রাষ্ট্রের চোখে কি উত্তরবঙ্গ অদৃশ্য?

উত্তরবঙ্গ, বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও উন্নয়নের সুষম বণ্টনের ক্ষেত্রে বারবার অবহেলিতই থেকে যাচ্ছে। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের চিত্র যতই উজ্জ্বল হোক না কেন, উত্তরাঞ্চলের মানুষ এখনো অপেক্ষায় রয়েছে মৌলিক সুযোগ-সুবিধা আর রাষ্ট্রীয় নজরদারির। অব্যাহত বৈষম্য, নানা সংকট ও অবহেলার কারণে উত্তরবঙ্গের মানুষের মনে জমে আছে দীর্ঘদিনের হতাশা ও বঞ্চনা।
জাতীয় বাজেট থেকে শুরু করে একনেক সভা সব জায়গায় উপেক্ষিত উত্তরবঙ্গ। দারিদ্র্যের বাস্তবতা: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এর ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী: জাতীয় গড় দারিদ্র্যের হার: ১৮.৭%। অন্যদিকে, কুড়িগ্রাম জেলায় ৭০.৮%। রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা সহ অন্যন্য জেলাগুলোতেও দারিদ্র্যের হার জাতীয় গড় দারিদ্র্যের হারের তুলনার অনেক বেশি।
প্রবল নদীভাঙনের শিকার জনগণ: বছরের পর বছর ধরে নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধায় হাজার হাজার পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে। তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও ধরলা নদীর অব্যাহত ভাঙনে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। শুধুমাত্র কুড়িগ্রাম জেলায় প্রতি বছর গড়ে ৮,০০০ একর জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।
বছরের তিনভাগের প্রায় এক ভাগ সময় বিভিন্ন অঞ্চল পানিতে ডুবে থাকলেও সেদিকে কোন নজর থাকে না কারো। সেই অঞ্চলগুলোতে না পৌঁছায় কোনো ত্রাণ, না পৌঁছায় কোনো ক্যামেরা। ভিটেমাটি হারা মানুষদের জন্য থাকে না কোনো ত্রাণ কিংবা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা। বছরের পর বছর ধরে নির্মম বাস্তবতাকে সঙ্গী করেই চলছে তাদের জীবন।
শিক্ষা খাত: দেশের জাতীয় গড় সাক্ষরতার হার যেখানে ৭৬%। সেখানে,উত্তরাঞ্চলের গড় সাক্ষরতার হার: ৬৭%। বিশেষ করে চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকায় বিদ্যালয় ও শিক্ষকের ঘাটতি ব্যাপক। স্কুল ড্রপ-আউটের হার উচ্চ, বিশেষ করে মেয়েদের মধ্যে।
স্বাস্থ্যসেবা সংকট: উত্তরাঞ্চলে শীতের তীব্রতা ও গ্রীষ্মের দাবদাহের মাত্রা বেশি থাকায় প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতায় ভোগে। আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য সুবিধা প্রায় অনুপস্থিত থাকায় এই সাধারণ মানুষ গুলো তাদের চিকিৎসার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। সেই সাথে প্রয়োজনীয় লোকবলের সংকট তো রয়েছেই।
বাজেট বৈষম্য: জাতীয় বাজেটের বড় অংশই বরাদ্দ হয় ঢাকা, চট্টগ্রাম, দক্ষিণাঞ্চলের মেগা প্রকল্পে। গত ১৫ বছরে উত্তরাঞ্চলের জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো মেগা প্রকল্প এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। গত ৫ বছরের বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, অবকাঠামোগত উন্নয়ন বরাদ্দের মাত্র ৫-৭% উত্তরাঞ্চলে যাচ্ছে।
উত্তরাঞ্চলের এই পরিসংখ্যানগুলো শুধু সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এগুলো হাজার হাজার মানুষের জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবি। অবকাঠামো উন্নয়ন, কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন, শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে সুষম বিনিয়োগ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় টেকসই ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত না করা হলে উত্তরাঞ্চলের মানুষ এই হতাশার বেড়াজালে বন্দি থেকেই যাবে।
উত্তরের হতাশা কাটবে কবে? প্রশ্নটা শুধু উত্তরাঞ্চলের নয়, বরং এটা সমগ্র দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও ন্যায্যতার প্রশ্ন।

