শেষ প্রশ্ন

শেষ প্রশ্ন
মিনিট পঁচিশ বাকি।
নীলিমা ঘড়ির দিকে তাকাল। তারপর জানালার বাইরে। সকালের রোদ এখনও কচি, ভিজে ভিজে। গাছের ডগায় একটা বুলবুলি এসে বসল, ডানা মেলে দিল, আবার উড়ে গেল।
হাসপাতালের এই ঘরে গত তিন মাস ধরে সে আসছে। প্রথম দিকে এসে সে রোজ এক ঘণ্টা কাটাত। তারপর ধীরে ধীরে সময় কমতে লাগল। আজ শুধু এই পঁচিশ মিনিট।
বিছানায় শুয়ে থাকা মানুষটার দিকে তাকাল সে। চোখ বুজানো। নাক-মুখে অক্সিজেনের টিউব। হাতের পিঠে স্যালাইনের লাইন। মানুষটা এখন অনেক ছোট হয়ে গেছে। আগে যে লম্বা, বলিষ্ঠ মানুষটাকে চিনত, আজ তার হাড়ের বুনোট যেন চামড়ার নিচে বেরিয়ে আসছে।
“বাবা,” ডাকল নীলিমা। গলা শুকিয়ে কাঠ।
কোনো সাড়া নেই।
তিন মাস আগে ডাক্তার যখন বলল, “আপনার বাবার আর সময় বেশি নেই,” তখন নীলিমা ভেবেছিল সময় মানে সপ্তাহখানেক। কিন্তু বাবা টিকে গেল। টেনে টেনে বাঁচল। যেন কিছু একটা বাকি রেখে গেছে, যেটা শেষ না করে যেতে চাইছে না।
নীলিমা টেবিলের ওপর রাখা পানির গ্লাসটা নিল। কটন দিয়ে বাবার ঠোঁট ভিজিয়ে দিল। মানুষটার চোখের পাতা নড়ল। আস্তে আস্তে খুলল।
“আমি আছি, বাবা,” বলল নীলিমা।
বাবা তাকালেন। সেই চোখে এখন চেনার কোনো দীপ্তি নেই। শুধু শূন্যতা। নীলিমা জানে, এই চোখ তাকে আর চিনতে পারে না। গত এক মাস ধরে চিনতে পারেনি। মাঝে মাঝে চিনত, আবার হারিয়ে যেত।
“আমি নীলিমা। আপনার মেয়ে।”
বাবা কিছু বলার চেষ্টা করলেন। গলা থেকে বেরোল কর্কশ আওয়াজ। নীলিমা কান পাতল।
“চা…” বললেন বাবা।
নীলিমা থমকে গেল। তিন বছর আগের একটা সকালে হঠাৎ করে চায়ের কথা মনে পড়ল। বাবা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বলেছিলেন, “তোর হাতের চায়ের স্বাদ আর কারও হাতে নেই।” সেদিনই বিকেলে স্ট্রোক করেছিল বাবা। তারপর থেকে এক হাত অবশ। চায়ের কাপ ধরতে পারত না।
“আমি নিয়ে আসছি,” বলল নীলিমা।
হাসপাতালের ক্যান্টিনে গিয়ে চা বানাল। বাসায় যেভাবে বানাত, ঠিক সেভাবে। দুধ কম, চিনি এক চামচ, এলাচটা একটু বেশি করে। পেপার কাপে নিয়ে এল।
বাবাকে সামান্য উঠিয়ে বসাল। হাত কাঁপছে। চায়ের কাপ দেখে তার চোখে যেন একটু চমক লাগল। নীলিমা নিজের হাতে কাপ নিয়ে বাবার ঠোঁটে ধরল। এক চুমুক। আরেক চুমুক।
“কেমন হলো?”
বাবা তাকালেন। এই প্রথম এই তিন মাসে নীলিমার দিকে তাকালেন যেন দেখার জন্য। চিনতে পারার জন্য।
“তোর হাতের…” বলতে গিয়ে থেমে গেলেন।
নীলিমার চোখ ছলছল করে উঠল। সে বাবার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। হাতটা হাড় হয়ে গেছে। আগে এই হাতটা ছিল বিশাল। স্কুলে প্রথম বার পরীক্ষায় পাস করে বাড়ি ফিরে এই হাতটা মাথায় বুলিয়েছিল। কলেজে ভর্তি হতে গিয়ে এই হাতটাই জড়িয়ে ধরেছিল। বিয়ের দিন এই হাতটায় চোখের জল মুছেছিল বাবা।
“বাবা,” বলল নীলিমা, গলা ভেজা, “আমাকে চিনতে পেরেছেন?”
বাবা চোখ বুজলেন। অনেকক্ষণ পর খুললেন। তাকালেন।
“মা কোনদিন আসবে?” জিজ্ঞেস করলেন।
নীলিমার বুকে যেন কেউ ছুরি বসিয়ে দিল। মা মারা গেছেন পনেরো বছর। বাবা কখনো ভুলে যাননি। কিন্তু আজ ভুলে গেলেন।
“মা…” নীলিমা থামল। বলতে গিয়ে নিজের কণ্ঠ শুনতে পেল, “মা আসছেন। কিছু দিনের মধ্যে।”
বাবা মৃদু হাসলেন। “বলো দেরি না করে। অনেক দিন… অনেক দিন দেখিনি তাকে।”
নীলিমা মাথা নিচু করল। চোখের জল বাবার হাতের ওপর গড়িয়ে পড়ল। বাবা টের পেলেন। আস্তে আস্তে হাতটা চেপে ধরলেন।
“কাঁদিস না,” বললেন, “আমি আছি। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
নীলিমা মাথা তুলল। দেখল বাবার চোখে এক ঝলক চেনার আলো। সেই চেনা আলো। যে আলো দেখে বোঝা যায়— তুমি কারও পৃথিবীর অংশ।
“বাবা,” বলল নীলিমা, “আমি নীলিমা।”
বাবা কিছু বললেন না। শুধু তাকিয়ে রইলেন। তারপর আস্তে আস্তে হাতটা ছেড়ে দিলেন। চোখ বুজলেন।
নীলিমা জানল, এইবার তিনি চলে যাচ্ছেন। সেই দূর দেশে। যেখানে আর চা বানিয়ে দেওয়া যায় না। আর হাত ধরে রাখা যায় না।
মিনিট শেষ।
ঘড়ির কাঁটায় পঁচিশ মিনিট পার। নীলিমা ওই ঘরে দাঁড়িয়ে। বাবা আর শ্বাস নিচ্ছেন না। টিউবের ভেতর বাতাস স্থির। মনিটরে সোজা লাইন।
সে জানল, বাবা চলে গেছেন। সেই প্রশ্নটা রেখে গেছেন— “মা কখন আসবে?”
নীলিমা বুঝল, বাবার শেষ প্রশ্নটা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর প্রশ্ন। কারণ এই প্রশ্নের মানে ছিল— তিনি এমন এক জায়গায় যাচ্ছেন, যেখানে মা আছেন। আর এখানে, এই পৃথিবীতে, যেখানে নীলিমা আছে।
সে বাবার ঠান্ডা হয়ে আসা হাতটা নিজের দুই হাতে নিয়ে মাথায় রাখল। অনেকক্ষণ।
বাইরে বুলবুলিটা আবার এসে জানালায় বসল। ডানা মেলে দিল। এবার উড়ে গেল অনেক দূরে।
নীলিমা চোখ মুছল। চায়ের কাপটা টেবিলে পড়ে ছিল। অর্ধেক খালি।

