বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

অনলাইন বন্ধুত্ব: ঝুঁকি নাকি সম্ভাবনার দুয়ার

Author

মোঃ আরিফুল ইসলাম রাফি , জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ পাঠ: ৩০ বার

ইন্টারনেটের আগমনে পৃথিবী যে কতটা বদলে গেছে তা আজ আমাদের নতুন করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। মানবসভ্যতার ইতিহাসে খুব কম প্রযুক্তিই মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ককে এতটা প্রভাবিত করেছে, যতটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম করেছে। পৃথিবীর একটি প্রান্তে বসে থাকা একজন মানুষ মুহূর্তের মধ্যে অন্য প্রান্তের অচেনা কাউকে বন্ধু হিসেবে পেতে পারে, এ যেন জাদুর মতো। এই ‘অনলাইন বন্ধুত্ব’ আধুনিক জীবনের একটি নতুন অধ্যায়, যেখানে মানুষ সম্পর্ক, আবেগ, বিশ্বাস, সমর্থন, মূল্যবোধ- সবকিছুই স্ক্রিনের মাধ্যমে অনুভব করছে। অথচ একসময় বন্ধুত্ব মানেই ছিল একই পাড়ায় থাকা, একসঙ্গে স্কুলে যাওয়া, মাঠে খেলা বা চায়ের দোকানে আড্ডা দেওয়া। প্রযুক্তি সেই পরিচিত ছবিতে বিশাল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। এখন বন্ধুত্ব গড়ে উঠছে পোস্টের কমেন্টে, ইনবক্সের কথায়, গ্রুপে আড্ডায়, ভিডিও কলের হাসিতে কিংবা সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি প্রোফাইলের পেছনে লুকানো একটি গল্পে।

 

মানুষ কেন অনলাইনে বন্ধুত্ব করতে আগ্রহী হয়, এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়, কিন্তু বাস্তব। আজকের পৃথিবীতে একাকিত্ব নামক মানসিক সমস্যা ভয়াবহভাবে বেড়ে গেছে। যে মানুষ বাইরে থেকে উজ্জ্বল, চঞ্চল, সামাজিক; তার ভেতরেও গভীর নিঃসঙ্গতা বাস করতে পারে। বাস্তব জীবনে সবসময় কথা বলার মতো কেউ পাশে থাকে না, অনেক সময় পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গেও নিজের গভীর কথা বলা যায় না। অথচ অনলাইনে মানুষ নিজের কথা খুলে বলতে পারে অনেক সহজে। এখানে নিজের পরিচয়, শারীরিক গঠন, আর্থিক অবস্থা, সামাজিক পরিচয়- কোনোটিই বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। এখানে মূল্যায়িত হয় কথা, অনুভূতি, আচরণ ও বোঝাপড়ার সামর্থ্য। আর তাই অনেক সময় অনলাইন বন্ধুত্ব এমনভাবে হৃদয়ের জায়গা দখল করে ফেলে যে মানুষ নিজেই অবাক হয়ে যায়।

 

অনলাইন বন্ধুত্বের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো পৃথিবীর সব প্রান্তের মানুষকে একই জায়গায় এনে দাঁড় করানো। একজন বাংলাদেশি তরুণ খুব সহজেই যুক্ত হতে পারে ব্রাজিলের একজন সংগীতপ্রেমীর সঙ্গে, জাপানের একজন এনিমে ভক্তের সঙ্গে বা তুরস্কের কোনো কবিতাপ্রেমীর সঙ্গে। ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, ভূগোল- এই সব সীমা প্রযুক্তির সামনে খুবই ক্ষুদ্র। এই সংযোগের মাধ্যমেই মানুষ জানতে পারে নতুন দেশের গল্প, নতুন ভাষার শব্দ, নতুন চিন্তা। জগতের ভিন্নতা মানুষকে সমৃদ্ধ করে, আর এই সমৃদ্ধি অনলাইন বন্ধুত্ব উপহার দেয় অনায়াসে।

 

কিন্তু সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তি যেন দুই-ধারী তলোয়ার। যেমন শস্যের সঙ্গে আগাছাও থাকে, তেমনি অনলাইন বন্ধুত্বে যেমন সম্ভাবনা আছে, তেমনই আছে ভয়ংকর ঝুঁকিও। প্রতারণা অনলাইনে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাজারো ভুয়া আইডি, চুরি করা ছবি, সাজানো গল্প- এসবের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষ প্রতারিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কেউ প্রেমের অভিনয় করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, কেউ আবার চাকরি বা বিদেশ ভিসার লোভ দেখিয়ে অন্ধ বিশ্বাসের সুযোগ নিচ্ছে। অনেক মানুষের জীবনের সঞ্চয়, বিশ্বাস, এমনকি মানসিক শান্তিও নষ্ট হয়ে যায় এমন প্রতারণায় পড়ে। অনলাইন বন্ধুত্বের এই অন্ধকার দিকই মানুষকে সবচেয়ে বেশি ভীত করে তোলে।

 

এর সঙ্গে রয়েছে আরও একটি বিপদ; সাইবার বুলিং ও মানসিক প্রতারণা। অনলাইনে মানুষ বাস্তব জীবনের চেয়ে অনেক বেশি বেপরোয়া হতে পারে। তারা জানে যে এই জায়গা বেশিরভাগ সময়েই নিরাপদ ও অচেনা। ফলে গালি দেওয়া, হুমকি দেওয়া, নোংরা মন্তব্য করা বা মানুষকে মানসিকভাবে আঘাত করার প্রবণতা সহজেই দেখা যায়। অনেক মানুষ এসবের কারণে গভীর মানসিক যন্ত্রণার শিকার হয়, আত্মমর্যাদা নষ্ট হয়, এমনকি বিষণ্নতায় ভুগতে শুরু করে। আবার অনলাইন বন্ধুত্ব কখনো কখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যেখানে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে ব্ল্যাকমেইল করতেও পারে। ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও সংগ্রহ করে পরে তা দিয়ে চাপ তৈরি করা এখন খুবই পরিচিত একটি অপরাধ।

 

তবে সবকিছুর পরও একটা সত্য অস্বীকার করা যায় না অনলাইন বন্ধুত্ব অনেক সময় বাস্তব বন্ধুত্বের থেকেও বেশি গভীর ও দৃঢ় হয়। কেন হয়? কারণ মানুষ অনলাইনে কথা বলে মুক্তভাবে। এখানে কোনো সামাজিক ভান নেই, নেই বিব্রত হওয়ার আশঙ্কা। অনেক সময় এমন কথা, এমন কষ্ট, এমন স্বপ্ন মানুষ অনলাইন বন্ধুকে বলে যা বাস্তব জীবনে কেউ জানে না। একধরনের মানসিক নিরাপত্তা কাজ করে, ‘এই মানুষটি আমাকে ব্যক্তিগতভাবে চেনে না, সে আমাকে বিচার করবে না।’ এই অনুভূতি মানুষকে সাহসী করে তোলে নিজের সত্য প্রকাশ করতে। এভাবেই ধীরে ধীরে তৈরি হয় বিশ্বাস, বোঝাপড়া এবং গভীর বন্ধন।

 

অনেক অনলাইন বন্ধুত্ব আবার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দরজা খুলে দেয়। কাউকে কেউ নতুন ভাষা শেখায়, কেউ ক্যারিয়ার গাইড করে, কেউ টেকনিক্যাল দক্ষতা শেয়ার করে। কিছু মানুষ স্কলারশিপ, চাকরি বা ব্যবসার সুযোগও পেয়েছে কেবল এই অনলাইন নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে। আবার বহু মানুষ নতুন চিন্তার সাথে পরিচিত হয়েছে বিভিন্ন দেশের বন্ধুদের কাছ থেকে, এমনকি মনের দৃষ্টিভঙ্গিও পাল্টে গেছে। পৃথিবীর প্রতি মনোভাব, মানবিকতা, সহমর্মিতা- সবকিছু সমৃদ্ধ হয়েছে এই সম্পর্কের মাধ্যমে।

 

কিন্তু ঝুঁকির জায়গাগুলো মনে রাখা জরুরি। কারণ ভুল সিদ্ধান্ত, অতি আবেগ বা অবিশ্বাসযোগ্য কাউকে বিশ্বাস করার কারণে বড় ক্ষতি হতে পারে। অনলাইন বন্ধুত্ব নিরাপদ রাখতে কিছু বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখা প্রয়োজন। যেমন: নিজের ব্যক্তিগত তথ্য কখনোই সহজে প্রকাশ করা যাবে না। অপরিচিত কাউকে নিজের ছবি বা ভিডিও পাঠানো অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। কারও কাছে কখনোই টাকা পাঠানো যাবে না, যতই সে কষ্টের গল্প বলুক। আবার খুব দ্রুত ঘনিষ্ঠ হতে চাইলে সতর্ক হওয়া দরকার, কারণ প্রকৃত সম্পর্ক সময় নিয়ে গড়ে ওঠে। যদি কারও আচরণ সন্দেহজনক মনে হয়- চট করে রাগ করা, সম্পর্ক চাপিয়ে দেওয়া, অযথা আবেগ তৈরি করা, ভিডিও কল করতে চাপ দেওয়া; তাহলে এমন সম্পর্ক থেকে দূরে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।

 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, অনলাইন বন্ধুত্ব সমাজে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে? উত্তর হলো, প্রভাবটি গভীর এবং বহুমাত্রিক। এই বন্ধুত্ব সংস্কৃতির বিনিময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিভিন্ন দেশের তরুণেরা একে অন্যের ভাষা, পোশাক, অভ্যাস, খাবারের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারছে। এটি বৈশ্বিক মানবিকতাকে সমৃদ্ধ করছে। আবার সামাজিক আন্দোলন, মানবিক সহায়তা, দুঃসময়ে তথ্য ছড়িয়ে দেওয়াসহ অনেক ক্ষেত্রে অনলাইন বন্ধুত্ব ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। বিশ্বের এক প্রান্তে কোনো দুর্যোগ হলে অন্য প্রান্তের বন্ধুরা সাহায্যের জন্য পদক্ষেপ নেয়, এটা অতীতে কল্পনাও করা যেত না।

 

অনলাইন বন্ধুত্বের নেতিবাচক সামাজিক প্রভাবও রয়েছে। অনেক তরুণ অনলাইন জীবনে আসক্ত হয়ে বাস্তব জীবনের দায়িত্ব, কাজ, পরিবার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। বাস্তব জগতের মানুষের সাথে যোগাযোগ কমে আসছে। সামাজিক দক্ষতা কমে যাচ্ছে। যারা বাস্তবে মানুষকে মুখোমুখি বলতে পারে না তাদের অনেকেই অনলাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতে পারে, কিন্তু সামান্য সামাজিক পরিস্থিতি সামলাতে পারে না। এর ফলে ব্যক্তিত্বের বিকাশ ব্যাহত হয়। অনেকে আবার অনলাইন বন্ধুর কারণে নিজের পরিবার বা বাস্তব বন্ধুত্বকে অবহেলা করতে শুরু করে, যা সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর।

 

ভবিষ্যতে অনলাইন বন্ধুত্ব আরও শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী হবে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রযুক্তি যেভাবে উন্নতি করছে তাতে ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি বা অগমেন্টেড রিয়্যালিটির বিশ্বে মানুষ এমনভাবে অন্যকে দেখতে এবং অনুভব করতে পারবে যেন সত্যিই দু’জন পাশাপাশি বসে আছে। ভাষা আর বাধা হবে না, রিয়েল টাইম ট্রান্সলেশন প্রযুক্তি কথোপকথনকে আরও সহজ করে দেবে। বন্ধু সাজেস্ট করার জন্য আরও উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষকে ঠিক তার মতো মানসিকতার মানুষের সঙ্গে যুক্ত করবে। একইসঙ্গে অনলাইন নিরাপত্তা আরও কঠোর হবে, প্রতারণার পরিমাণ কমবে, পরিচয় যাচাই আরও সুনির্দিষ্ট হবে।

 

সবশেষে বলতে হয়, অনলাইন বন্ধুত্ব একটি পরিপূর্ণ সত্য, যাকে অস্বীকার করা যায় না। এটি যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনই বিশাল সম্ভাবনার দরজা। কারও কাছে অনলাইন বন্ধুত্ব হতে পারে জীবনের আশীর্বাদ, কারও কাছে হতে পারে ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। কিন্তু এই দুই ফলাফলই নির্ভর করে মানুষের সচেতনতার ওপর। যদি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহার করা যায়, তবে অনলাইন বন্ধুত্ব মানুষকে সমৃদ্ধ করে, সম্পর্ককে সুন্দর করে, পৃথিবীকে ছোট করে এনে দেয় হাতের মুঠোয়। আর যদি অবিবেচকভাবে বিশ্বাস করা হয়, আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে এই বন্ধুত্ব মানুষকে বিপদের মুখেও ঠেলে দিতে পারে।

 

তাই অনলাইন বন্ধুত্বকে পুরোপুরি ভালো বা খারাপ বলা ঠিক নয়; এটি এক ধরনের শক্তি, যা কারও হাতে আশীর্বাদ হয়ে ওঠে, আবার কারও হাতে ক্ষতির কারণও হয়। কিন্তু সম্ভাবনার দিকটি এতটাই বড় যে আধুনিক তরুণেরা এই পথ ছাড়তে চাইবে না। অনলাইনের জগতে সম্পর্কের এই নতুন রূপ মানবসমাজকে এক নতুন বাস্তবতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে; যেখানে সীমান্ত নেই, দূরত্ব নেই, কণ্ঠের কম্পন নেই, কিন্তু আছে অনুভূতির বন্ধন, বোঝাপড়ার উষ্ণতা এবং মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাসের অদৃশ্য সূতো। সেই সূতো যত্ন করে ধরে রাখাটাই হচ্ছে আজকের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

লেখক: সদস্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে দৈনিক ভোরের কাগজ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!