শুরু করবে দেশের নামী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হলজীবন। আবার আমাদেরই কেউ কেউ পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে জীবিকার কঠোর লড়াইয়ে ফিরে যাবে সেই ইট-পাথরের কর্কট নগরীতে। আগামী বছর রমজানে আমাদের এই ‘অর্ধশত’ হাত আবার একসঙ্গে দস্তরখানে মিলিত হতে পারবে কি না, তা কেবল বিধাতাই জানেন। হয়তো পরের বার এই দস্তরখানের অনেকগুলো আসন শূন্য থাকবে। কেউবা চিরনিদ্রায় শায়িত থাকবে পাশের কবরস্থানে। বিচ্ছেদের এই গোপন শঙ্কা আমাদের প্রতিটি হাসির আড়ালে এক ফোঁটা করে নোনা জল জমা করছিল।
সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য ছিল আমাদের বসার জায়গাটি। একপাশে আমাদের তারুণ্যের কোলাহল, বন্ধুদের সঙ্গে খুনসুটি আর জীবনের জয়গান; আর ঠিক হাত বিশেক দূরেই চিরনিদ্রায় শায়িত আমাদের পূর্বপুরুষেরা। এই ঐতিহাসিক গণকবরস্থানটি যেন আজ আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষক। আমাদের সামনে বিরিয়ানির সুবাস আর পেছনের নিথর মাটির স্তূপগুলো আমাদের কানে কানে শুনিয়ে যাচ্ছিল পবিত্র কুরআনের সেই ঘোষণা: “কুল্লু নাফসিন যায়িকাতুল মাওত”—অর্থাৎ “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে” (সূরা আলে ইমরান: আয়াত ১৮৫)।
আমাদের স্বপ্ন, আমাদের উচ্চশিক্ষা, আমাদের ক্যারিয়ার কিংবা দেশ-বিদেশে পাড়ি দেওয়া—সবকিছুর চূড়ান্ত গন্তব্য তো এই সাড়ে তিন হাত মাটির অন্ধকার ঘর। ইফতারের ঠিক আগমুহূর্তে যখন আকাশের রঙ ফিকে হয়ে এল, তখন আমাদের সব কোলাহল থেমে গেল। চারদিকে এক পিনপতন নীরবতা। আমরা সবাই মিলে হাত তুললাম আকাশের পানে। মোনাজাতে আমরা শুধু নিজেদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য চাইনি; আমরা সম্মিলিতভাবে প্রার্থনা করেছি ভরণপাড়া গণকবরস্থানে শুয়ে থাকা হাজারো মানুষের আত্মার মাগফেরাত কামনায়। যারা একসময় আমাদের মতোই এমন তারুণ্যে উদ্দীপ্ত ছিলেন, আজ তারা নিথর মাটির নিচে। জীবনের এই চরম বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের মোনাজাত যেন আরও বেশি আর্তনাদপূর্ণ হয়ে উঠল।
মাগরিবের আজান দেওয়ার পর যখন আমরা প্রথম লোকমাটি মুখে তুললাম, তখন চারপাশ নিঝুম হয়ে এল। নূরউজ্জামাল মিয়ার হাতের সেই অপূর্ব বিরিয়ানি যেন কেবল আমাদের পেটের ক্ষুধা মেটাল না, বরং আমাদের হৃদয়ে এক চিরস্থায়ী মায়ার ছাপ এঁকে দিল। গ্রামে ফিরে আসা, বন্ধুদের সঙ্গে বাজার করা, ফুফু-ভাবিদের সেই আন্তরিক সহযোগিতা—সবকিছু মিলে এই ইফতারটি আমাদের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আয়োজনে পরিণত হলো।
ক্ষেতের খোলা হাওয়ায় বসে কবরস্থানের পাশে কাটানো গোধূলিবেলার এই স্মৃতি আমাদের পাথেয় হয়ে থাকবে জীবনভর। আমরা জানি না ভবিষ্যতে কে কোথায় থাকব, কোন প্রবাসে বা কোন শহরে আমাদের গন্তব্য হবে। কিন্তু এই মায়ার দস্তরখান আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেবে—আমরা একই শেকড়ের সন্তান, একই মাটির মুসাফির। আমাদের এই আয়োজন কেবল খাবারের উৎসব ছিল না; এটি ছিল জীবনের প্রতি মমতা আর মৃত্যুর প্রতি শ্রদ্ধার এক অনন্য সেতুবন্ধন।
মো. জাহিদুল ইসলাম জাহিদ
শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
মোবাইল : ০১৭০৬৫০০৩২৯
ইমেইল : jahid.iu.cmj.5@gmail.com

