শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

হরমুজ প্রণালী : ভূরাজনীতির দাবার ঘুঁটি

Author

উম্মে জোবায়দা , ইডেন মহিলা কলেজ

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ পাঠ: ৩ বার

হরমুজ প্রণালি: ভূরাজনীতির দাবার ঘুঁটি

বর্তমান বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল এবং ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা ও সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে হরমুজ প্রণালি। যেটি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান নৌপথ। বৈশ্বিক সামুদ্রিক পরিবাহিত তেলের ২০% এরও বেশি এই প্রণালী দিয়ে অতিক্রম করে। এই প্রণালি শুধুমাত্র তেল পরিবহনের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, সাম্প্রতিক চলমান সংঘাতে এটি এখন ভূরাজনীতির এক কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। হরমুজ প্রণালিকে বলা হয় গুরুত্বপূর্ণ গলা বা chokepoint। এর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশের প্রশস্ত ২১-৩০ মাইল যার মধ্য দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২১ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পরিবাহিত হয়। ১৬৭ কিলোমিটার  দৈর্ঘ্যের এই প্রণালীটি সংযুক্ত করেছে ‘ওমান উপসাগর’ ও ‘পারস্য উপসাগর’কে। এই প্রণালীটি অত্যন্ত সংকীর্ণ হওয়ায় এখানে কোনো ধরনের সংঘাত বা উত্তেজনা সৃষ্টি হলে তা সহজেই বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। যা সরাসরি বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত। যার ফলে এর ভৌগোলিক অবস্থান একে আরও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। যেহেতু  বিশ্বের সকল জ্বালানি সরবরাহ করা হয় নৌপথ দিয়ে। তাই বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য কার্যক্রম এর ক্ষেত্রে নৌপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সংস্থা United Nations Conference on Trade and Development (UNCTAD) জানিয়েছে, বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ৮০-৯০ শতাংশ সমুদ্রপথে পরিবাহিত হয়। হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে রয়েছে বাহরাইন, ইরান,ইরাক, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত অর্থাৎ বিশ্বের খনিজ সম্পদের সমৃদ্ধ অধিকাংশ দেশই এখানে অবস্থিত। এ থেকে বুঝা যায়, তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো পুরোপুরিভাবে হরমুজ প্রণালীর উপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। আর যার কারণেই এর কৌশলগত গুরুত্বও অনেক। যেখান থেকে তেল পরিবাহিত হয় এশিয়া, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে চীন, জাপান, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়া অন্যতম। আর তাই হরমুজ প্রণালী বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রণালীর উত্তর উপকূলের একটি বড় অংশ ইরানের নিয়ন্ত্রণে। এই স্বাভাবিক আধিপত্য থাকার কারণে ওই দেশের মোট অর্থনীতির দুই-তৃতীয়াংশ আসে জ্বালানি রপ্তানি এবং টোলের মাধ্যমে। আধিপত্য থাকায় দেশটি এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে কৌশলগত চাপের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার সক্ষমতা রাখে। যুক্তরাষ্ট্র- ইসরায়েল এর সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই প্রণালী এক ধরনের কৌশলগত ‘ট্রাম কার্ড’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা যেকোনো সময় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। ইতোমধ্যে ইরান সাময়িক সময়ের জন্য হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার ফলে তেল সরবারাহে বিঘ্ন ঘটে। আর যার প্রভাব বৈশ্বিক বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পায়, যার প্রভাব পড়ে পরিবহন, শিল্প উৎপাদন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যের ওপর। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে , যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ এসব দেশের জ্বালানি অনেকাংশেই মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহকৃত তেলের উপর নির্ভরশীল। আর বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকাংশেই  তেলের উপর নির্ভর করে। তাই তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়া মানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন ব্যয় এবং সামগ্রিক দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়া , যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে হরমুজ প্রণালীতে যেকোনো ধরনের অস্থিরতা মানে সরাসরি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়া। তাই এই প্রণালীর উপর ইরানের আধিপত্য থাকার কারণে ইরান এই নৌপথকে একটি কৌশলগত প্রতিরোধমূলক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করছে। কারণ যেকোনো বড় ধরনের সামরিক সংঘাত বা সরাসরি আক্রমণের পরিস্থিতিতে ইরান এই প্রণালীতে বিঘ্ন সৃষ্টি করার হুমকি দিচ্ছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে। এই সম্ভাব্য ঝুঁকি আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। ফলে, অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়া বা একতরফাভাবে পক্ষ নেওয়ার ক্ষেত্রে দেশগুলো আরও সতর্কমূলক অবস্থান গ্রহণ করে। মোদ্দাকথা হলো হরমুজ প্রণালী শুধু একটি বাণিজ্যিক নৌপথ হিসেবে নয় ; এটি এখন একটি কৌশলগত রূপ ধারণ করেছে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতির যেকোনো সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। সর্বোপরি, হরমুজ প্রণালী একটি বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র – ইসরায়েল এর মধ্যকার চলমান উত্তেজনা এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, তা আর আঞ্চলিক সীমাবদ্ধ না থেকে গোটা বিশ্বকে প্রভাবিত করছে। একদিকে ইরানের আধিপত্য বজায় রাখার প্রচেষ্টা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চাপসৃষ্টি।যা প্রণালীটিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। যার ফলে এই প্রণালী যেন হয়ে উঠেছে এক অদৃশ্য দাবাগুটি। হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে প্রতিটি পদক্ষেপই যেন একটি দাবার চাল, যার প্রভাব পড়ে গোটা বিশ্বের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে। যার ওপর নির্ভর করে আছে বিশ্বের জ্বালানি প্রবাহ ও অর্থনীতির একটি বড় অংশ। আর এই দাবার বোর্ডের সামান্য ভুল চাল-এর চড়া মাশুল দিতে হতে পারে গোটা বিশ্বকে।

লেখক: সাংগঠনিক সম্পাদক, ইডেন মহিলা কলেজ।
লিংক কপি হয়েছে!