ইন্টারনেট ব্যবহারে সচেতনতা প্রয়োজনীয়তা ও করণীয় ডিজিটাল যুগের দ্বৈত চরিত্র

বিশ্ব আজ তথ্যপ্রযুক্তির এক অভূতপূর্ব বিপ্লবের সাক্ষী। বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ইতিমধ্যে ১৩ কোটি ছাড়িয়েছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭৫ শতাংশ। স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা এবং তুলনামূলক কম মূল্যের ডেটা প্যাকেজের কারণে গ্রাম-শহর নির্বিশেষে ইন্টারনেট এখন হাতের মুঠোয়। এই ব্যাপক সংযোগ যেমন জ্ঞানচর্চা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা এবং যোগাযোগে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে, তেমনি ডিজিটাল জগতের অন্ধকার দিকগুলোও ক্রমশ প্রকট আকার ধারণ করছে। সাইবার অপরাধ, ভুয়া তথ্যের বিস্তার, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস, শিশুদের জন্য অনলাইন ঝুঁকি—এসব সমস্যা দিনদিন উদ্বেগজনক আকার ধারণ করছে। বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সাইবার অপরাধের অভিযোগ বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে ইন্টারনেট ব্যবহারে সচেতনতা আর শুধু প্রয়োজনীয় নয়, এটি অনিবার্য।
সাইবার নিরাপত্তা হুমকির ক্রমবর্ধমান রূপ
ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হচ্ছে সাইবার অপরাধ। প্রতারণা, পরিচয় চুরি, হ্যাকিং, অনলাইন জালিয়াতি—এসব ঘটনা এখন নিত্যদিনের। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শুধু ২০২৪ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশে সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত ১০ হাজারের বেশি অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে মোবাইল ব্যাংকিং ও ই-কমার্স লেনদেন বাড়ার সাথে সাথে আর্থিক প্রতারণার ঘটনাও বেড়েছে কয়েকগুণ। অজ্ঞাত নম্বর থেকে আসা ফোনকল, মেসেজ বা ইমেইলের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে। অনেকে ফিশিং লিংকে ক্লিক করে নিজ অজান্তেই তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য দিয়ে বসছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে প্রতারণার পরিমাণ গত বছর ২০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও নিরাপদ ব্যবহারের দক্ষতা ততটা বাড়েনি।
ভুয়া সংবাদ ও গুজবের সামাজিক ক্ষয়ক্ষতি
ইন্টারনেটের সবচেয়ে বিধ্বংসী দিক হচ্ছে ভুয়া তথ্যের দ্রুত বিস্তার। ফেসবুক, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্মে গুজব ছড়ানোর গতি এত দ্রুত যে তা মাঝে মাঝে সামাজিক অস্থিরতা ডেকে আনে। সম্প্রতি বিভিন্ন জেলায় শিশু উদ্ধারকারী চক্রের গুজবে নিরপরাধ মানুষ পেটানোর ঘটনা যেমন ঘটেছে, তেমনি ধর্মীয় উস্কানিমূলক ভিডিও কেউ কেউ ছড়িয়ে দিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের চেষ্টা করছে। তথ্য যাচাইকরণ সংস্থাগুলোর গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের প্রায় ৬০ শতাংশ শেয়ার করার আগে তথ্যের সত্যতা যাচাই করেন না। ফলাফল: সামাজিক উত্তেজনা, পারিবারিক কলহ, এমনকি প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটছে। জেনারেল ইকোনমিক ডিভিশনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, অনলাইনে গুজবের কারণে ২০২০-২০২৩ সময়কালে অন্তত ১৫ জন নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তাহীনতা
অ্যাপ ডাউনলোড করতে, অনলাইন ফর্ম পূরণ করতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রোফাইল খুলতে আমরা অজান্তেই ব্যক্তিগত তথ্য উন্মুক্ত করে দিচ্ছি। জাতীয় তথ্য প্রযুক্তি পরিষদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৮৫ শতাংশ স্মার্টফোন ব্যবহারকারী অ্যাপগুলোকে অপ্রয়োজনীয় অনুমতি দিয়ে থাকেন। ফলে হ্যাকারদের পক্ষে সেই তথ্যে পৌঁছানো সহজ হয়ে যায়। ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, লোকেশন—এই সংবেদনশীল সুবিধাগুলো কোন অ্যাপ কেন ব্যবহার করছে, তা আমরা যাচাই করি না। সম্প্রতি একাধিক ফিনটেক কোম্পানির তথ্য ফাঁসের ঘটনা প্রমাণ করে, সংরক্ষিত তথ্যও কতটা অনিরাপদ হতে পারে। ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হলে তা শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, মানসিক ও সামাজিকভাবে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের জন্য অনলাইন ঝুঁকি
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হচ্ছে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের ইন্টারনেট ব্যবহার। অভিভাবকদের অনেকেই সন্তানকে ফোন বা ট্যাব দিয়ে ব্যস্ত রাখতে অভ্যস্ত, কিন্তু তারা কী কনটেন্ট দেখছে, কার সাথে যোগাযোগ করছে—তা পর্যবেক্ষণ করেন না। ইউনিসেফের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের ১২-১৭ বছর বয়সী ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৩৫ শতাংশ অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য অনুপযুক্ত কনটেন্টের সম্মুখীন হয়েছে। সাইবার বুলিং, অনলাইন শ্লীলতাহানি, শিশু পর্নোগ্রাফি—এসব অপরাধ দিনদিন জটিল আকার ধারণ করছে। সম্প্রতি জাতীয় শিশু অধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অনলাইনে শিশু নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে ৫০ শতাংশেরও বেশি। অভিভাবকদের উদাসীনতা, শিশুদের অনলাইন বিশ্ব সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং পর্যাপ্ত অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ সফটওয়্যার ব্যবহার না করাই এর প্রধান কারণ।
মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব
অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহার, বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।
ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে অন্যের সাথে নিজেকে তুলনা করার মানসিকতা, লাইক ও কমেন্টের প্রতিযোগিতা, সাইবার বুলিং—এসব বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, এমনকি আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটাচ্ছে। বাংলাদেশ মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সমীক্ষা বলছে, নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহারকারী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ৪০ শতাংশেরই মাঝারি থেকে গুরুতর মানসিক চাপ রয়েছে। বিশেষ করে রাতে দীর্ঘক্ষণ ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে, যা দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক ও মানসিক উভয় সমস্যার জন্ম দিচ্ছে। ইন্টারনেটের আসক্তি আসলে একটি নীরব মহামারি, যা আমাদের সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পারছি না।
প্রয়োজনীয় সচেতনতামূলক পদক্ষেপ
ইন্টারনেটের এই বহুমাত্রিক ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত ও বহুস্তরীয় সচেতনতা কার্যক্রম।
প্রথমত, পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে। অভিভাবকদের উচিত সন্তানের ইন্টারনেট ব্যবহারের সময় ও ধরন সম্পর্কে সচেতন থাকা, প্রয়োজনীয় অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ সফটওয়্যার ব্যবহার করা এবং অনলাইন ঝুঁকি সম্পর্কে খোলামেলা আলোচনা করা। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট নিরাপত্তা বিষয়ক আনুষ্ঠানিক শিক্ষা চালু করা জরুরি। শুধু কম্পিউটার শিক্ষা নয়, কীভাবে নিরাপদে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হয়—সেটা পাঠ্যসূচির অংশ হওয়া দরকার। তৃতীয়ত, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর নিজেদের দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। ভুয়া তথ্য ও গুজব ছড়ানোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া এবং প্ল্যাটফর্মগুলোকে আরও জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।
এছাড়া ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমরা কিছু সহজ অভ্যাস গড়ে তুলতে পারি। যেমন: শক্তিশালী ও অনন্য পাসওয়ার্ড ব্যবহার, দ্বি-স্তরীয় নিরাপত্তা চালু করা, অপরিচিত লিংকে ক্লিক না করা, অ্যাপের অনুমতি যাচাই করে নেওয়া, সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যক্তিগত তথ্য সীমিত রাখা, নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তথ্য যাচাই করা—এসব অভ্যাস নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের ভিত্তি। সরকারিভাবে সাইবার নিরাপত্তা আইনের কার্যকর প্রয়োগ, ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধির জন্য জাতীয় কর্মসূচি এবং সাইবার অপরাধের দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য স্পেশালাইজড ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যেতে পারে।
সচেতনতা—একটি জাতীয় প্রয়োজনীয়তা
ইন্টারনেট ব্যবহারে সচেতনতা আজ শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় নয়, এটি একটি জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন। ডিজিটাল বাংলাদেশের অভিযাত্রা এখন স্মার্ট বাংলাদেশের পথে। প্রযুক্তির সক্ষমতা থাকলেও ব্যবহারকারীর অদক্ষতা ও অসচেতনতা সেই অগ্রযাত্রায় বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সচেতন ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে অন্তত ৭০ শতাংশ সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য বাস্তবায়নে তাই প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা ও সচেতনতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। বাড়ি, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস—সর্বত্রই এই সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে হবে। কারণ, ডিজিটাল জগৎ একটি উন্মুক্ত সমুদ্র; এর গভীরতা যেমন জ্ঞান ও সুযোগের, তেমনি রয়েছে অগণিত অজানা ঝুঁকিও। সচেতনতা আমাদের সেই ঝুঁকি মোকাবিলার একমাত্র কার্যকর নৌকা। ইন্টারনেট ব্যবহারে সচেতনতা বাড়াতে পারলেই আমরা সত্যিকার অর্থে প্রযুক্তির পূর্ণ সুফল পেতে পারব এবং একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ ডিজিটাল সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম হব।

