বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন
হোম / ফিচার / নিবন্ধ

সরিষার ঘ্রাণে বন্ধুত্বের দুপুর

Author

সাব্বির হাসান নিরব , বাজিতপুর সরকারি কলেজ, কিশোরগঞ্জ

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ পাঠ: ৩৮ বার

সরিষার ঘ্রাণে বন্ধুত্বের দুপুর

সাব্বির হাসান নীরব, বাজিতপুর সরকারি কলেজ, কিশোরগঞ্জ

​প্রচণ্ড শীতের সমাপ্তি ঘটিয়ে কোনো এক দুপুরবেলা মাথার ওপর সূর্যের দেখা মিলল। সবার মুখেই ফুটে উঠল দীর্ঘদিন জমে থাকা হাসির রেখা, আমার মুখেও ঠিক তাই। রোদ পোহাতে উঠোনে চেয়ার পেতে বসতে না বসতেই আমার নিত্যদিনের বন্ধু, অরণ্যে হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গী আকরাম হুসাইন মেসেজ করল। শীতের কারণে বেশ কিছুদিন কোথাও বের হওয়া হয়নি, বন্ধুদের সঙ্গেও দেখা হয়নি।

​রোদের দেখা মিলতেই আমরা দুজন চলে গেলাম আগরপুরে। সচরাচর আকরামের সঙ্গে আড্ডা দিতে আগরপুরেই যাওয়া হয়। কথা বলতে বলতে জানলাম, আমাদের আরও দুই বন্ধু আপন আর নজরুলও আসছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা চারজন একসঙ্গে হলাম। জমে উঠল এক অন্যরকম আড্ডা। চায়ের স্টলে বসে গল্প করতে করতে হঠাৎ আমার মাথায় এল সরিষা ফুলের কথা।

​পৌষ মাসের শেষার্ধে আমাদের কিশোরগঞ্জ জেলায় প্রায় সব জায়গাতেই সরিষা চাষ হয়। ভাবতেই সরিষা ফুলের ঘ্রাণ যেন নাকে এসে লাগল। তখনই পরিকল্পনা করলাম যে আগরপুরের পাশেই কোথাও সরিষার ঘ্রাণ নিতে যাব। ভ্রমণপিপাসু, প্রকৃতিপ্রেমী মন আর অপেক্ষা করতে পারল না।

​চার বন্ধু গল্প করতে করতে আগরপুর গ্রামের পেছনের গ্রাম হাড়িয়াকান্দার দিকে রওনা দিলাম। গ্রামটিতে একটি চমৎকার রাস্তা আছে, যা যে কারো দৃষ্টি কাড়বে। রাস্তার দু’পাশে সারি সারি কৃষ্ণচূড়া, জারুল, কদম, পেয়ারা, বরই, অর্জুনসহ নানা ধরনের ফুল-ফলের গাছ। তার পাশেই বিস্তীর্ণ কৃষিজমি। অগ্রহায়ণ মাসে ধান ঘরে ওঠার পর অনেক জমিই পড়ে আছে, আবার কিছু জমিতে শীতকালীন সবজির চাষ হয়েছে। আমাদের জানা মতে, দুটি জমিতে সরিষার চাষ ছিল। কিন্তু জমিতে পৌঁছে দেখলাম, সরিষার ফুল পরিপক্ব হয়ে বীজে রূপান্তরিত হয়েছে। আমাদের সবার মুখেই হতাশার ছাপ ফুটে উঠল। ঠিক তখনই আকরামের চোখে পড়ল দূরে হলুদ আবরণে ঢাকা একটি জমি। বুঝতে বাকি রইল না ওটা সরিষার খেত। অনেক দূরে হওয়ায় আন্দাজ করলাম, বেশ খানিকটা পথ হাঁটতে হবে। কৃষিজমির আলপথ ধরে হাঁটতে শুরু করলাম আমরা চারজন। হাঁটতে হাঁটতে শুরু হলো তর্ক-বিতর্ক, যেমনটা বন্ধুদের মাঝে হয়। কখনো রাজনীতি, কখনো প্রকৃতির সৌন্দর্য, কখনো আবার জীবনের উত্থান-পতন নিয়ে কথা বলতে বলতে এগোচ্ছিলাম। বন্ধুরা পাশে থাকলে যেন সব যুদ্ধই জয় করা সম্ভব। কথার মাঝেই কখন যে প্রায় তিন কিলোমিটার পথ পেরিয়ে ফেলেছি, টেরই পাইনি।

​কিন্তু সরিষার খেতে পৌঁছে আবারও হতাশা। জমিটি ছিল একটি খালের ওপারে। দূর থেকে খালটি চোখে পড়েনি। কাছে এসে দেখলাম, কচুরিপানায় ভরা এক বিশাল খাল আর তার ওপারেই ফুটে আছে হাজার হাজার হলুদ ফুল। খাল পার হতে না পারার ভাবনায় সবার মন খারাপ হয়ে গেল।

​তবু মনে আশা ছিল যে এত বড় খাল, নিশ্চয়ই কোথাও খাল পার হওয়ার রাস্তা আছে। খালের ধার ধরে কিছুদূর এগোতেই আপন জানাল, সামনে একটি বাঁশের সাঁকো আছে। সেটি দিয়েই নাকি পার হওয়া যাবে। আমরা আনন্দ নিয়ে সাঁকোর কাছে পৌঁছালাম। কাছে গিয়ে বুঝলাম, সাঁকোটি খুব একটা শক্তপোক্ত নয়। নিচে খাল, ওপরে নড়বড়ে বাঁশ ভয় লাগছিল বেশ। প্রথমে আকরাম উঠল, তার পিছু পিছু আপন আর নজরুল। বাঁশগুলো থরথর করে কাঁপছিল। আমি এপারে দাঁড়িয়ে শ্বাস চেপে তাদের পার হওয়া দেখছিলাম। সবাই নিরাপদে ওপারে পৌঁছানোর পর আমিও সাহস করে পার হলাম।

​অবশেষে আমরা পেলাম সেই কাঙ্ক্ষিত সরিষার খেত। আহা! কী অপরূপ দৃশ্য! মৃদু হাওয়া, সরিষা ফুলের মাতাল করা ঘ্রাণ, যেন কিছুক্ষণের জন্য স্বর্গীয় সুখ এনে দিল। চারপাশে খোলা মাঠ, লোকজন নেই। মাঝে মাঝে ভ্রমর এসে ফুলে বসছে, কিন্তু বাতাসের দোলায় ঠিকমতো মধু সংগ্রহ করতে পারছে না।

​অনেক কষ্ট করে এসে আমরা জমির আইলে বসে গল্প করলাম, ছবি তুললাম। আমাদের মধ্যে ফটো তোলায় সবচেয়ে দক্ষ আকরাম, আর সবচেয়ে বেশি ছবি তুলতে হয় আপনের। আমি আর নজরুলও কম ছবি তুলিনি। সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। বাতাসের সঙ্গে ঠাণ্ডাও বাড়তে শুরু করল। সময় ফুরিয়ে আসছিল। ফেরার পথে নজরুলের কাছ থেকে কিছু সাহিত্যিক আলাপ শুনলাম। আমি জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতার কয়েকটি পঙ্‌ক্তি পাঠ করে শুনালাম। সন্ধ্যার আগেই আমরা আবার আগরপুরে ফিরে এলাম। সেখানেই চারজন মিলে হালকা খাবার খেয়ে নিজ নিজ বাড়ির পথে রওনা হলাম। তীব্র শীতের পর এমন একটি দিন উপহার পাব কখনো ভাবিনি। দিনটি স্মৃতির পাতায় চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

লেখক: সম্পাদকীয় পর্ষদ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২০ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!