বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

“অমিলহেতু ভাবনা, প্রজন্ম দ্বন্দ্বের সূচনা”

Author

আরিফুল কাদের , চট্টগ্রাম কলেজ

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৫ পাঠ: ৩৭ বার

প্রজন্ম হল নির্দিষ্ট সময়ে জন্মগ্রহণকারী এবং বসবাসকারী মানুষের সমষ্টি যারা একই ধরনের বিশ্বাস, মূল্যবোধ, চেতনা কিংবা জীবনধারায় প্রভাবিত হয়ে থাকে। আর দ্বন্দ্ব বলতে এদের মধ্যে মতের অমিলকেই বিশেষভাবে বোঝানো হয়। বর্তমান মানব সমাজে প্রজন্মকে নানাভাবে হিসাব করা হয়। যেমন: আমার দাদা এক প্রজন্ম, আমার বাবা আরেক প্রজন্ম এবং আমরা আরেক প্রজন্ম। সমাজের নারী কিংবা পুরুষভেদে প্রজন্ম হিসাব করা হয়। প্রজন্মের দ্বন্দ্ব বলতে মূলত এক পুরুষের সাথে তার পরবর্তী পুরুষের চিন্তা-চেতনা, বিশ্বাস, আদর্শ কিংবা মতের অমিলকে বোঝায়।প্রজন্মের দ্বন্দ্ব  নতুন কোনো বাক্য নয়। এর সূচনা শত-সহস্র বৎসর পূর্বে। এই দ্বন্দ্বের বহুবিধ কারণ রয়েছে। যেমন:

দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা:  মুরুব্বিরা সচরাচর স্যাকেলে স্বভাবকে প্রাধান্য দেয়। তারা তাদের চিন্তা চেতনা, ধর্মীয় কিংবা পারিবারিক বিশ্বাস, বহু বছর ধরে চলতে থাকা কোনো ঐতিহ্য বা বিশ্বাসকে আকড়ে ধরে জীবন পার করতে চায়। চলমান প্রক্রিয়া ও স্থিতিশীলতা তাদের পছন্দ।  কিন্তু তরুণ প্রজন্ম স্বাধীনচেতা। তারা পরিবর্তন চায়, পরিবর্ধন চায়। তারা যুক্তি-তর্ক বা দলিল ছাড়া সহজে কোনো কিছু মানতে রাজি না। তরুণ প্রজন্ম একে ব্যক্তিস্বাধীনতা হিসেবে মনে করলেও মুরব্বিরা একে চরম ধৃষ্টতা বা বেয়াদবি হিসেবে চিহ্নিত করে। যা পরবর্তীতে সমাজ, রাষ্ট, পরিবার সর্বক্ষেত্রে দ্বন্দ্বের জন্ম দেয়।

স্বাধীনচেতা মনোভাব: আমাদের মুরব্বিদের কাছে মনোভাব হল কেবল বহু বছর চলতে থাকা ধর্মীয় বিশ্বাস, রীতি-নীতি ও পারিবারিক নিয়ম কানুন। খোলামেলা চলাফেরা তাদের পছন্দ না। তারা সর্বদা এই বলয়ে আবদ্ধ থাকে। কিন্তু তরুণ প্রজন্ম পুরোপুরি বিপরীত। তারা নিঃশর্তে কোনো রীতি-নীতি মানতে চায় না। তথ্য প্রমাণ ছাড়া কোনো সত্যতা গ্রহণ করতে চায় না। তারা সর্বদা স্বাধীন মুক্তচিন্তক হতে চায় যেই চিন্তা প্রজন্মের দ্বন্দ্ব জিইয়ে রেখেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী।

নিজের আমিত্বকে বড় করে দেখা: মানুষ মাত্রই ভুল৷ ভুল স্বীকার করা দোষণীয় কিছু নয়। কিছু মানুষ নিজের ভুল বা কৃতকর্ম স্বীকার না করে উল্টো নিজের আমিত্বকে বড় করে দেখে। যাচাই বাছাই ছাড়া নিজেকে সঠিক বলে ধরে নেয়। নিজের আমিত্বকে বড় করে দেখতে গিয়ে প্রজন্মের দ্বন্দ্বকে সজাগ রাখে যুগের পর যুগ।

জীবনধারায় পরিবর্তন: বর্তমান প্রজন্মের সাথে পূর্বপুরুষদের জীবনধারায় ব্যাপক পরিবর্তন রয়েছে। পরিমিত খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা, চিন্তাশীলতা, যুক্তিবাদীতা, জানার আগ্রহসহ নানা কাজে পূর্বপুরুষদের সাথে বর্তমান প্রজন্মের অমিল রয়েছে। আমাদের পূর্বপুরুষরা কৃষি কাজ করেছেন, হাল চাষ করেছেন, কায়িক শ্রম করেছেন। অর্থাৎ তারা কঠোর পরিশ্রম করে জীবন ধারণ করেছেন। কিন্তু আধুনিকতার যুগে নব্য প্রজন্ম তুলনামূলকভাবে আরামপ্রিয়। যার কারণে দ্বন্দ্বের সূচনা আর সমাপ্ত হয় না।

জ্ঞানের ও বোঝের ভিন্নতা: একেকজনের জ্ঞানের পরিধি একেক রকম। সবাই সবকিছু জানবে এমন নয়৷ একজন যা জানে তা আমি জানি না। আবার আমি যা জানি তা অন্যরা নাও জানতে পারে। মানুষ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজের জ্ঞানের পরিধি থেকেই কথা বলে। এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে  যা বোঝাতে চায়; আরেকজন জ্ঞানের ভিন্নতার কারণে অনেক সময় তার উল্টো বোঝে। আমরা অন্যের মতকে বোঝার চেয়ে নিজের মতকে প্রাধান্য দিতে বেশি পছন্দ করি বলেই  এই দ্বন্দ্ব প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম চলমান থাকে।

পারিপ্বার্শিক প্রভাব: সামাজিক জীব হিসেবে মানুষ সমাজে বসবাস করে। সমাজে বসবাসরত মানুষের উপর সামাজিক প্রভাব বিদ্যমান থাকে। একজন শিশু যে সমাজে বসবাস করে সে সমাজের রীতি-নীতি, আচার-আচরণ তার প্রতি প্রভাব বিস্তার করে। অতীতে মানব সমাজে এমন অনেক রীতি ছিল যা বর্তমানে সমাজে নেই। আবার বর্তমান সমাজে এমন কিছু রীতি-নীতি আছে যা পূর্ব পুরুষরা কোনোদিন শুনেওনি। যার কারণে সামাজিকভাবেই একটি পার্থক্যের সৃষ্টি হয়। পূর্বপুরুষ তাদের রীতির বাইরে যেতে চায় না, অন্যদিকে নব্য প্রজন্ম তাদের রীতি ছেড়ে এমন রীতি গ্রহণ করতে ইচ্ছুক না যা তারা কখনো দেখেনি কিংবা যার কোনো সত্যতা আদৌ আছে কি না তা নিশ্চিত না। অতঃপর মতের অমিল চলমান থাকে।

প্রভাব বিস্তার: মানুষ মাত্রই প্রভাব বিস্তারকারী। সুযোগ পেলেই প্রভাব বিস্তার করতে চাইবে। পিতা চায় সন্তান তার কথা মতো চলুক, সন্তান চায় পিতা তার কথা মতো কাজ করুক। জীবনযাত্রায় কেউ কাউকে ছাড় দেয় না। একজন আরেকজনের প্রতি প্রভাব বিস্তার করতে চায় সর্বদা। বিশেষ করে যৌথ পরিবারগুলোতে এ সমস্যা ব্যাপক।  এই রীতি পরিবার থেকে পরিজন, সমাজ থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে আমরা প্রজন্মের দ্বন্দ্বকে জাগ্রত রেখেছি কালের পর কাল।

ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব: মানুষের উপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তারকারী কোনো দর্শন বা আদর্শ যদি থাকে তবে তা নিঃসন্দেহে তার ধর্ম ও ধর্মীয় আদর্শ। বর্তমান সমাজগুলো ধর্ম থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। অথচ সকল সমস্যার সমাধান ধর্মীয় আদর্শে পাওয়া যায়। সমাজের বসবাসরত প্রতিটি মানুষের প্রতি সমাজের কিছু হক্ব থাকে। যেমন: সমাজের প্রতি তার দায়িত্বশীলতা ও দায়বদ্ধতা।  পর্যাপ্ত ধর্মীয় জ্ঞানের অভাবে আমরা আমাদের রীতি-নীতি ভুলতে বসেছি। না বড়রা ছোটদের স্নেহ করছে, না ছোটরা বড়দের সম্মান করছে। যার কারণে একই ছাদে বসবাস করেও ভিন্ন চিন্তা ধারা লালিত হয়।

পারিবারিক শিক্ষার ভিন্নতা: মতের অমিল বা প্রজন্মের দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে পারিবারিক শিক্ষা ব্যাপক প্রভাব ফেলে। কোনো পরিবার যদি বাচ্চাদের ছোটবেলা থেকে আখলাক তথা উত্তম চরিত্র বা উত্তম আদর্শ শেখায়, তবে ঐ পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মও অনেকাংশে একই আদর্শের হবে। শিশুরা অনুকরণ করতে পছন্দ করে। যে পরিবারে বড়রা ছোটদের স্নেহ করে না, ছোটরা বড়দের সম্মান করে না, সে পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মও এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। যার কারণে যুগের পর যুগ পারিবারিক অমিল বা দ্বন্দ্ব থেকেই যায়৷

সাংস্কৃতিক প্রভাব: প্রযুক্তির আধুনিতার ছোঁয়ায় এখন সহজেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত এমনকি বিদেশের সাথেও অবাধে যোগাযোগ করা যাচ্ছে। ফলে একে অপরের মধ্যে সংস্কৃতির আদান-প্রদান হচ্ছে যা সমাজ জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। বর্তমান প্রজন্মে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির আদান প্রদান ঘটছে। নব্য প্রজন্ম নির্দিষ্ট কোনো সংস্কৃতির বেড়াজালে আটকে থাকে না। ফলে তারা বহু বছর ধরে চলমান পূর্বপুরুষের সংস্কৃতির শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। যে শত্রুতা চলতে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম পর্যন্ত। একই পরিবারে দেখা যায় একেকজনের চিন্তা চেতনা একেক রকম।  বিভিন্ন টিভি, ড্রামা, নাটক, সিনেমাগুলো সরাসরি পরিবারের উপর প্রভাব বিস্তার করে। এসব টিভি সিরিয়ালে আসক্ত হয়ে মানুষ তার দীর্ঘদিনের লালিত চিন্তা-চেতনা থেকে পুরোপুরি বের হয়ে যায়। যার ফলস্বরূপ আন্তঃকলহ লেগেই থাকে।

শিক্ষার প্রভাব: বলা হয় যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত, সে জাতি ততবেশি উন্নত। অতীতে বেশিরভাগ মানুষ অশিক্ষিত ছিল। তারা কেবল কাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করতো। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের বেশিরভাগ তরুণ শিক্ষিত। যার কারণে তাদের চিন্তা, চেতনা অন্যদের তুলনায় অনেক ভিন্ন ও উন্নত। একজন শিক্ষিত মানুষ যেরকম সুদূরপ্রসারী ও দূরদর্শীতাসম্পন্ন হয়; একজন অশিক্ষিত বা মূর্খ লোক কখনো সেরকম হয় না। যার কারণেে এক ছাদের নিচে থাকলেও উভয়ের মাঝে যোজন যোজন পার্থক্য থাকে।

বিশ্বায়নের প্রভাব: বিশ্বায়নের ফলে বর্তমান বিশ্বের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা যেন আমাদের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। বিশ্বায়নের ফলে বহির্বিশ্বের সাথে আমাদের আদান প্রদান চলছে প্রতিনিয়ত। বিশ্বায়ন মানব সমাজে নানাভাবে প্রভাব ফেলছে। যেমন- সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি। বিশ্বায়নের ফলে ভিনদেশী সংস্কৃতির আদান প্রদান বেড়েছে। যে সংস্কৃতি সরাসরি প্রভাব ফেলছে সমাজ, পরিবার তথা  রাষ্ট্রে। মানুষ স্বভাবতই আপন সংস্কৃতিপ্রেমী বলেই ভিনদেশী সংস্কৃতি মেনে নিতে পারে না।

আদর্শিক পার্থক্য: কোনো ব্যক্তি বাংলা নিয়ে পড়াশোনা করলে তার বাংলার জ্ঞান বেশি থাকে। আর কেউ যদি ধর্মীয় বিষয় নিয়ে পড়ালেখা করে তবে তার ধর্মীয় জ্ঞান বেশি থাকে। তারা উভয়ে তাদের নির্দিষ্ট পঠিত বিষয়ের আদর্শকে ধারণ করে। কিন্তু সমস্যা তখন হয়; যখন তারা তাদের লালিত আদর্শ সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, কিংবা কেবল নিজের আদর্শ দিয়েই সবকিছু বিবেচনা করে।  এই আদর্শিক দ্বন্দ্ব চলছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

নাম: আরিফুল কাদের

শিক্ষার্থী : চট্টগ্রাম কলেজ

ঠিকানা: চকবাজার, চট্টগ্রাম

ইমেইল :Arifulkader487@gmail.com

মোবাইল নং : 01609-518172

 

লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৩ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে দৈনিক স্লোগান পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!