বিচারহীনতাই অপরাধ বৃদ্ধির মূল কারণ, লাশের মিছিলে বিপন্ন মানবতা
সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া অনেক অপরাধের নৃশংসতা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। প্রশ্ন জাগে -সমাজ কি তবে ধীরে ধীরে পচে যাচ্ছে? নাকি বিচারহীনতার এক অভয়ারণ্য তৈরি হয়েছে, যেখানে অপরাধীরা জানে তারা শেষ পর্যন্ত পার পেয়ে যাবে? অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, যখন একজন অপরাধী দেখে ভয়াবহ অপরাধ করেও ক্ষমতার প্রভাব বা আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে পার পাওয়া সম্ভব, তখনই সমাজে দানবীয় অপরাধের বিস্তার ঘটে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো যেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, মানুষের জীবনের মূল্য কতটা সস্তা হয়ে গেছে।
গত ৪ মার্চ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনাকে একই বিভাগের এক কর্মচারী প্রকাশ্য দিবালোকে জবাই করে হত্যা করে। একজন শিক্ষক যখন নিজের কর্মস্থলেও নিরাপদ নন, তখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? এর আগেও ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাজিদ আব্দুল্লাহকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে হলের পুকুরে ফেলে রাখা হয়েছিল। বিদ্যাপীঠ যখন হত্যাকাণ্ডের মঞ্চে পরিণত হয়, তখন বুঝতে হবে বিচারহীনতার বিষবৃক্ষ কত গভীরে শেকড় গেড়েছে।
শিশুদের প্রতি এমন পাশবিকতা কোনো সুস্থ সমাজ কল্পনাও করতে পারে না। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ইকো পার্কে বেড়াতে গিয়ে সাত বছরের শিশু জান্নাতুল নাইমা ইরাকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। রাজধানীর মগবাজারে ছয় বছরের শিশু তাহিয়াকে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে। ঝিনাইদহে চার বছরের শিশু তাবাসসুমকে হত্যার পর তার মরদেহ সেপটিক ট্যাংকে ফেলে রাখা হয়।এর আগে গত ৬ মার্চ ২০২৫ এ মাগুরার শ্রীপুরে আট বছরের শিশু আছিয়া ধর্ষণের শিকার হয়ে দীর্ঘ এক সপ্তাহ মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারায়। এসব ঘটনা প্রমাণ করে অপরাধীদের মনে আইনের বিন্দুমাত্র ভয় নেই।পাবনার ঈশ্বরদীতে দাদীকে হত্যা করে এবং নাতনীকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার পর সরিষা ক্ষেতে লাশ ফেলে রাখা হয়।হাজারীবাগে স্কুলছাত্রীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ধরনের নৃশংসতার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো অপরাধের প্রমাণ লোপাটের প্রবণতা। কোথাও লাশ টুকরো করে ফেলে দেওয়া হচ্ছে, কোথাও পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। নরসিংদীর শিবপুরের ওবায়দুল্লাহকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর তার দেহ টুকরো টুকরো করে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় ফেলে দেওয়া হয়। গাজীপুরে মাদক সেবন দেখে ফেলায় ১৩ বছরের মাদ্রাসাছাত্র মাহাবুব ইসলাম রনিকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে দেওয়া হয় প্রমাণ লোপাটের জন্য। যেন অপরাধীরা নিশ্চিত -লাশ গুম করতে পারলেই আইনের হাত থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব।নরসিংদীতে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার আমেনার বাবা যখন বিচার পাননি, তখন সেই ক্ষোভ আর অপমানে সৎবাবা নিজেই আমেনাকে হত্যা করেন। এটি কেবল একটি হত্যা নয়, এটি আমাদের বিচার ব্যবস্থার গালে একটি কষানো চড়। যখন একজন বাবা বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে নিজের সন্তানকে হত্যা করতে বাধ্য হন, তখন বুঝতে হবে সেই সমাজ মৃতপ্রায়।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসেই অন্তত ৩২ জন নারী ও কন্যাশিশু হত্যার শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৯ জনই ছিল ১৮ বছরের নিচের শিশু।গত ৪ ফেব্রুয়ারী মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএসএস(Human Rights Support Society)এর নির্বাহী পরিচালক জনাব ইজাজুল ইসলাম এর স্বাক্ষরিত একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ১৭ মাসে ২৬১৭ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১০১৬ জন ধর্ষণের শিকার, যাদের ৫৪ শতাংশই শিশু। গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৩০ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৩ জনকে এবং লোকলজ্জার ভয়ে আত্মহত্যা করেছেন আরও ১১ জন। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়, বরং এগুলো একেকটি পরিবারের কান্না এবং রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার ব্যর্থতার দালিলিক প্রমাণ।
এই যে একটার পর একটা খুনের মহোৎসব চলছে, এর পেছনে মূল কারণগুলো অত্যন্ত গভীর:
প্রথমত, বিচারহীনতার সংস্কৃতি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, অপরাধীরা স্থানীয় প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক মহলের সাথে যুক্ত থাকে। ফলে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করতে ভয় পায় অথবা গ্রেপ্তারের পর দ্রুতই তারা জামিনে বেরিয়ে আসে। এইচআরএসএস-এর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাজা হওয়ার হার অত্যন্ত নগণ্য। দ্বিতীয়ত, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্নীতি। মামলার চার্জশিট দিতে বছরের পর বছর লেগে যায়। অনেক ক্ষেত্রে ঘুষ বা চাপের মুখে মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া অপরাধীদের সাহস জোগায়। তৃতীয়ত, সাক্ষীদের নিরাপত্তাহীনতা। অনেক প্রত্যক্ষদর্শী ভয়ে আদালতে সাক্ষ্য দিতে চান না, কারণ রাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। যখন একজন সাক্ষী দেখেন যে খুনিরা বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তখন তিনি প্রাণের মায়ায় সত্য গোপন করেন। চতুর্থত, নৈতিক অবক্ষয় ও মাদক। মাদকের প্রভাব সমাজের একাংশকে এতটাই অন্ধ করে দিচ্ছে যে মানুষ খুন করতেও দ্বিধা করছে না।
এই লাশের মিছিল থামাতে হলে শুধু আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা: অপরাধী যে দলেরই হোক বা যত ক্ষমতাবানই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। খুনি বা ধর্ষকদের যদি দ্রুততম সময়ে বিচার নিশ্চিত করা যেত, তবে পরের অপরাধীটি অপরাধ করার আগে অন্তত দশবার ভাবত। স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল: শিশু ও নারী নির্যাতনের প্রতিটি মামলা স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে সর্বোচ্চ ৬০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। প্রকাশ্য স্থানে শাস্তির বিধান না থাকলেও দৃষ্টান্তমূলক দ্রুত সাজা নিশ্চিত করতে হবে।পুলিশি ব্যবস্থায় সংস্কার: পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। কোনো হত্যাকাণ্ডের তদন্তে অবহেলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।সাক্ষী সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন: মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে যাতে তারা নির্ভয়ে আদালতে সত্য বলতে পারেন।
সবশেষে একটি প্রশ্ন আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে দাঁড়ায়, একটি রাষ্ট্রে মানুষের জীবনের মূল্য যদি এতটাই সস্তা হয়ে যায় যে প্রতিদিন নতুন নতুন লাশের খবরই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তবে সেই সমাজ কতটা সভ্য বলা যায়? বিচারহীনতার সংস্কৃতি কেবল অপরাধীদের সাহসী করে তোলে না, এটি ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ধ্বংস করে দেয়। যখন মানুষ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে যে আইনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব, তখন সমাজ অরাজকতার দিকে এগিয়ে যায়।আজ তাই সময় এসেছে স্পষ্ট ও কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার। অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক প্রভাব বা ক্ষমতার ছায়া যেন তাকে রক্ষা করতে না পারে -এমন একটি দৃঢ় বার্তা রাষ্ট্রকে দিতে হবে। কারণ একটি হত্যাকাণ্ড শুধু একজন মানুষের জীবনই কেড়ে নেয় না, এটি একটি পরিবারের স্বপ্ন ধ্বংস করে, একটি সমাজের বিবেককে আহত করে এবং একটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।যদি এখনই বিচারহীনতার এই দুষ্টচক্র ভাঙা না যায়, তবে লাশের এই মিছিল আরও দীর্ঘ হবে এবং মানবতা আরও বিপন্ন হয়ে পড়বে। তাই ন্যায়বিচার আর কেবল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়—এটি আজ বাংলাদেশের মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার রক্ষার শেষ আশ্রয়।
মো.জাহিদুল ইসলাম জাহিদ
শিক্ষার্থী,সাংবাদিকতা বিভাগ,ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
মোবাইল: ০১৭০৬৫০০৩২৯
ইমেইল: jahid.iu.cmj.5@gmail.com

