বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ: উন্নয়নের স্বীকৃতি নাকি নতুন চ্যালেঞ্জ?

Author

সাবিহা তারান্নুম মিম , ইডেন মহিলা কলেজ

প্রকাশ: ৫ এপ্রিল ২০২৬ পাঠ: ২৮ বার

সাবিহা তারান্নুম মিম:  একটি জাতির ইতিহাসে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ কেবল একটি অর্থনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং এটি আত্মমর্যাদার প্রতীক। দীর্ঘ কয়েক দশকের সংগ্রাম, শ্রম আর ধৈর্যের ফসল হিসেবে বাংলাদেশ আজ স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তালিকা থেকে বেরিয়ে মধ্যম আয়ের পথে পা দিয়েছে। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে এটি বাংলাদেশের এক বিশাল অর্জন। তবে এই অর্জনের কয়েনের উল্টো পিঠে আছে গভীর বাস্তবতা। বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক দুরাবস্থা, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা কিংবা অপরিকল্পিত প্রকল্প বাস্তবায়নে ঋণের বোঝা যার জন্য দায়ী। ২০২৬ সালের নভেম্বর মাসে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে অধিভুক্ত করার কথা উল্লেখ করেছে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের যোগ্যতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ। স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশ এলডিসি তালিকাভুক্ত হয় ১৯৭৫ সালে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উত্তরণের লক্ষ্যে বিগত সরকারের উপস্থাপনের আলোকে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নির্দিষ্ট সূচকে মান অর্জনে সক্ষম হয়। কিন্তু পর্যালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে উঠে আসে ভিন্ন চিত্র। দেশ স্বাধীনতা অর্জন থেকেই বিধ্বস্ত অর্থনৈতিক অবস্থা কাটিয়ে উঠতে প্রতিবার সরকারকে সম্মুখীন হতে হয়েছে চ্যালেঞ্জের। সবশেষ ‘২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তীতে অস্থিতিশীল অর্থনৈতিক অবস্থা তুলে ধরেন তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বর্তমানে ২০২৬ সালে নব্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারও মুখোমুখি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দুরাবস্থার। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ আয় পোশাক খাতে। বিশ্ব ব্যাংকের মতে, বাংলাদেশ যদি এলডিসি থেকে বেরিয়ে যায় তবে বাণিজ্য সুবিধা হারানোর মধ্য দিয়ে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে যাবে। তাই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সময়োপযোগী পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা। এছাড়াও নব্য গঠিত সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের একমাস অতিবাহিত, তাদের প্রতিটি পদক্ষেপের বাজেটের গ্রহণযোগ্যতা অর্থনীতিবিদদের মনিটরিং করতে হবে। বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রভাব ফেলছে। দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত প্রবাসীদের আয়। তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটপূর্ণ অবস্থায় প্রবাসীরা দেশে ফিরে আসতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। ফলে এই খাতে আয় হ্রাসের আশঙ্কা উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি এদেশের অধিকাংশ পরিবারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কুণ্ঠিত। সেক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির চাপ এদেশের মানুষের জীবনকে অসহনীয় করে তুলবে। এমতাবস্থায় নব্য গঠিত সরকারের কাছে জনগণের কাম্য প্রতিটি পদক্ষেপ বাস্তবায়নে অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বনের মধ্যদিয়ে দায়িত্বশীল আচরণ প্রদর্শন। সামগ্রিক অবস্থার যথার্থ বিশ্লেষণ পূর্বক উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার লক্ষ্যে কতটুকু যুক্তিযুক্ত তার পর্যালোচনা জনগণের নিকট তুলে ধরা। অর্থাৎ বাস্তব চিত্রে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে অধিভুক্ত হলে যেসব ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করবে সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা প্রদান। একদিকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বিনিয়োগের সুবিধা বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কতটুকু কার্যকরী তার মাত্রা নিরুপন। অন্যদিকে, রপ্তানি খাতে যে বিরূপ প্রভাব পড়বে সে সংকটপূর্ণ অবস্থাও তুলে ধরা। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়। উচ্চ শুল্কের প্রভাবে রপ্তানি খাতের মত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক আয়ের উৎসের প্রতিবন্ধকতা মূলত দেশে অর্থনীতির উন্নতি ধারায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে। বিশ্ববাজারের রপ্তানি খাতে বাংলাদেশ যে সুবিধা ভোগ করে থাকে তা থেকে বঞ্চিত হলে যে সমস্যার সৃষ্টি হবে তা মোকাবেলা করার অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। উপরন্তু শুল্ক যোগ হওয়ার মতো নানামুখী সংকটপূর্ণ অবস্থা সৃষ্টি করবে পণ্যের উপর বাড়তি মূল্য। পরিশেষে বছরের শেষার্ধে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উন্নীত হওয়ার সময়সীমা যদি পেছানো না হয় তা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার লক্ষ্যে সরকারকে নিয়ন্ত্রিত পরিকল্পনা ও সঠিক প্রকল্পের বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে উন্নয়ন প্রক্রিয়া কার্যকর করা। দেশের মাথাপিছু আয় এর পাশাপাশি অন্যান্য সূচক হিসেবে শিক্ষার মানদন্ড, পরিবেশ সংরক্ষণসহ সকল ক্ষেত্রে সরকারের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ। দেশের ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থা মেরামত করে দেশীয় শিক্ষার মান বিশ্ব মঞ্চে স্বীকৃতির যোগ্যতা অর্জনের লক্ষ্যে মনোযোগী হওয়া। বাংলাদেশ আ্যস এ ফ্রান্টিয়াল মার্কেট গ্রোথ, ইনফ্রাস্ট্রাকচার, গ্যাপস এন্ড ইনভেস্টমেন্ট রিস্ক শীর্ষক একটি প্রতিবেদনে উঠে আসে, বাংলাদেশের ১৭ কোটির অধিক জনসংখ্যার মধ্যে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যাই বেশি। কিন্তু শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার প্রায় ৫৮.৯ শতাংশ যা পূর্বের তুলনায় নিম্নগামী। এক্ষেত্রে প্রধান কারণ নারীদের অংশগ্রহণের হার কমে যাওয়া। তাই প্রয়োজন অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে মেয়েদের শিক্ষার হার বৃদ্ধি করা। তাদের স্বনির্ভর ও কর্মক্ষম করে তুলতে সর্বোচ্চ সুযোগ প্রদান, প্রশিক্ষণ ও ভাতার মতো কার্যক্রম পরিচালনা করা। তদুপরি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হয়েছে দেশের উৎপাদন খাত। বিশেষত অভ্যন্তরীণ সম্পদের পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকারকে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র খুঁজে নতুন আয়ের উৎস নিয়ে কাজ করতে হবে। সেই সাথে এলডিসি ভুক্ত দেশ হিসেবে বিশ্ববাজারে যে সকল সুবিধা প্রদান করা হয় তার যথার্থ প্রয়োগ করে অর্থনৈতিক অবস্থা শক্তিশালী করা। বিশ্ব বাণিজ্য নীতি ও শুল্ক হারের উপর ভিত্তি করে চাহিদার ধরন অনুযায়ী অন্যান্য খাতেও কাজ করতে হবে। বিশ্বের অস্থিতিশীল অবস্থায় দেশের উন্নতির ধারা রক্ষায় চামড়া খাত, কৃষি খাত, ফার্মাসিউটিক্যাল খাত, আইসিটি খাতেও সক্রিয়তায় সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে পরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। একই সঙ্গে, দূর্নীতি ও প্রশাসনিক অকার্যকারিতা কঠোরভাবে দমন করতে হবে। যা সরকারের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষমতা নিশ্চিত করবে এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করবে। সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই বাংলাদেশ কেবল উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জন করবে না বরং সেই মর্যাদাকে দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িতের সঙ্গে ধরে রাখার সক্ষমতাও অর্জন করবে। প্রগতিশীল উদ্যোগের ধারাবাহিক বাস্তবায়নই হবে বাংলাদেশের স্থায়ী উন্নয়নের ভিত্তি। যা বাস্তবিক অর্থেই বাংলাদেশকে সামনের দিনে উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত দেশের দিকে ধাবিত করবে।

 

ইডেন মহিলা কলেজ, (সমাজকর্ম বিভাগ)

 

লেখক: সদস্য, ইডেন মহিলা কলেজ।
এই লেখাটি ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বাংলাপত্র (ম্যাগাজিন) পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!