বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

অস্তিত্বের মিছিল যেন মিশেছিল শহীদ মিনারে

Author

মোঃ আরিফুল ইসলাম রাফি , জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ৫ আগস্ট ২০২৫ পাঠ: ৩১ বার

জুলাই পেরিয়ে যখন ৩ আগস্টের সূর্য উঠেছিল আকাশে, শহরটা যেন নিঃশব্দে কেঁপে উঠছিল। রাতের নিস্তব্ধতা যেন আগুনের মতো পোড়াচ্ছিল। ঢাকার শহীদ মিনার চত্বরে জমেছিল এক অন্যরকম মিছিল। ব্যানার-পোস্টারে নয়, ছিল মানুষের চোখের ভাষা, রক্তের গন্ধ, হৃদয়ের হাহাকার। সকল শ্রেণীর মানুষ এদিন এসেছিলো শহীদ মিনারে। কারণ, এটা হয়ে উঠেছিলো অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

 

বিচারহীনতার সংস্কৃতি, নিরাপত্তাহীনতা, চাকরির বঞ্চনা, শিক্ষার বাণিজ্যিকরণ আর বিরুদ্ধ কণ্ঠর দমন — সব মিলে নতুন প্রজন্ম বলছিল, “এটা আমাদের অস্তিত্বের লড়াই।” ৩ আগস্ট কোনো রাজনৈতিক দলের ডাকা কর্মসূচি ছিলো না। এটি ছিল বাঁচতে চাওয়ার লড়াই, একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার মিছিল।

 

এই আন্দোলন একদিনের বা একমাসের নয়।

এটা চলমান। এটা বিশ্বাসের, আশার আর পরিবর্তনের।

সেদিন শহীদ মিনার কেবল ভাষণ বা ব্যানারে ভরে ওঠেনি —সেদিন প্রতিটি মানুষ দাঁড়িয়েছিল নিজের অস্তিত্বের জন্য। যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়,

“জনতার কাছে রাষ্ট্র একদিন জবাব দিতে বাধ্য হবে।”

 

আবু সাইদ, মীর মুগ্ধ, ওয়াসিম, নাফিস কিংবা ছোট্ট শিশু রিয়া কেউ রক্ষা পায় নি স্বৈরাচারের সজ্জিত বাহিনীর হাত থেকে। এদিন মিছিল এসেছিলো সেইসব শহীদের রক্তের প্রতিদান দিতে।

 

২০২৪ সালের জুলাই যেন হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের আয়নায় এক দগদগে চিহ্ন। শাসকগোষ্ঠীর নির্দেশে চলছিল নিপীড়ন, বিচারহীনতা আর নিধনের খেলা। একদিকে ক্ষমতাবানের উৎসব, আরেকদিকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিরোধ। শিক্ষার্থীরা নেমে এসেছিল রাস্তায় কারণ তাদের ভবিষ্যৎ বিক্রি হয়ে যাচ্ছিল নীতিহীনতার বাজারে, অভিভাবকরা এসেছিল তাদের সন্তানদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে, সকল শ্রেণী পেশার মানুষ যেন হয়ে উঠেছিল এক আত্মার অধিকারী । এই অভ্যুত্থান ছিল সবার। এই বিদ্রোহ ছিল যারা শুধু মানুষ হয়ে বাঁচতে চেয়েছিল তাদের।

 

তারা এসেছিল শহীদ মিনারে—হাঁটতে হাঁটতে, গুলির ভয় উপেক্ষা করে, রক্ত মুছে নিয়ে। কেউ হাতে ভাইয়ের ছবি, কেউ সঙ্গে মেয়ের রক্তমাখা ওড়না।

 

এই মিছিল কেবল কিছু মানুষের জড়ো হওয়া ছিল না। এটা ছিল একটি জাতির ‘আমি’ হয়ে উঠার দিন। শহীদ মিনার যেন সেদিন এক বারুদভর্তি বুক ছিল, যেখানে প্রতিটি মানুষের পা ফেলার শব্দ ছিল প্রতিরোধের গান।

 

শহীদ মিনারে সেদিন কারো একার ছিলো না। নারী, শিশু, বৃদ্ধ—সবাই এসে দাঁড়িয়েছিলেন। এই দৃশ্যগুলো ছিল হৃদয় বিদারক, কিন্তু ঠিক এখানেই লুকিয়ে ছিল সাহস, যে সাহসে গড়ে ওঠে বিপ্লব, জন্ম নেয় ইতিহাস।

 

প্রশাসন বলছিল ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’, কিন্তু শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে মানুষ বলছিল, “এই দেশটা আমাদের, আমরা আর নিঃশ্বাস বন্ধ করে বাঁচবো না।”

 

অবশেষে এলো সেই কাঙ্খিত মুহুর্ত। ঘোষণা হলো স্বৈরাচারের পতনই হবে আন্দোলনের একমাত্র লক্ষ্য।

জাতি পেলো এক মুক্তির আলো, শুরু হয়ে গেলো নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। আমরা মুক্ত হলাম এক দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের হাত থেকে।

 

৩ আগস্ট এখন আর শুধু একটি তারিখ নয়। এটি এখন একটি চিৎকার, একটি প্রশ্ন—“আমরা কি আমাদের স্বদেশ কে স্বৈরাচার মুক্ত করতে পারব?”

 

এই দিনে শহীদ মিনার শুধু একটা পাথরের স্থাপনা ছিল না। এটি হয়ে উঠেছিল এক জ্বলন্ত বুক, যার বুকে মানুষ লিখে গেছে—“আমরা এসেছিলাম অস্তিত্বের জন্য। আমরা ফিরবো মুক্তির জন্য।”

লেখক: সদস্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৫ আগস্ট ২০২৫ তারিখে দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!