বন্যপ্রাণী রক্ষা আমাদের দায়িত্ব

বন্যপ্রাণী রক্ষা আমাদের দায়িত্ব
সাব্বির হাসান নীরব
বাংলাদেশের শহর এবং গ্রামের পথে-ঘাটে একটি দৃশ্য আমাদের কারো কাছে আর অচেনা নয়। বিশাল দেহের এক হাতি, যার পিঠে বসে থাকে মাহুত। মাহুতের ইশারায় হাতিটি কখনো বাজারের দোকানদারদের কাছে, কখনো রাস্তার গাড়িচালকদের কাছে শুঁড় বাড়িয়ে টাকা আদায় করে। অনেক সময় মানুষ স্বেচ্ছায় না দিলেও ভয় পেয়ে হাতির শুঁড়ে টাকা তুলে দিতে বাধ্য হয়। একইভাবে গ্রামীণ মেলায় গলায় শিকল বাঁধা বানরকে ব্যবহার করে নানা ধরনের খেলা দেখানো হয়, আর সেই খেলার সঙ্গে দর্শকের কাছে বিক্রি করা হয় ভেষজ বা কবিরাজি ওষুধ।
প্রশ্ন জাগে, এ কি সত্যিই প্রাণীদের স্বাভাবিক ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ? উত্তর একটিই, না। এগুলো নিছক বিনোদনের ছদ্মবেশে চলছে এক ভয়াবহ শোষণ ও নির্যাতনের চিত্র। যে প্রাণীগুলো বনে স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার কথা, প্রকৃতির নিয়মে জীবনযাপন করার কথা, তাদের জোরপূর্বক বন্দি করে মানুষের আয়-রোজগারের যন্ত্রে পরিণত করা হচ্ছে।
একসময় যে হাতি বনে অবাধে চলাফেরা করত, নদীতে স্নান করত, ঘণ্টার পর ঘণ্টা খাদ্য সংগ্রহ করত, আজ তাকে শিকলে বাঁধা অবস্থায় বাজারে ঘোরানো হয়। তার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি, সামাজিক জীবন, এমনকি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাকে বানানো হয়েছে বিনোদন কিংবা চাঁদাবাজির হাতিয়ার। অন্যদিকে, যে বানর গাছে গাছে লাফিয়ে বেড়াত, বীজ ছড়িয়ে নতুন বন জন্মাত, তাকে গলায় শিকল বেঁধে মানুষ হাসানোর খেলা দেখাতে বাধ্য করা হয়। এ দৃশ্য বাহ্যিকভাবে মজার মনে হলেও এর আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক নির্মম বাস্তবতা।
অবস্থা এখানেই থেমে নেই। হাতি দিয়ে টাকা আদায় প্রক্রিয়া অনেক সময় ভয়াবহ বিপর্যয়ের জন্ম দেয়। সংবাদপত্রের পাতায় প্রায়ই শিরোনাম হয় যে, উত্তেজিত হাতির পায়ের নিচে পড়ে মানুষ আহত কিংবা নিহত হয়েছেন। কখনো দেখা যায়, কেউ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে মাহুত ইচ্ছাকৃতভাবে হাতিকে উসকে দেয়। ফলে ঘটে দুর্ঘটনা, সৃষ্টি হয় ভাঙচুর ও আতঙ্ক। গ্রামীণ মেলায় বানরের খেলার ক্ষেত্রেও মাঝে মাঝে দুর্ঘটনা ঘটে। ভীত বা ক্ষিপ্ত বানর হঠাৎ আক্রমণ করে বসে। ফলে দর্শক ও পরিবেশ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমাদের সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে— ‘রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন করবে এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ করবে।’
এ ছাড়া বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী কোনো বন্যপ্রাণীকে শিকার, হত্যা কিংবা বন্দি করে ব্যবহার করা দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব আইন শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ রয়েছে। প্রতিদিন আমাদের চোখের সামনে হাতি দিয়ে চাঁদাবাজি কিংবা বানরের খেলা চলছেই। এটি আইনের অকার্যকারিতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, হাতি কেবল বনজ প্রাণী নয়, বরং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী এক ‘ইকো-ইঞ্জিনিয়ার’। তারা বনকে টিকিয়ে রাখে, বনজ গাছপালার বৃদ্ধি ও প্রজননে সহায়তা করে, নদী-নালা ও পাহাড়ি এলাকায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখে। তাদের চলাফেরা ও খাদ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া প্রকৃতির পুনর্জন্মে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে, বানর প্রাকৃতিকভাবে বীজ ছড়িয়ে বন গঠনে সাহায্য করে। একেকটি বানর বছরের পর বছর ধরে শত শত গাছ জন্মাতে পারে কেবল বীজ ছড়িয়ে দিয়ে। অর্থাৎ, তাদের ভূমিকা শুধু বিনোদন নয়, বরং প্রকৃতির চক্র সচল রাখার ক্ষেত্রে অপরিহার্য। অথচ মানুষের লোভের কারণেই এই দুই প্রাণীই আজ সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত।
প্রাণী অধিকারকর্মীরা বলেন, ‘প্রাণীর বিনোদন মানেই শোষণ’। আমরা যখন হাতি, বানর বা অন্য কোনো প্রাণীর খেলা দেখে মজা পাই, তখন হয়তো ভুলে যাই এই প্রাণীগুলোকে অমানবিকভাব প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। হাতিকে বশ মানাতে লোহার শিকল ও বর্শা ব্যবহার করা হয়, তাকে খাবারের জন্য অনাহারে রাখা হয়, শাস্তি হিসেবে নির্যাতন করা হয়। বানরকে বশ মানাতে মারধর করা হয়, কখনো গরম লোহার ছ্যাঁকা দেওয়া হয়। এসব কষ্টের বিনিময়েই তারা খেলতে শেখে।
মাহুত ও বানর খেলোয়ারেরা যুক্তি দেন, এটাই তাদের জীবিকার একমাত্র উপায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জীবিকা নির্বাহের নামে কি অন্য প্রাণীর স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া যায়? যদি তাই হতো, তবে সমাজে চুরি-ডাকাতিও জীবিকা হিসেবে বৈধ হয়ে যেত। সরকার চাইলে এসব মানুষের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে পারে। যেমন ক্ষুদ্রঋণ, বিকল্প কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। প্রাণী শোষণ করে জীবিকা নির্বাহকে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য ধরা যায় না।
বিশ্বের অনেক দেশে হাতি-বানরের খেলা, সার্কাস বা চিড়িয়াখানায় প্রাণী প্রদর্শনী ক্রমেই নিষিদ্ধ হচ্ছে। ভারতের কেরালা রাজ্যে হাতি দিয়ে ধর্মীয় শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ নিয়েও আন্দোলন হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের অধিকাংশ দেশে সার্কাসে প্রাণী ব্যবহার এখন অতীত। বাংলাদেশও চাইলে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারে।
মনে রাখতে হবে, প্রাণী আমাদের বিনোদনের পুতুল নয়। তারা প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ, আমাদের সহাবস্থানের অংশীদার। প্রাণী রক্ষা করা দয়া নয়, এটি আমাদের নৈতিক, সামাজিক এবং সাংবিধানিক দায়িত্ব। আজ যদি আমরা প্রাণীদের মুক্ত না করি, কাল হয়তো আমাদের সন্তানরা শুধু ছবিতেই হাতি-বানর দেখবে। তাই এখনই উপযুক্ত সময় প্রাণীর স্বাধীনতার পাশে দাঁড়ানোর, প্রকৃতির ভারসাম্যের পাশে দাঁড়ানোর।
লেখক: শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, বাজিতপুর সরকারি কলেজ
কিশোরগঞ্জ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
sabbir54109653@gmail.com

