বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

সবুজের মাঝে রঙিন উল্লাস: ইউটিউব ভিলেজে আমরা

Author

মোছাঃ ইসমা খাতুন , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

প্রকাশ: ১ ডিসেম্বর ২০২৫ পাঠ: ৫৮ বার

পার্ককে সাধারণত আমরা বিনোদন কেন্দ্র হিসেবেই জানি। কিন্তু ‘ইউটিউব ভিলেজ পার্কটি’ বিনোদন কেন্দ্রের পাশাপাশি একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, সৃজনশীলতা এবং ইউটিউব থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে নিজেদের গ্রামকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যাওয়ার একটি গৌরবময় গল্প। পরীক্ষা শেষ হতেই আমরা চললাম সেই গল্পের সাক্ষী হতে।

ক্যাম্পাসে নয়টার বাসে বের হবো। ক্যাম্পাসে বাসের সিট ধরা আমাদের কাছে মাউন্ট এভারেস্ট জয় করার মতোই। কারণ বাসে সিট পাওয়া অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ব্যাপার। আমি আর রীথি ঝাল চত্বর থেকে ‘স্বাধীনতা’ ডবল টেকার বাসে উঠে পড়লাম। হাফসা আর নুসরাত সিট ধরতে মেইন গেটেই ছিল, কিন্তু ওরা ওখানে থেকেও বাস মিস করেছে। বাসে উঠে আমি আর রিথী খুবই অবাক, অনেক সিট ফাঁকা! হাফসা আর নুসরাতের সিট রেখে ওদের বললাম মেইন গেটেই থাকতে। আমাদের মধ্যে হাফসার ধৈর্যটা একটু কম। বিশেষ করে কোনো বিষয়ে অপেক্ষা করার ক্ষেত্রে। বাস ক্যাম্পাসের মধ্যে ঘুরে যেতে দেরি হবে সেটাও তার আর সহ্য হচ্ছিল না, দুই বার ফোন দিল গাড়ি কতদূর জানতে। উল্লেখ্য, ক্যাম্পাসের ভেতর ঘুরতে ১০ থেকে ১২ মিনিট সময় লাগে। এই ১০-১২ মিনিট অপেক্ষা করতে তার যে কতটা কষ্ট হচ্ছিল তা আমি ভালো করেই বুঝতে পারতেছিলাম। আবার ফোন দিয়ে বলছিলো ভ্যান নিয়ে হল গেটে এসে বাসে উঠি। অবশেষে মানা করার পর মেইন গেইট থেকেই উঠলো, সারা রাস্তা চারজন অনেক গল্প করতে করতে চললাম। চৌড়হাস থেকে ক্যাম্পাসের বাস থেকে নেমে খোকসার বাসে উঠলাম। বাসে থেকে নামতেই হঠাৎ আমার ভাইয়ার ফোন আসলো। খুব ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করছিল ঠিক আছি কিনা। প্রথমে প্রশ্ন শুনে অবাক লাগলেও পরক্ষণে জানতে পারলাম অনেক বড় একটা ভূমিকম্প হয়েছে। আসলে আমরা বাসে ছিলাম, রাস্তাটাও তেমন ভালো না, এমনিতেই ঝাঁকিয়ে চলছিল। তাই ভূমিকম্পের বিষয়টা আমরা কেউ বুঝতে পারিনাই। বাস থেকে নেমে ভ্যান গাড়ি করে টানা ২ ঘন্টা জার্নির পর আমরা চলে এলাম কুষ্টিয়ার খোকসার বিখ্যাত ইউটিউব ভিলেজে।

গ্রামীণ স্থাপত্যশৈলী, প্রাকৃতিক শোভা এবং আধুনিক বিনোদনের এক মনোমুগ্ধকর মিলনস্থলের কেন্দ্রটি গড়ে উঠেছে একদম ব্রাত্য অঞ্চলে সবুজে ঘেরা গ্রামের মধ্যে। এ যেন একদম অজপাঁড়া গায়ের ভেতরে এক টুকরো রঙিন উল্লাস। ছায়া সুনিবিড় এই পার্কের প্রবেশ মূল্য ৫০ টাকা।
প্রধান গেট দিয়ে প্রবেশ করতেই প্রথম চোখে পড়ে সুন্দর একটি ফোয়ারা, যা দর্শকদের স্বাগত জানায় এবং পার্কের শৈল্পিক পরিবেশের আভাস দেয়। পার্কের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতেই দেখলাম নানা রঙের রঙিন ফুলে ফুলে ভরে ওঠা অসম্ভব সুন্দর দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ। খড়-বাঁশ-বেত ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে ছোট টাওয়ার, সাঁকো এবং বসার জন্য ছোট ছোট কুটির। যা গ্রামীন লোকজ ঐতিহ্য বহন করে। ছোট্ট এই পার্কটি ফুল দ্বারা সজ্জিত সুন্দর সুন্দর সুন্দর বসার স্থান, দৃষ্টিনন্দন প্রজাপতি, ছোটদের জন্য মজার মজার রাইড, ছোট ছোট কৃত্রিম লেকে মাগুর মাছ, কচ্ছপ ও কুমিরের ছানা সংরক্ষিত রয়েছে। ইউটিউব ভিলেজের নাম কথিত কারুকার্যের স্থাপনায় পার্কটি যেন লোকশিল্পের মধ্যে আধুনিক মিশ্রণে এক অনন্য রূপ লাভ করেছে।

পার্কের পিছনের দিকে একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে একটি শান্ত লেক। লেকের সুন্দর পানিতে ঘুরে বেড়ানোর জন্য রয়েছে দৃষ্টিনন্দন প্যাডেল বোর্ড। লেকের চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য খুবই মনোরম। দেখতে পেলাম, কোনো এক স্কুল এখানে বনভোজনের আসছে। তারা সবাই কেউ রাইড, কেউ শিক্ষার্থীদের নিয়ে ঘুরাঘুরি, কেউ রান্নাবান্নার কাজে ব্যস্ত। আমরা পাশেই সুন্দর একটি স্থানে বসে পাপড় খেলাম আর একটু বিশ্রাম নিলাম। পার্কে প্রবেশ করার পর থেকেই চলছে একটানা ফটোশুটিং। আমাদের ক্যামেরাম্যান হলো রীথি। ও খুব ভালো ছবি তোলে, সম্প্রতি ‘সামিয়ার সুগন্ধিযুক্ত চিঠি’ নামে একটি পেজও খুলেছে। কোথাও ঘুরতে গেলে সবসময় ওকেই আমাদের সবার ছবি তুলে দিতে হয়। আপাতত ছবি তুলতে তুলতে সবাই ক্লান্ত। সবারই গরম লেগে গিয়েছে। এদিকে নুসরাত বোরকার নিচে সোয়েটার পড়ে এসে পড়েছে ভীষণ বিপদে। ওর অবস্থা দেখে আমাদের আড্ডাটা আরেকটু জমে উঠল। সামনেই চোখে পড়ল একটা দোকান। হালকা শীতে আইসক্রিম খাওয়ার মজাই অন্যরকম, আমি আর রিথী দুইজন দুইটা আইসক্রিম কিনলাম। হাফসা আর নুসরাতের এমনিতেই ঠান্ডার সমস্যা এজন্য ওরা কিনলো না।

সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপার হলো, এখানে দর্শনার্থীদের সুন্দর খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতি সোমবার এবং বৃহস্পতিবার বিনামূল্যে এখানকার ঐতিহ্যবাহী খাবার পরিবেশন করা হয়। কিন্তু আমরা শুক্রবারে সেখানে যাওয়ার কারণেই এই অফারটি মিস করে ফেলি। গ্রামের স্থানীয় স্কুল শিক্ষক মো. দেলোয়ার হোসেন এবং তার ভাতিজা লিটন আলী খান একটি ইউটিউব চ্যানেল শুরু করেন। প্রথমদিকে তারা গ্রামীণ মাছ ধরা বা সাধারণ দৃশ্য নিয়ে ভিডিও তৈরি করলেও পরে গ্রামের ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ রান্নাবান্না ও লোকজ জীবনধারা তুলে ধরার দিকে মনোযোগ দেন। একসময় তারা সিদ্ধান্ত নেন যে, রান্নার ভিডিও তৈরির সময় তারা গ্রামের দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের জন্য বড় আয়োজনে রান্না করবেন এবং তাদের খাওয়াবেন। এই মহৎ উদ্যোগের ভিডিওগুলো বিশ্বব্যাপী মানুষের কাছে পৌঁছায়। ইউটিউব থেকে অর্জিত অর্থ দিয়েই তারা এই পার্কটিকে আধুনিক সজ্জায় সুসজ্জিত করে তোলে এবং নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য খাবার পরিবেশন করে থাকে। যে বিষয়টি আমাদেরকেও মুগ্ধ করেছিল। এই পার্কটি প্রমাণ করে যে, ইচ্ছা ও প্রচেষ্টা থাকলে গ্রামীণ জীবন থেকেও বিশ্বমানের কিছু তৈরি করা সম্ভব। অবশেষে ঘোরাঘুরির পর ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে আমরা রওনা হলাম।

লেখক: কার্যনির্বাহী সদস্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!