ডিজিটাল যুগে বাংলার ভবিষ্যৎ

সাবিহা তারান্নুম মিম : বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। কিন্তু বর্তমানে আন্তর্জাতিক কিংবা দ্বিতীয় ভাষা ইংরেজি শেখার প্রবণতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও ইংরেজি ভাষাকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। অভিভাবকরা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলার তাগিদে সন্তানদের ইংরেজি ভার্সনে বা ইংরেজি মাধ্যমে পড়াতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। যা আমাদের মাতৃভাষাকে এক প্রকার কোণঠাসা করে ফেলছে। ইংরেজি ভাষার প্রভাবে বাংলা ভাষার অনেক শব্দের ব্যবহার বাদ পড়ে যাচ্ছে। একাধিক উচ্চারণেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শিশুরা বাংলায় কথা বলার সময়ও ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। এই অভ্যাসের ফলেই তাদের যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ‘Banglish’ এর ব্যবহার লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাংলা শব্দ ইংরেজি বর্ণমালায় উচ্চারণ অনুযায়ী লেখার ফলে শুদ্ধ বানান চর্চা ও উচ্চারণের প্রাকৃতিকতা নষ্ট করছে । শিক্ষার্থীরা বাংলা অক্ষর ব্যবহার না করে রোমান হরফে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। রোমান হরফ হচ্ছে বাংলা শব্দ বা বাক্য ইংরেজি বর্ণমালায় লেখা। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে,শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ অনলাইনে রোমান হরফে বাংলা লিখতে বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করছে।
বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। সেসব জায়গায় যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে অনেকেই বাংলা ভাষাকে ইংরেজি বর্ণমালায় লিখতে গিয়ে মিশ্র একটি সংকর ভাষা তৈরি করে ফেলেছে। এই বাংলা ভাষার মধ্যে ইংরেজি মিশিয়ে লেখার ব্যবহারের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার দরুণ বাংলা ভাষা তার আসল মাধুর্য হারিয়ে ফেলছে; হারিয়ে যাচ্ছে উচ্চারণের নির্মলতা। বৈচিত্র্যময় বাংলা বানান নীরবে ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ছে; বিলুপ্তির পথে যাচ্ছে শুদ্ধ বানান চর্চার অভ্যাস।
প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে উপমহাদেশে ব্রাহ্মী লিপির জন্ম হয়। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের ইন্দো-আর্য শাখার অন্তর্গত আদি ভাষার বহু বিবর্তনের পরিণত রূপ বাংলা ভাষা। বর্তমানে বাংলা ভাষায় কথা বলে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ। মোট মাতৃভাষী জনসংখ্যার ভিত্তিতে পৃথিবীর বৃহত্তম বাংলা ভাষার স্থান ষষ্ঠ। বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায় ১৯৫৬ সালে। যার অতীত বৃত্তান্তে রয়েছে এক রক্তক্ষয়ী ইতিহাস। পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলাদেশ এমন এক দেশ, যে দেশে মায়ের ভাষায় কথা বলতে পারার অধিকার রক্ষায় বাংলার দামাল ছেলেরা অবলীলায় জীবন দিয়েছিলেন। আমাদের ‘৫২ এর ভাষা আন্দোলনের প্রধান চেতনা ছিল ‘ভাষাপ্রেম’ ও মূল প্রেরণা ছিল ‘মাতৃভাষা’। ১৯৪৮ সালে দাবির সূচনা হলেও জাতি ভাষার অধিকার পায় ১৯৫২ সালের রক্তাক্ত ইতিহাসের মধ্য দিয়ে। সেই ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা স্বীকৃতি অর্জন করে। তাদের এই ত্যাগ যুগে যুগে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে স্মরণ করায় মাতৃভাষা রক্ষার গুরুত্ব।
ভাষার এই মাসে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা থেকে আমাদের দেশের মানুষের উপলব্ধি করতে হবে ভাষার সঠিক ব্যবহার এবং শুদ্ধ বানান চর্চার গুরুত্ব। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ইংরেজি অভিধানের পাশাপাশি বাংলা অভিধানের গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে। যাতে তারা ডিজিটাল যুগের যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে সংকর ভাষার ব্যবহার কমিয়ে শুদ্ধ বাংলা চর্চায় আগ্রহী হয়ে ওঠে।
ভাষার মাসে মাতৃভাষার শুদ্ধতা রক্ষার আহ্বান আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সকলের একত্রিত প্রচেষ্টায় নতুন প্রজন্মকে বাংলার শুদ্ধ ব্যবহার শেখাতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের শিশুদের বাংলা গল্প পড়ানো, বাংলায় প্রবন্ধ, কবিতা ও গল্প লেখার আগ্রহ তৈরি করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সঠিক বানান ব্যবহারের চর্চায় মনোযোগ বৃদ্ধি করা গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের বাংলা ভাষায় পড়তে ও লিখতে উৎসাহিত করতে হবে। সেই লক্ষ্যে আধুনিক অ্যাপের যথোপযুক্ত ব্যবহার করে শিশুদের বাংলা পড়ার অভ্যাস তৈরি করা যেতে পারে। অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য শুদ্ধ বাংলা চর্চার বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হবে। অনলাইনে বিভিন্ন লেখালেখির প্রতিযোগিতার আয়োজন আমাদের নতুন প্রজন্মকে মাতৃভাষার প্রতি যত্নশীল করতে সাহায্য করবে। সৃজনশীলতা প্রকাশের সুযোগ তাদের মনে ভাষাপ্রেম তৈরি করবে। তাদের উৎসাহ বৃদ্ধিতে বিজয়ীদের পুরস্কৃত করলে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। এসব কার্যক্রম তাদের মধ্যে মাতৃভাষার প্রতি নৈতিক দায়িত্ববোধ তৈরি করবে। শহীদদের মহান আত্মত্যাগ স্মরণ করে মাতৃভাষার প্রতি সচেতনতা সৃষ্টি করতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে ভাষা শিক্ষা প্রচার করতে হবে।তরুণদের বাংলা ভাষায় আগ্রহী করতে বাংলায় বিভিন্ন ইবুক ওয়েবসাইটের ব্যবহার বৃদ্ধি করা। সেই সব ওয়েবসাইটে বাংলা ভাষায় রচিত ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের উপর বই, বিভিন্ন উপন্যাস, গল্প বা কবিতা সহজলভ্য হবে। বাংলার বিভিন্ন বিখ্যাত বইয়ের অনলাইন সংস্করণ চালু করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আধুনিক সৃজনশীল চিন্তাভাবনার বিকাশে বাংলা ভাষায় তৈরি বিভিন্ন শিক্ষামূলক ভিডিও তাদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করবে। শুদ্ধ বাংলা শেখায় সাহায্য করবে। এছাড়াও বাংলা বানান চর্চায় বাংলা ভাষার বিভিন্ন মেধা যাচাইয়ের খেলার ব্যবহার বানান ও শব্দভাণ্ডার উন্নত করে। প্রযুক্তির যুগে অনলাইনে আয়োজিত বিভিন্ন এ সকল কার্যক্রম বাংলা চর্চার যাত্রা আরো সহজ করে তোলে। পাশাপাশি বাংলা ভাষায় ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করার লক্ষ্যে অনলাইনে বিভিন্ন পাঠচক্র গঠন। যা বাংলা ভাষার ব্যবহারের প্রসার ঘটাতে ভূমিকা রাখবে।আজকের শিশু কিশোরদের শুদ্ধ বাংলা চর্চার প্রতি যত্নবান করে তোলা আমাদের সবার কর্তব্য। শহীদের রক্তে অর্জিত ভাষার মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের প্রজন্মের নৈতিক অঙ্গীকার। মনে রাখতে হবে, ভবিষ্যতের এই ডিজিটাল প্রজন্মের হাতেই বাংলা ভাষার আগামীর পথ চলা তাই এই প্রজন্মকে বাংলা ভাষায় আগ্রহী এবং সঠিক বাংলা চর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তবেই বাংলা ভাষার সম্মান রক্ষা পাবে এবং বাংলা ভাষা একদিন পৃথিবীর বুকে সমাদৃত হবে।
সাবিহা তারান্নুম মিম
সমাজকর্ম বিভাগ
( ইডেন মহিলা কলেজ শাখা)

