বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

স্মার্ট প্যারেন্টিং: প্রজন্মের জন্য সঠিক দিকনির্দেশনা

Author

মোছাঃ ইসমা খাতুন , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৫ পাঠ: ৫৮ বার

একটি ভবন নির্মাণ করতে যেমন মজবুত পিলার প্রয়োজন হয় তেমনি একটি প্রকৃত মানুষ, আদর্শ জাতি গঠন এবং দেশ বির্নিমানের জন্য কিছু বিশেষ গুণাবলী সম্পূর্ণ মানুষ প্রয়োজন। সুস্থ প্যারেন্টিং হলো সেই বিশেষ গুণাবলী সম্পূর্ণ মানুষ গঠনের পূর্বশর্ত। প্যারেন্টিং হলো শিশুর জন্ম থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত পিতা-মাতা বা অভিভাবকদের পরিচর্যা। একটি শিশু শুধু একটি পরিবারেরই অংশ নয় বরং একটি সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই শিশু যখন পরিবারে বেড়ে ওঠে তখন তার মূল্যবোধ গঠনের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে প্যারেন্টিং। কথায় আছে ‘আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।’ পরিবার থেকে শিশু যে শিক্ষা, আদর্শ, রুচিবোধ নিয়ে বেড়ে ওঠে সেভাবেই গঠিত হয় তার মূল্যবোধ। শিশুর যদি সুস্থ মানসিক বিকাশ না ঘটে তাহলে একসময় তারা বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষের পরিণত হয়ে যায়। যার দ্বারা আমাদের ভবিষ্যৎ সুন্দর নয় বরং সুন্দর ভবিষ্যৎ ভেঙে গিয়ে এক অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে যায়। তাই শিশুর প্যারেন্টিং এর ক্ষেত্রে তার নৈতিক মূল্যবোধের দিকে নজর রাখা অভিভাবকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

শিশুর প্যারেন্টিং তার ভূমিষ্ঠ হবার পর থেকে নয় বরং আগে থেকেই শুরু করা উচিত। শিশুর শারীরিক বিকাশের জন্য গর্ভধারণের আগে মায়ের শারীরিক সুস্থতার দিকে নজর দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাথে সাথে মানসিক সুস্থতা দিকেও নজর রাখতে হবে। মায়ের মানসিকতার উপর শিশুর মানসিক সুস্থতা নির্ভর করে থাকে। মায়ের ইতিবাচক আবেগ শিশুর মধ্যে সুস্থতা আনে ঠিক একইভাবে নেতিবাচক আবেগ শিশুর মধ্যে অস্থিরতার সৃষ্টি করে। গর্ভাবস্থায় শিশুরা প্রায় ২০-২৭ সপ্তাহের মধ্যে শব্দ শুনতে পায়। তাই গর্ভাবস্থায় মায়ের ইতিবাচক মনোভাব ও কাজের মধ্যে থাকার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি মায়ের মানসিক সুস্থতার দিকে নজর দিয়ে সুস্থ পরিবেশ তেরি করে দেওয়া উচিত।

ইসলাম ধর্মেও প্যারেন্টিং এর ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একটি হাদিসে দেখতে পাই, হযরত ওমর (রা.) এর কাছে এক ব্যক্তি বিচার দিলেন তার পুত্রের নামে, যে তার পুত্র তার কথা শোনে না এবং অনেক বেয়াদব হয়ে গিয়েছে। হযরত ওমর (রা.) তখন সেই ব্যক্তিকে এবং তার ছেলেকে একসাথে ডাকলেন। তিনি সেই ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন তার অবাধ্যতার ব্যাপারে। তখন সেই ছেলেটি হযরত ওমর (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, “শুধু কি আমারই আমার পিতার উপর দায়িত্ব রয়েছে? তার কী আমার উপর কোনো দায়িত্ব নেই?” তখন তিনি বললেন,” হ্যাঁ আছে। তার বাবার প্রথম দায়িত্ব তার জন্য ভালো একটা মায়ের ব্যবস্থা করা, ভূমিষ্ঠ হওয়ায় পর তার জন্য সুন্দর একটা নাম রাখা এবং আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে তাকে শিক্ষা দেওয়া।” ছেলেটি তখন বলল তার বাবা তার মধ্যে একটি দায়িত্বও পালন করেননি। এজন্য সন্তানের থেকে ইতিবাচক আচরণ নিশ্চিত করতে হলেও তাদের সঠিক সামাজিকীকরণের মাধ্যমে আদর্শ মানুষে পরিণত করতে হবে।

শিশুকে ছোট থেকেই সুস্থ ও কর্মঠ করে গড়ে তোলা উচিত। যার ফলে শিশু শারীরিকভাবে শক্তিশালী হয়ে গড়ে উঠতে পারে। সুস্থতা সবচেয়ে বড় নিয়ামকের মধ্যে অন্যতম। সুষম খাদ্য তালিকা এবং শরীর চর্চা রোগ-প্রতিরোধের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ফলে অল্পতেই শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ে না। সাধারণত প্রত্যক বাবা-মাকেই শিশুর শারীরিক স্বাস্থ্যের প্রতি যথেষ্ট যত্নশীল হতে দেখা যায়। তারা বাচ্চার সুস্থ বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার তালিকায় বিশেষ নজর দিয়ে থাকেন। অনেক সময় শিশুরা খাবার খেতে না চাইলেও জোর পূর্বক খাবার খাওয়ানোর নজির একটি স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, তারা তাদের সন্তানদের শারীরিক যত্ন নিলেও মানসিকভাবে যত্ন নেওয়ার বিষয় তেমন গুরুত্ব দেন না। যার ফলস্বরুপ দেশে আজ বৃদ্ধাশ্রম এর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু তাই নয়, সুস্থ মানসিক চর্চার অভাবেই দেশে বৃদ্ধি পাচ্ছে কিশোর গ্যাঙ, মাদকাসক্ত, ধর্ষক, চোর এবং ছিনতাইকারীর সংখ্যা। যে বাবা-মা জোর করছেন তাঁর বাচ্চার ভালোর জন্য খাবার খাওয়াতে সেই বাবা-মায়েরাই বাচ্চার নৈতিক মূল্যবোধের জন্য জোর করতে পারেন না। তারা পারেন না নিজের বাচ্চাদের মোবাইল, টিভি, ল্যাপটব ইত্যাদি ডিভাইস থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে। তারা পারেন না তাদের বাচ্চার অন্যায় বায়না কে প্রতিহত করতে। ফলে ধৈর্য ধারণের মত একটি গুণাবলীর সাথে শিশুরা পরিচিতই হতে পারে না।

শিশুকে সহনশীল হওয়া ও ধৈর্যধারণ করতে শেখানো উচিত। ধৈর্যধারণ মানুষের জীবনের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা যা প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে শেখায়। দুঃখ বা বিপদ প্রতিটি মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যারা বিপদের সময় ধৈর্যধারণ করে মহান আল্লাহর উপর আস্থা রেখে বিপদ মোকাবেলায় অগ্রসর হয় তারাই জীবনে সফল হতে পারে। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে জীবনের এই অবিচ্ছেদ্য অংশ মেনে নেওয়া তো দূরের কথা বরং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়লে তা সমাধান বা মোকাবিলার চেষ্টা না করে তারা এর জন্য অন্যকে দায়ী করে এর প্রতিশোধ পরায়ণতায় দিকে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যে কোনো বিষয়ে খুব সহজেই তারা হতাশ ও উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। আবেগ নিয়ন্ত্রণে অক্ষম হয়ে পরে এবং তাদের মধ্যে রাগ, জেদ, অস্থিরতার বিরাজ করে। আর এই প্রক্রিয়া সচারাচর চলতে চলতে বর্তমান এটি খুবই স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। ফলে তারা কোন কাজে মনোযোগী হতে পারেনা। খুব অল্পতেই তারা বিরক্ত এবং হতাশ হয়ে যায়। এর ফলে শিক্ষাজীবন এবং কর্মজীবনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এছাড়াও ধৈর্যধারণের অভাবে অনেক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে মানুষ ভুল করে ফেলে। এছাড়াও অনেক সময় খারাপ বন্ধু নির্বাচনের কারণে শিশুরা ভ্রান্ত পথে চলে যায়। তাই বন্ধু নির্বাচন সহ সকল ক্ষেত্রে সঠিক প্যারেন্টিং এর মাধ্যমে শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য এ সকল বিষয়ের দিকে নজর রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সন্তানকে অভাব শেখানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে প্রায় ৯০% শিশু পরিবারের কাছে কোনো জিনিস আবদার করার সাথে সাথে পেয়ে যায়। যা স্বাভাবিক ভাবে একটি শিশুকে অভাব এবং কষ্ট থেকে অনেক দূরে নিয়ে যায়। কোনো কিছু পাওয়ার জন্য যে পরিশ্রম, কষ্ট বা সাধনার প্রয়োজন হয়, হয়তো তারা এই সাধারণ জ্ঞান থেকেই বঞ্চিত হয়ে পড়ে। ফলে খুব সহজেই তারা মানুষের মধ্যে শ্রেণীবিভেদ তৈরি করতে পারে। তারা অন্যের কষ্টের প্রতি সংবেদনশীল হতে পারেনা। ফলস্বরূপ খুব সহজে অকৃতজ্ঞ হয়ে উঠতে পারে। এছাড়াও তারা অর্থের মূল্য বুঝতে পারে না এবং তাদের মধ্যে অপচয় প্রবণতা বেশি দেখা যায়। যা একটি পরিবার, সমাজ বা দেশের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
শিশুদের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে প্রতিটি আচরণের দিকে খেয়াল রাখা উচিত। বিশেষ করে বর্তমান জেনারেশনে শিশুদের মধ্যে জিদের নজির বেশি লক্ষণীয়। তারা যেকোনো বিষয়ে গো ধরে বসে থাকলে, বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে এই বলে তাদের অভ্যাসটিকে গুরুত্ব দেয় না। এছাড়াও বড়দের সাথে কেমন ব্যবহার করতে হবে, বাসায় মেহমান বা অপরিচিত মানুষ আসলে তাদের সালাম দেওয়া এবং তাদের সাথে সুন্দর করে কথা বলা এ বিষয়গুলি দিন দিন লোপ পাচ্ছে।

বর্তমানে শিশুর বিনোদনের মাধ্যম খেলাধুলা নয় বরং মোবাইল ফোন। এমনকি এই মোবাইল ফোন ছাড়া তাদের ভাত খাওয়ানোও সম্ভব হয় না। মোবাইলে বিভিন্ন ধরনের টিকটক, রিলস এসব দেখা তাদের স্বাভাবিক অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে খুব সহজেই তারা আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি নয় বরং বৈদেশিক অপসংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে পড়ছে। মোবাইল গেইম আসক্তি তাদের সুস্থ সামাজিকীকরণের প্রধান বাধা। শুধু যে বাঁধা তাই নয়, এর ফলে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া সন্তান কতৃক পিতা-মাতা হত্যারও নজির রয়েছে। তাই মোবাইলসহ বিভিন্ন আধুনিক ডিভাইসের পরিবর্তে তাদের খেলাধুলার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এতে শিশু শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকবে।
প্যারেন্টিং এর ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হচ্ছে ধর্মীয় শিক্ষা। ধর্মীয় নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের মাধ্যমই একটি শিশুকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারে। কিন্তু বর্তমান শিশুদের মধ্যে এ ধরনের শিক্ষা আদান-প্রদানের বিষয়টি অত্যন্ত শিথিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বড় বড় ডিগ্রীধারীদের মধ্যে ধর্মীয় ভীরুতা না থাকার ফলে তাদের মধ্যে সততা, নৈতিকতা, মূল্যবোধের ঘাটতি রয়েছে। যার ফলে ঘুষ, দুর্নীতি, অর্থপাচার ইত্যাদি বিষয়গুলো বৃদ্ধি পাচ্ছে।

দেশের নাগরিকদের সুনাগরিক হিসেবে সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে করে গড়ে তুলতে এবং তাদের মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন করার জন্য শিক্ষিত ও জ্ঞানবান সমাজ তৈরি করতে, তাদের জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সংস্কৃতিক উন্নয়ন, দেশের নতুন ধারা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে, সততা, ন্যায়পরায়ণ, সহমর্মিতা এবং দায়িত্বশীল, সৎ ও নৈতিক গুণাবলী সম্পন্ন ব্যক্তিত্বে গড়ে তোলার জন্য জন্য সুস্থ প্যারেন্টিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক: কার্যনির্বাহী সদস্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৩ জুলাই ২০২৫ তারিখে প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!