শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

পহেলা বৈশাখ বাঙালি ঐতিহ্যের প্রাচীন ধারা

Author

মোঃ রবিউস সানি জোহা , Islamic University

প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ১২৪ বার

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলা নিকেতন আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। শাল – পিয়াল, তাল -তমাল, আঁকাবাঁকা, মায়াভরা পাখি ডাকা এদেশের রূপের কোন শেষ নেই। এই অসাধারণ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে মোগল আমলে এমনকি প্রাচীনকালেও ফ্রেডারিক, সিজার, ইবনে বতুতা, বার্নিয়ের ও টেভানিয়ার প্রমুখ বৈদেশিক পর্যটকরদের আবির্ভাব ঘটে বাংলায়। এ দেশে ষড়ঋতু নিরন্তর চক্রাকারে আবর্তিত হয়ে চলছে। লীলাময়ী প্রকৃতি এখানে মুক্ত হস্তে সৌন্দর্য বিতরণ করছে।

লীলাময়ী এই প্রকৃতিতে বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি বহমান প্রাচীন ধারা বাংলা নববর্ষ বা ১ লা বৈশাখ।পহেলা বৈশাখ আমাদের সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও ঐক্যের প্রতীক। এই দিনে পুরোনো বছরের গ্লানি মুছে নতুন সূর্যোদয়ে আমরা আশার আলো খুঁজি। বছরের এই দিনটি ঘিরে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে তৈরি হয় এক উৎসবমুখর পরিবেশ।

এসো হে বৈশাখ, এসো, এসো ।
তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক॥
যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে-যাওয়া গীতি,
অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক॥
মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,
অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।”

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের ছন্দে ছন্দে জেগে ওঠে প্রতিটি প্রাণ। পুরোনোকে পেছনে ফেলে নিজ ঐতিহ্যে ও সংস্কৃতিকে হৃদয়ে ধারণ করে নতুন বর্ষকে বরণ করতে উদগ্রীব থাকে সারা বিশ্বের বাঙালি ।

ইতিহাস থেকে জানা যায় ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্য শুরুর পর থেকে আরবি বছর হিজরি পঞ্জিকা অনুযায়ী তারা কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করতেন। কিন্তু হিজরি সাল চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার কৃষি ফলনের সঙ্গে এর কোনো মিল পাওয়া যেত না। আর তখনই সম্রাট আকবরের সুষ্ঠু সমাধানের জন্য বাংলায় বর্ষপুঞ্জি সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সম্রাটের আদেশ অনুযায়ী সে সময়কার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ আমীর ফয়েজ উল্লাহ সিরাজী সৌর বছর ও আরবি হিজরি সালের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম তৈরির কাজ শুরু করেন। বাংলা বছর নির্ধারণ নিয়ে লেখা বিভিন্ন বইয়ের প্রাপ্ত তথ্য মতে, ১৫৮৪ খ্রি. ১০ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে পরীক্ষামূলক এই গণনা পদ্ধতিকে কার্যকর করা হয় ১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বর। অর্থাৎ সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের তারিখ থেকে। প্রথমে ফসলি সন বলা হলেও পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিতি পেতে শুরু করে। এভাবে বাংলা সনের জন্ম লাভ ঘটে।
বর্তমানে বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাঙালিদের যোগাযোগ নিরবচ্ছিন্ন রাখার সুবিধার্থে বাংলাদেশের সব জায়গাতেই খ্রিস্টীয় সন ব্যবহার করা হয়। বাংলা একাডেমি কর্তৃক নির্ধারিত পঞ্জিকা অনুসারে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল নববর্ষ পালিত হয়।

পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ’ (সামাজিক উৎসব) সবার অন্তরে অন্তরে ছড়িয়ে পড়ে আনন্দে মাতোয়ারা করে সবাইকে একাকার করে দেয়। বর্ষবরণের মূল আয়োজন ঢাকার রমনা বটমূলে শুরু হলেও সেই আনন্দ আয়োজনের ঢেউ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। পান্তা, ইলিশ আর নানা রকম ভর্তার বাঙালিপনায় পুরোজাতি নিজেকে খুঁজে ফিরে বর্ষবরণের ব্যস্ততায়। সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী ও ছায়ানটের শিল্পীদের সম্মিলিত কণ্ঠে গান, আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের শোভাযাত্রা, মঙ্গলযাত্রা, নানা রকম বাদ্যযন্ত্র, বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিলিপি ও রং-বেরঙের বানানো মুখোশ, শাড়ি, পাঞ্জাবি ও ফতুয়া পরে ঘুরে বেড়ানোর মধ্যে দিয়ে পালিত পহেলা বৈশাখ ।

পহেলা বৈশাখ আমাদের শিক্ষা দেয়—নতুন করে শুরু করার। এটি জাতিগতভাবে আমাদের চেতনাকে জাগ্রত করে, স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের শিকড়ের কথা। এই দিনে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবাই এক কাতারে দাঁড়ায়। এই হলো বাঙালিয়ানা, এই হলো আমাদের পরিচয়।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!